‘মোটের উপব এগ্রন্থ পাঠে আমরা বড় প্রীত হইয়াছি-প্রীত হইবার অ্যাব একটি বিশেষ কারণ এই যে, শ্ৰীমতী নগেন্দ্ৰবালা এতদিন কবিতায় আলোচনা কবিয়া যশঃসঞ্চয়ে ব্ৰিতিনী ছিলেন–এখন তিনি সংসারধর্মের সংস্কাবে মন দিয়াছেন; নিরবচ্ছিন্ন কবিতা রচনাই যে রমণীজীবনের চরম লক্ষ্য নহে, এবং তাঁহাতে যে রমণীর তৃপ্তি হয় না, ইহা তিনি বুঝিয়াছেন।‘
কবিতা লিখতে গিয়ে নগেন্দ্ৰবালা যে ভুল ও অপরাধ করেছিলেন, তা বুঝতে পেবে তিনি যে আবার মন দিয়েছেন। রমণীজীবনের চরম লক্ষ্য’ সংসারধর্মে, এতে সমগ্র পুরুষসমাজেরই গ্ৰীত বোধ করার কথা। নারীর সাহিত্যচর্চা পুরুষের চোখে বিকার, নারীর বিখ্যাত হওয়ার বাসনা অমার্জনীয় অপরাধ; তবু নারী সাহিত্য সৃষ্টি করেছে। এ-অপরাধের শাস্তি নারীর প্রাপ্য; পুরুষ তাকে শাস্তি দিয়েছে তার সাহিত্যকে অস্বীকার ক’রে।
পুরুষসমাজের এ-স্বভাব, এবং তাদের মন্ত্রে দীক্ষিত সংসারধর্মী অজস্র নারীর নারীপ্রতিভাবিরোধিতা বুঝতে পেরেছিলেন ভারতীর ‘বঙ্গনারী’ (১৩৩৯, ৬৩৭)। তিনি ‘স্ত্রীলেখিকা’ নামের এক রচনায় লিখেছিলেন :
‘মাসিক পত্রের পৃষ্ঠা উল্টাইতে উল্টাইতে তাহার যে নমুনা পাওয়া যায়, তাহাতে আমাদের দেশে লিখিতে সমর্থ –সুতরাং ‘শিক্ষিতা’দের মধ্যেও Mrs. Grundyর প্রাদুর্ভাব দেখ্যিা দমিয়া যাইতে হয়। ইহা অবশ্য আশ্চর্য্যোল কথা নহে,–সকল দেশেই ইহঁদের দর্শন পাওযা যায়; এবং সৰ্ব্বত্রই ইহঁচার কবিতালি পাইয়া থাকেন। তবে মেযেদেব উঠিতে হইলে ঘবে বাহিবে কি পবিমাণ বাধা অতিক্ৰম করিতে হইবে, ইহঁরা কেবল তাঁহাই মনে করাইযা দেন; মেয়েদের বিষয় যে বকম অসঙ্কোচে হীনভাবে ইহঁবা বলিতে পাবেন, পুরুষের পক্ষে অবশ্য তাহ সম্ভব নয়। আর সব্বত্রই ইহীদেব বদ্ধ ও স্কুল দৃষ্টি এবং মনের পরিধির সঙ্কীর্ণতা পীড়া দেয়। ‘দাস মনোভাব’ যে ইহঁদের কতটা মজ্জগত তাহা বলাই বাহুল্য।… বাস্তবিকই, বর্তমান পৃথিবীব্যাপী নারী-জাগরণের দিনে তাহার কোন তরঙ্গই ইহাদের স্পর্শও কবে নাই, বাঙ্গালী ঘরেব বদ্ধ একও দূষিত, হীন, খুঁটিনাটি ছাড়াইয়া কল্পনাও একতিল উপরে উঠিতে পাবে নাই!… ইহঁদের মধ্যে কাহাবও কাহারও মেয়েদের জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অপূৰ্ব্ব কিছু করিবার চেষ্টা দেখা যায়। ইহঁবা তাহাতেই একটী মৌলিক পথ আবিষ্কার করিয়াছেন বলিয়া মনে করেন। কিন্তু ইহঁবা ধাবণা করিতে পারেন না, –ইহাও তাঁহাদের ‘নারীত্ব’ হইতে প্রাপ্ত অদ্ভুত কোন পদাৰ্থ নয়, অপর পক্ষেরই শিখানো বুলি। তাহারাই ত মেয়েদের ‘পুরুষের মত’ কবিয়া কিছু করিতে জোরের সহিত বারণ কবিয়া আসিতেছেন। বাস্তবিকই ইহঁদেরও মেয়েদের সকল শিক্ষাদীক্ষা গোড়া হইতে মেয়েলি কবিয়া ফেলিবার আগ্রহ দেখিয়া দুঃখও হয়। ইহঁরা অপর পক্ষের চাবটী বেশ গিলিয়াছেন বোঝা যায়। মেয়েরা ইহঁদের মতে চলিয়া ‘বুদ্ধিমতী’ না হইয়া ‘প্রাণময়ী’ বনিতে থাকিলে তাঁহাদের আব্ব সুনিন্দি: –ব্যাঘাত হইবার কোন কারণ থাকিবে না।‘
নারীর শত্রু শুধু পুরুষ নয়, তাদের শত্রু হিশেবে রয়েছে পুরুষমন্ত্রে দীক্ষিত একপাল নারীও। এরা পুরুষের চর হিশেবে কাজ করে, নারীর সাংঘাতিক ক্ষতি করে।
বাঙালি পুরুষ, সব জাতির পুরুষের মতোই, নারীসাহিত্যকে অনুমোদন করে নি, নারীসাহিত্যকে দেখেছে রান্নাবান্না বা সংসারসেবারূপে; নারী লেখকদের মধ্যে তারা খুঁজেছে আদর্শ স্ত্রীকে। নারী লেখক, বা তার লেখা মূল্যবান নয়। পুরুযের কাছে; তাই বাঙালি নারীসাহিত্যের কোনো ইতিহাস আজো লেখা হয় নি, তাদের প্রতিভার প্রকৃতি বিচার ও মূল্যায়ন হয় নি; এমনকি তাদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ তথ্যও বেশ দুপ্ৰাপ্য। স্বর্ণকুমারী দেবী, অনুরূপ দেবী, নিরুপমা দেবী, শৈলবালা ঘোষজায়া, সীতা দেবী, শান্ত দেবী ও আরো অনেকের সব বইয়ের নামও খুঁজে পাওয়া যায় না। আজ, পাওয়া যায় না। তাদের বইয়ের প্রকাশের তারিখ। তাঁরা শিকার হয়েছেন। পুরুষতান্ত্রিক উপেক্ষার। পুরুষ সমালোচকেরা ধ’লেই নেন তাদের সাহিত্য অপাঠ্য; বিশেষ ক’রে যাদের বই জনপ্রিয় হয়েছিলো তারা সম্পূর্ণ অপাঠ্য, এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তাদের বইয়ে সমালোচকেরা, যেমন শ্ৰীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (১৩৬৯, ২৮১), খোঁজেন নারীর সুর-বৈশিষ্ট্যের পরিচয়। এ-‘সুর বৈশিষ্ট্য’ কিন্তু নারীর নিজস্ব সুর নয়, তারা খোঁজেন নারীর কণ্ঠ থেকে কতোখানি উঠেছে। পুরুষের শেখানো সুর। তাঁরা খোঁজেন পুরুষের বিধিবদ্ধ নারীত্ব, যা এক বানানো জিনিশ। পুরুষ তৈরি করেছে নারীর একরাশ ছক : নারী দেবী বা দানবী, নারী অক্রিয়, নারী মাতা, স্ত্রী, কন্যা, সেবিকা, নারীর জীবন ধন্য হয় আত্মোৎসর্গে। পুরুষের চোখে নারী চূড়ান্ত মর্ষকামী, যে ধন্য বোধ ও স্বৰ্গলাভ করে চরম পীড়নের মধ্যে। নারী এ-ছক মানে নি, কিন্তু বাধ্য হয়েছে মেনে নিতে। বাঙলার নারীরা যখন উপন্যাস লেখায় হাত দেন, তখন কি তারা এ-হুক মেনে চলেন? তারা কি পুরুষতন্ত্রের দীক্ষাকেই পুনঃপ্রচারের জন্যে ধরেন লেখনি? সব নারী ঔপন্যাসিকের সব উপন্যাস আমি পড়ে উঠতে পারি নি,-তাদের বই আজ দুপ্ৰাপ্য; বহু কষ্টে আমি সংগ্ৰহ করেছি। ছটি উপন্যাস : স্বর্ণকুমারী দেবীর কাহাকে (১৮৯৮), শৈলবালা ঘোষজায়ার জন্ম-অপরাধী (?), অনুরূপ দেবীর মন্ত্রশক্তি (১৯১৫), নিরুপমা দেবীর দিদি (১৯১৫), ও শ্যামলী (১৯১৮), শান্তা দেবীর জীবনদোলা (?)। এঁরাই আমাদের আদি নারী ঔপন্যাসিক। এঁরা কেউ জর্জ এলিয়ট, বা বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্ৰ, বুদ্ধদেব বসু, তারাশঙ্কর নন; বাঙলা উপন্যাসধারার কোনো শ্রেষ্ঠ উপন্যাস তারা কেউ লেখেন নি। তাঁরা বেশ গৌণ ঔপন্যাসিক; তবে তাদের গৌণতার মূলে কোনো সহজাত কারণ নেই, রয়েছে সামাজিক কারণ। যে-নারীর সৃষ্টিশীলতাকেই স্বীকার করে নি পুরুষ, তাঁরা কলম ধ’রেই মহান সাহিত্য সৃষ্টি করবেন, এটা আশা করা অন্যায়। তবে ইংরেজি উপন্যাসে যেমন নারী ঔপন্যাসিকেরা তেমনি তারাও পুরুষ-ঐতিহ্যের পাশাপাশি সৃষ্টি করেন একটি গতিশীল অন্তঃস্রোত, সুস্পষ্টভাবে পৃথক এক নারীসাহিত্যধারা। তাঁদের সাহিত্য বহুলাংশে আমূল্যবাদী, এবং নারীকেন্দ্ৰিক; এমনকি যারা রক্ষণশীল, তারাও নারীর দুর্দশার কথা ভুলে যান নি। আদি বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকেরা সাধ্বী স্ত্রীরূপে কলম ধরেন নি, তারা কলম ধরেন। পুরুষতন্ত্রের বহু ছক ভেঙে ফেলার জন্যে। তাঁরা বিশ্বাস করেন নি পুরুষের তৈরি নারীভাবমূর্তিতে, শুরু থেকেই বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকেরা ভাবমূর্তির থেকে বেশি গুরুত্ব দেন নারীর বাস্তবতার ওপর, এবং লিপ্ত থাকেন। পুরুষের সঙ্গে নিরন্তর বিরোধে। এ-বিরোধ স্বর্ণকুমারী, শৈলবালা, শান্তার মধ্যে তীব্র; অনুরূপা ও নিরুপমা যদিও অনেকখানি দীক্ষিত ছিলেন পুরুষের বিধানে, কিন্তু নারীপুরুষের যখন বিরোধ বেধেছে তখন তারাও পক্ষ নিয়েছেন নারীর। পুরুষ, স্বামী, বিধাতা প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণের সময় নারী ঔপন্যাসিকেরা ভক্তির থেকে অভক্তিই দেখিয়েছেন বেশি, আর জ্ঞাপন করেছেন এমন বাণী যে নারীর দুর্দশার মূলে রয়েছে পুরুষ! নারী ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস প্রধানত পুরুষদ্রোহিতার উপন্যাস, যাতে এমন একটি ইঙ্গিত মেলে যে পৃথিবীতে পুরুষ না থাকলে নারীর জীবন সুখের হতো। নারী ঔপন্যাসিকদের নারীদের জীবনে ভয়াবহ শব্দ ‘বিবাহ’, যা নারীদের প্রধান সংকট, যা সম্পন্ন না হ’লে তাদের জীবন ধ্বংস হয়, আর সম্পন্ন হ’লেও ধ্বংস হয়।
