স্বর্ণকুমারী দেবী প্রথম বাঙালি নারী ঔপন্যাসিক, এবং তিনিই আমার নেয়া পাঁচজনের মধ্যে আধুনিকতম চেতনা সম্পন্ন, শিল্পিতায়ও শ্রেষ্ঠ। তার যে-উপন্যাসটি আমি নিয়েছি, সেটির নাম কাহাকে (১৮৯৮), যাতে কাজ করেছে প্ৰবল নারীবাদী মনোভাব। দ্য বোভোয়ার নারীর জীবনে প্রেমের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উদ্ধৃত করেছেন বায়রণের যে-দুটি পংক্তি, Man’s love is of man’s life a thing apart/’Tis woman’s whole existence, স্বর্ণকুমারী তাঁর উপন্যাস শুরু করেছেন সে-পংক্তি দুটি উদ্ধৃত ক’রে, এবং তার নায়িকা মণি বলেছে :
‘এ কথা যিনি বলিয়াছেন, তিনি একজন পুৰুষ। পুরুষ হইয়া রমণীব অন্তর্গত প্রকৃতি এমন হুবহু ঠিকটি কি করিয়া ধরিলেন, ভারি আশ্চৰ্য্য মনে হয়। আমি ত আমার জীবনের দিকে চাহিয়া এ কথাব সত্যতা অনুভব করি। যতদূর অতীতে চলিয়া যাই, যখন হইতে জ্ঞানের বিকাশ মনে করিতে পারি। তখন হইতে দেখিতে পাই–কেবল ভালবাসিয়াই আসিতেছি, ভালবাসা ও জীবন আমাব পক্ষে একই কথা; সে পদার্থটাকে আমা হইতে বিচ্ছিন্ন করিলে জীবনটা একেবারে শূন্য অপদাৰ্থ হইয়া পড়ে-আমার আমি তুই লোপ পাইয়া যায়।‘
প্ৰেম সম্পর্কে মণির ব্যাখ্যা অবশ্য দ্য বোভোয়ারের ব্যাখ্যার মতো নয়, তবে সে ক্রমশ এগিয়েছে সে-দিকেই। মণি বা মৃণালিনী কাহাকো নায়িকা, সে নিজের প্রেম ও বিয়ের উপাখ্যান বলেছে নিজেই। নিজের জীবন, প্রেম, ও বিয়ের কাহিনী সে যেভাবে অকপটে বলেছে, তাতেই নষ্ট হয়ে গেছে লজ্জাবতী নারীর ছকটি। মণি অক্রিয় নয়, নিজের গল্প অকপটে বলার মধ্যেই তার সক্রিয়তার পরিচয় মেলে, এবং সে সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণও করে পরিস্থিতি। সারা উপন্যাসেই টের পাওয়া যায় যে তার শুধু হৃদয় নয়, একটি মস্তিষ্ক রয়েছে, এবং মস্তিষ্কটিই বেশি সক্রিয়। তার জীবনকাহিনী জটিল নয়, এবং সে বাঙলার অধিকাংশ নারীর দুটি অভিশাপ থেকে মুক্ত;–সে দরিদ্রকন্যা নয়, ও অশিক্ষিত নয়; তবু বিয়েই সৃষ্টি করে তার জীবনের সমস্যা। মণি ছোটো বা বিনয়কুমারের সাথে তার বাল্যপ্ৰেম, যৌবনে ব্যারিস্টার রমানাথের সাথে ব্যর্থ প্রণয়, অবশেষে বাল্যাপ্রেমিক ডাক্তার বিনয়কুমারের সাথে রোমাঞ্চকর রোম্যান্টিক মিলনের কাহিনী অকপটে বলেছে। মণির কথা বলার ভঙ্গি থেকে বোঝা যায় নারীমুক্তি আন্দােলনের বাণীর সাথে সে পরিচিত, আমূল নারীবাদী না হ’লেও সে নারীবাদী। সে পুরুষবিদ্বেষী নয়, কিন্তু পুরুষের সাথে তার লিঙ্গের যে বিরোধ রয়েছে, সেটা কখনো স্পষ্ট কখনো প্রচ্ছন্নভাবে সে জানাতে দ্বিধা করে নি। শুরুতেই নিজের বয়সের কথা বলতে গিয়ে সে বলে, ‘তখন আমার বয়স কত? সােল তারিখ ধরিয়া এখনি তাহা ঠিক করিয়া বলিতে পারিতেছি না … পুরুষে সম্ভবতঃ আমার সারল্যে অবিশ্বাস করিয়া ইহার মধ্য হইতে গৃঢ় অভিপ্ৰায় টানিয়া বাহির করবেন, কিন্তু স্ত্রীলোক বুঝিবেন, বাস্তবিক পক্ষে সাল তারিখ মনে করিয়া রাখা আমাদের পক্ষে কিরূপ কঠিন ব্যাপার।’ সে ধ’রেই নিয়েছে নারীরা তার কথায় বিশ্বাস করবে, কিন্তু ‘পুরুষে সম্ভবতঃ অবিশ্বাস করবে: অর্থাৎ পুরুষ ও নারী বিশ্বাস করে না পরস্পরকে, তারা জড়িত অবিশ্বাসের সম্পর্কে। শুধু পুরুষকে নয়, পুরুষের মধ্যে যে প্রধান, তাকেও মণি দেখে একই দৃষ্টিতে; সে বলে, ‘বিধাতা পুরুষ তাহা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছেন।’ যা সম্ভব হতে পারতো, হওয়াই স্বাভাবিক ছিলো, তা যে অসম্ভব হয়ে উঠেছে, তার মূলে রয়েছে একটি পুরুষ-বিধাতাপুরুষ, যে নারীর প্রতিপক্ষ। সে যেভাবে নিজের বয়স জানিয়েছে, তাতেও সে ভেঙে ফেলেছে প্রথাগত নারীভাবমূর্তি, প্রকাশ করেছে। পুরুষের সাথে বিরোধ; সে বলেছে, ‘ধরিয়া লওয়া যাক, আমার বয়স তখন আঠার উনিশ, আমি এখনো অবিবাহিত। শুনিয়া কি কেহ আশ্চৰ্য্য হইতেছেন?’ বোঝা যায় তার লক্ষ্য পুরুষ, তার আইবুড়ীত্বে বিস্মিত হবে পুরুষই, কেননা সেটি এক ভিন্ন প্রজাতি।
মণি তার প্রেমের কথা বলেছে। অকপটে, প্রেমে প্রথাগত অক্রিয়তার বদলে পালন করেছে সক্রিয় ভূমিকা, অমান্য করেছে পিতৃতান্ত্রিক বিধান যে নারীর প্রেম শুধু স্বামীরই জন্যে। মণি বলেছে, ‘আমি ভালবাসি, বিবাহের পূৰ্ব্বেই ভালবাসি, তিনি যে স্বামী হইবেন, এমনতর আশা করিয়াও ভালবাসি নাই। কেবল তাহাই নহে, এই ভালবাসাই আমার একমাত্র প্রথম ও শেষ ভালবাসা নহে।’ উনিশ শতকের শেষ দশকের পক্ষে খুবই ভয়ঙ্কর কথা বলেছে সে অবলীলায় যে সে ভালোবেসেছে বিয়ের আগেই পুরুষটিকে ভবিষ্যৎ স্বামী ভেবেও ভালোবাসে নি, এবং চরম ভয়ঙ্কর কথা হচ্ছে সে প্রেমে পড়েছে একাধিকবার। নিষ্ঠাবতী সতী নারীর ভবিমূর্তি সে ভেঙেচুরে দিয়েছে। প্রেমে সে বিশ্বাস করে সাম্যে, শুধু নারীই পুজো করবে প্রেমিককে, আর প্রেমিক পুজো করবে না। প্রেমিকাকে, এটা তার কাছে গ্ৰহণযোগ্য নয়; সে বলে; ‘সে রমণীই ধন্য-যে তাহার মনোদেবতার সন্ধান পাইয়া এই পরিপূর্ণ উথলিত আবেগময় প্রাণের পূজায় জীবন সার্থক করিতে পারে; আর সেই পুরুষই ধন্য, যে এই পূজারতী হৃদয়ের দেবতারূপে বরিত হইয়া তাহার পূজায় জীবন উৎসর্গ করিয়া জীবনের উদ্দেশ্য সফল করিতে পারে, আর সেই প্রেমই প্রকৃত প্ৰেম, যাহা এই উভয়ের আত্মহারা পূজায় অধিষ্ঠিত হইয়া প্রবলভাবে চিরবিরাজমান।’ পুরুষ অবশ্য এমন প্রেমে বিশ্বাস করে না, পুরুষ চায় বহু হৃদয় ও দেহের দেবতা হতে। প্ৰেম সম্পর্কে প্রথাগত ধারণা সে বাতিল ক’রে দিয়েছে স্পষ্টভাবে, শৈশবের প্রেমও যে ইন্দ্ৰিয় কামনাতুর হতে পারে, তাও সে জানিয়েছে; বলেছে, শৈশব ও যৌবনপ্রেমে তফাৎ অল্পই’, বলেছে, ‘ভাবিতাম, ছোট্ট ত আমাকে চুম্বন করে না; তবে বাবার মত আমাকে ভালবাসে না, আমি কেন তবে ভালবাসিব?’ শৈশবের নিষ্পাপতার মধ্যে সে মিশিয়ে দিয়েছে একটু পাপ, এবং যৌবনের প্রেমকে স্থান দিয়েছে পিতৃপ্রেমের ওপরে; আমি পিতাকে ভালবাসি, তাহার সুখের জন্য আত্মবিসর্জনেও কুষ্ঠিত নাহি-কিন্তু তিনি এখন আর আমার জীবনের একমাত্ৰ সুখদুঃখ আশ্রয় অবলম্বন, আকাঙক্ষা কামনা পূজা আরাধনা, দেবতাসৰ্ব্বস্ব নহেন।’ পিতাকে সরিয়ে দিয়ে সে প্রথাগত কন্যার ভাবমূর্তি বিপন্ন করেছে সম্পূর্ণরূপে। পিতৃতন্ত্রেণ ভালো লাগতো যদি সে বলতো পিতাই তার দেবতাসর্বস্ব, কিন্তু মণি সেখানে বসিয়েছে তার প্রেমকে, প্রেমিককে। প্রেম তার কাছে যেরূপে দেখা দিয়েছে, তাও সে জানিয়েছে : ‘তাহার পর আট দশ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, তাহার পর আমি ভালও বাসিয়াছি, শৈশবের স্নিগ্ধ কোমল ভালবাসা নহে, যাহাকে লোকে বলে প্রেম–যৌবনের সেই জ্বলন্ত অনুরাগতাহারও অভিজ্ঞতা জনিয়াছে।’ মণি অভিনব নারী, যে ছক ভেঙেছে, স্বায়ত্তশাসিত মানুষ হয়ে উঠেছে।
