প্রেমে পড়ার প্রথাগত রোম্যান্টিক সূত্রটিকেও সে অস্বীকার করেছে; বলেছে, ‘প্রথম দর্শনেই কি আমি প্ৰাণসমর্পণ করিয়াছিলাম? মোটেই নহে।’ সে প্রেমে পড়েছে ধীরে ধীরে, তার বাল্যস্মৃতি তাকে যৌবনে ঠেলে দিয়েছে প্রেমের দিকে। বাল্যকালে পাঠশালায় তার প্রথম প্রেমিক ছোটু যে-গানটি তাকে শুনিয়েছিলো, সেটি অনেক বছর পর সে শুনতে পায় রমানাথের কণ্ঠে: তার ফল হচ্ছে : ‘কিন্তু গানটি গাহিলেই সমস্ত বিপৰ্যয় হইয়া পড়িত। গানটির যে কি মোহ ছিল জানি না, শুনিতে শুনিতে বাল্যের স্মৃতিধারা পূর্ণ প্রবাহে উথলিয়া কুমারহাদয়ের অতৃপ্ত প্ৰেমাকাঙক্ষাকে স্ফীত উচ্ছসিত করিয়া তুলিল।. তিনি চলিয়া যাইবার পরেও সমস্ত রাত্রি ধরিয়া কেমন মেঘাচ্ছন্ন থাকিতাম-স্বপ্নে জাগরণে ঐ একইরূপ ভাবে আমাকে অভিভূত করিয়া রাখিত; পরদিন নিদ্রােভঙ্গের পর হইতে সে ভাব অল্পে অল্পে দূর হইয়া যাইত।’ তবে প্রেম নারীজীবনের বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা বিয়ে; মণির জীবনেও বিয়েই বড়ো হয়ে দেখা দেয়। সে দেখতে পায় যাকে সে হৃদয় দিয়েছে, সমাজের চোখে সে তার স্বামী হওয়ার যোগ্য হ’লেও তার হৃদয়ের যোগ্য নয়। ফলে যে-সংকট দেখা দেয়। তার জীবনে, তাতে সে এমন এক আন্তর-বাহ্যিক লড়াইয়ে নামে যাতে সে বদলে দেয় প্রথাগত নারীর ভাবমূর্তি। বিয়ে হচ্ছে একটি স্বামীর জন্ম, মণিও চারদিকে পরিবৃত হয়ে পড়ে স্বামীর ভাবমূর্তি দিয়ে : ‘চারিদিক হইতেই আমি শুনিতে লাগিলাম, বুঝিতে লাগিলাম, তিনি আমার স্বামী হইবেন, কোন বঙ্গবালার মনে এই বিশ্বাসের কিরূপ প্ৰবল প্রভাব, তাহা বিশেষ করিয়া বলিবার আবশ্যক আছে কি?’ স্বামী সম্পর্কে শিশুকাল থেকেই মেয়েদের মনে তৈরি করা হয় এক দেবভাবমূর্তি, মেয়েরা বড়ো হয় ওই মূর্তিটিকে পুজো ক’রে করে, মণিও তার বাইরে নয়। স্বামীর যে-ছক তার সামনে ছিলো, সেটি সম্বন্ধে সে বলেছে : ‘স্বামী যেমনই হীেন, তিনি রমণীর একমাত্র পূজ্য আরাধ্য দেবতা, প্রাণের প্রিয়তম, জীবনের সর্বস্ব-এই বাক্য, এই ভাব, এই সংস্কার আজন্মকাল হইতে আমাদের মনে বদ্ধমূল হইয়া বসিতেছে, সুতরাং বিশেষ কারণে স্পষ্ট বীতরাগ না থাকিলে এই বিশ্বাসই প্রেমাঙ্কুরিত করিবার যথেষ্ট কারণ। মণি, অন্য মেয়েদের মতো, বড়ো হয়েছে স্বামী ভাবমূর্তির পদতলে, ওই পায়ের নিচে নিজের মাথাটি রেখেই বেড়েছে। সে; এবং ‘আত্মদানে অন্যকে সুখী করিব নারীপ্রকৃতির এই যে সৰ্ব্বগ্রাসী আকাঙক্ষা, ইচ্ছাপ্রবণতা, নারীপ্রেমের শিরায় মজায় যে আকাঙক্ষা শোণিতাকারে প্রবাহিত বৰ্ত্তমান, তাহার সফলতাতেই, তাহার বিশ্বাসেই রমণী-হৃদয় পরিপূর্ণ, বিকসিত, জীবনজন্ম সার্থক, চরিতার্থ; আবার এ বিশ্বাসেই সে ভ্রান্ত, কলঙ্কিত, মহাপাপী। প্ৰেমময়ী রমণী ইহার জন্য কতদূর আত্মত্যাগ করিতেছে; আর কতদূর না করিতে পারে?’ তবে স্বামী ভাবমূর্তির পায়ে আত্মদানের পাশাপাশি সব নারীই পোষে স্বামী ভাবমূর্তির সাথে একটা বিরোধ, এটা নারী ঔপন্যাসিকদের প্রায় সব উপন্যাসেই স্পষ্ট বা প্রচ্ছন্নভাবে দেখা যায়, এবং মণির মধ্যে তা স্পষ্ট দেখা দেয় প্রেমে পড়ার অল্প পরেই।
বাঙালি নারীকে পিতৃতন্ত্র দিয়েছে স্বামীভক্তির পাঠ, পুরুষে আস্থা; কিন্তু বাঙালি নারীপুরুষের সম্পর্ক একটু ঘাটলে ধরা পড়ে তাদের পারস্পরিক অনাস্থা। পুরুষ তার নারী-অনাস্থ উচ্চকণ্ঠে প্রচার করে আসছে পিতৃতন্ত্রের শুরু থেকে, নানা সংহিতা লিখেছে নারীঘৃণার; আর নারী তা বিষের মতো লালন করে এসেছে নিজের বুকে। মণি যার ওপর আস্থা স্থাপন করতে যাচ্ছিলো, অচিরেই তার ওপর তার আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। যে-রমানাথের সঙ্গে সে প্রণয়ে জড়িত, যে তার স্বামী হ’তে যাচ্ছে, মণি জানতে পারে সে সৎ নয়; বিলেতে সে এক নারীকে কথা দিয়েছিলো। মণি বলেছে, ‘স্বপ্নে দেখিলাম, যেন আমার বিবাহ হইতেছে, আমি আগ্রহদৃষ্টিতে বরের দিকে চাহিলাম, কিন্তু মনে হইল, এ সে নাহে।’ শুরু হয় তার সংকট; সে নতুন প্ৰজাতির নারী, যে প্রথাগত ছক অনুসারে চলে না। তার প্রেম বিপর্যস্ত, তবে সে নিজে বিপর্যস্ত নয়। সে বলেছে, ‘কিন্তু এ নৈরাশ্যে করুণ কষ্টের দারুণতা, অসহনীয়তা উপলব্ধি কবিলাম না; কিংবা সে যেমনই হীেক, তবু আমার দেবতা-তৰু তাহার চরণে হৃদয় বিকাইব, মনে এমনতর ভাবেরও উদয় হইল না। পরিপূর্ণ বিশ্বাসে প্রতারিত বোধ করিয়া এ যেন প্রত্যাখ্যাত ভিক্ষুক দুৰ্ব্বাসা মুনির ন্যায় গৰ্ব্বাহত নিরাশাস্কুদ্ধ হইলাম, প্রতারকের উপর ভীষণ ক্রোধের উদয় হইল। কেবল তাহার উপর নহে, নিজের উপরেও ক্রুদ্ধ হইলাম-কি করিয়া আমি এমন লোককে দেবতা মনে করিয়াছিলাম!’ প্রথাগত কতকগুলো বিশ্বাস ও বোধ সে ত্যাগ করেছে : প্রণয়সম্পর্ক নষ্ট হওয়ায় সে ‘করুণ কষ্টের দারুণতা, অসহনীয়তা উপলব্ধি’ করে নি, যা তার কাছে প্রত্যাশিত ছিলো, এবং ‘সে যেমনই হীেক, তবু আমার দেবতা-তৰু তাহার চরণে হৃদয় বিকাইব, মনে এমনতর ভাবেরও উদয় হইল না।’ সে পুরুষের ছক অনুসারে তৈরি নয়, প্রতারককে দেবতা গণ্য করার বদলে তার ওপর সে হয় ক্রুদ্ধ। তার বোন তার মতো নয়, সে পুরুষের ছক অনুসারী; তার দিদি তার কাছে তুলে ধরে পুরুষতান্ত্রিক বাস্তব পরিস্থিতি : ‘সে পুরুষ মানুষ, তার কি, তোর সঙ্গে না হ’লে এখনি অন্য আর একজন সোধে মেয়ে দেবে, আর তোর নামে এ থেকে এত কথা উঠবে যে, পরে বিয়ে হওয়াই ভার হবে।’ পুরুষতন্ত্রে পুরুষ চিরনিষ্পাপ, সে দণ্ডিত হওয়ার বদলে পায় পুরস্কার; তার জন্যে নারীর অভাব হয় না, বরং নারীরাই অভাব বোধ করে তার। মণি ছকভাঙা; সে জানায়, নাই বা বিয়ে হ’ল, আমি ত সেজন্য কিছুমাত্র ব্যস্ত নই।’ ছক থেকে স’রে এসেছে সে, বিয়েকে সে নিয়তি মনে করে না।
