কমলাকান্তের মতকে বঙ্কিমের মত ব’লেই ধরতে পারি, এতে প্ৰকাশ পেয়েছে উগ্র পুংতান্ত্রিক মনোভাব। যে-জর্জ এলিয়টকে ‘মালার মাপের ঔপন্যাসিক বলে বাতিল ক’রে দিয়েছেন বঙ্কিম, বাঙলার প্রথম নারী ঔপন্যাসিক স্বর্ণকুমারীর দেবীর কাহাকে (১৮৯৮) উপন্যাসের চরিত্ররা তাকে নিয়ে তর্ক করেছে, তুলনা করেছে। শেক্সপিয়রের সাথে। স্বর্ণকুমারী ডাক্তার বিনয়কুমারের মুখে দিয়েছেন তাঁর নিজেরই কথা, যা পুরুষতান্ত্রিকদের কাছে গণ্য হবে ক্ষমার অযোগ্য অবিনয় ব’লে। এটা বুঝিয়ে দেয় নারীরা সব সময়ই সন্দেহ বোধ করেছে। পুরুষের মূল্যায়ন সম্বন্ধে; তারা নিজেরাও মূল্যায়ন করেছে সব কিছু, যদিও তা প্ৰকাশ করার সুযোগ ও সাহস পায় নি। সুযোগ পেলেই তারা ভিন্ন মত প্ৰকাশ করতে দ্বিধা করে নি। স্বর্ণকুমারীর চোখে জর্জ এলিয়ট এক শেক্সপিয়র, তার চোখে বঙ্কিম কী, তা জানা যায় নি; কিন্তু তিনি যদি জর্জ এলিয়ট ও বঙ্কিমের তুলনা করতেন, তাহলে বঙ্কিমকে হয়তো গণ্য করতেন জর্জ এলিয়টের তুলনায় খুবই তুচ্ছ ঔপন্যাসিকরুপে। পুরুষ মেনে নিতে পারে নি। নারীর সাহিত্যসাধনাকে, কেননা এটা পুরুষের এলাকা; তাই নারীকে পুরুষ বার বার ফেরত পাঠাতে চেয়েছে। ঘরের ভেতরে, সরাসরি রান্নাঘরে। যেমন জগদীশ্বরী দেবীর দ্ৰৌপদী কাব্য সম্পর্কে দীনেশচন্দ্র সেন (১৩১২, ৪০০) বলেছেন :
‘গ্রন্থকর্ত্রী যদি কাব্যশালা হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া রন্ধনশালার ভার গ্রহণ করেন, তবে অনেক উপাদেয় সামগ্ৰী প্রস্তুত হইতে পারে–সে স্বাভাবিক পন্থা ছাড়িয়া তিনি ভিন্ন উপায়ে লোকরঞ্জনের প্ৰয়াসী হইয়া মোটেই ভাল করেন নাই।‘
দীনেশচন্দ্ৰ সাহিত্য সমালোচনায় ব’সে ভুলতে পারেন নি যে কবিটি নারী, তাঁর কাজ রান্না করা। পশ্চিমের পুরুষতান্ত্রিক সমালোকেরা নারীসাহিত্য সমালোচনার নামে সাধারণত মাপেন বইয়ের বক্ষ ও নিতম্ব, সম্ভোগ করেন নারীদের বই; বাঙালি সমালোচকেরা তা পারেন না। সমাজিক কারণে, তাই তারা খাদ্যের মতো আস্বাদন করেন নারীসাহিত্য। স্বামী হিশেবে যেমন তারা পরখ করেন স্ত্রীর রান্না, সমালোচক হিশেবে তেমনি স্বাদ নেন সাহিত্যরান্নার। বাঙালি পুরুষের কাছে নারীসাহিত্য এক ধরনের পাকপ্ৰণালি, যা আসল পাকপ্ৰণালির থেকে নিকৃষ্ট। রান্নাবান্নার থেকে উৎকৃষ্ট, নারীর জন্যে শ্ৰেষ্ঠ, কাজ হচ্ছে স্বামীসেবা; তাই নারীসাহিত্য তখন প্রশংসা পেয়েছে, যখন তা স্বামী ও সংসারসেবার গান গেয়েছে। ভারতীতে (১৩১৬, ৪৬৮)। অজ্ঞাতনাম এক সমালোচক শরৎকুমারীর শুভবিবাহ উপন্যাসটি আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সাহিত্য-সেবারতা, নিষ্ঠাবতী শরৎকুমারীর পতিভক্তি ও সংসারপালনদক্ষতা প্রভৃতি প্রকৃতই অনুকরণীয়।’ তাঁর সাহিত্যের মূল্য নেই, মূল্যবান তাঁর পতিভক্তি ও সংসারপালনদক্ষতা। নারী কিছু লিখেছে, এটাই আপত্তিকর; তার ওপর যদি তাতে থাকে পাণ্ডিত্য, তবে তা হয়ে ওঠে। দ্বিগুণ আপত্তিকর। পুরুষের প্রিয় হচ্ছে মূখ্য নির্বোধ নারী, পুরুষের কাছে প্ৰিয় নারীর শান্ত সরলতা; নারী যখন শান্ত সরলতার সীমা পেরিয়ে যায়, তখন সহ্য করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। পুরুষের পক্ষে। শরৎচন্দ্ৰ, যিনি নারীর পক্ষে লিখেছিলেন নারীর মূল্য (১৩২০), তিনিও নারীর পাণ্ডিত্যের ঝাজ সহ্য করতে পারেন নি। অনিলা দেবী ছদ্মনামে শরৎচন্দ্ৰ লেখেন ‘নারীর লেখা’ (১৩১৯) নামে একটি নারীসাহিত্যবিদ্বেষী প্ৰবন্ধ। নারীনামের ছদ্মবেশে লুকিয়ে নারীকে আক্রমণ করা পুরুষের এক প্রিয় হীন স্বভাব। এতে তিনি উপহাস করেন নারী লেখকদের–আমোদিনী ঘোষজায়া, অনরূপ দেবী ও নিরুপমা দেবীকে; পরিহাস করেন তাদের পাণ্ডিত্যকে, উপহাস করেন তাদের অভিজ্ঞতার অভাবকে; ধরেন তাদের নানা রকমের ভুল, এবং উড়িয়ে দেন নারীসাহিত্যকে, যেনো সাহিত্যচর্চা নারীদের জন্যে অনধিকারচর্চা। কুমুদিনীমোহন নিয়োগী (১৩২৯, ৬৮৫) এক লেখিকাকে প্রশংসা ক’রে লিখেছেন : ‘তাঁর রচনার একটি প্রধান বিশেষত্ব–সরলতা আর শান্ত সংযত ভাব। অনেক নারীর রচনায় দেখি, পাণ্ডিত্যের ঝাজ এমনি তীব্ৰ হল্কা ফুটাইয়া রহিয়াছে যে গা একেবারে জুলিয়া যায়। এই ঝােজ ইন্দিরা দেবীর রচনায় মোটেই নাই।’ ঝাজ সৃষ্টির অধিকার শুধু পুরুষের; নারী ঝােজ সৃষ্টি করবে না, এমন কিছু করবে না। যা পুরুষের অহমিকাকে পীড়িত করতে পারে। নারী যদি সাহিত্য সৃষ্টি করতেই চায়, তাহলে সে এমনভাবে করবে, যা উপাদেয় হবে পুরুষের রসনায়।
প্রভুর দর্শনে দীক্ষিত হয় অসংখ্য দাসদাসী, অসংখ্য নারী ও দীক্ষিত হয়। পুরুষের মন্ত্রে; আজো অনেক নারী গলগল ক’রে উচ্চারণ করে প্রভুপুরুষের মন্ত্র। যেমন, নগেন্দ্ৰবালা সরস্বতী নারীধৰ্ম্ম কাব্যের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘সংসারে রমণীগণ প্ৰেমগ্ৰীতির আকরম্বরূপ। তাহাদেরই স্নেহ-মমতা-পবিত্রতায় সংসার শান্তিময়, এই জন্যই হিন্দু সংসারে রমণীগণ দেবীবৎপূজনীয়া। কিরূপে রমণীগণ নিজ নিজ কৰ্ত্তব্য পালন পূৰ্ব্বক নারীধৰ্ম্ম রক্ষা করিয়া–সংসারে অমৃত স্রোত প্রবাহিত করিতে পারেন, কিরূপে নারীচরিত্রে প্রকৃত দেবীচরিত্র প্রতিভাত হইতে পারে, এই নারীধৰ্ম্মে তাহারই আলোচনা করিয়াছি।’ এতে খুব গ্ৰীত হওয়ার কথা পুরুষের, যেমন হয়েছেন চন্দ্ৰশেখব মুখোপাধ্যায় (১৩১০, ১৯৯)। তিনি নারীধৰ্ম্ম এর প্রশংসা করেছেন এভাবে :
