লুসি ইরিগারের প্রথম বই চিত্তভ্রংশতার ভাষা (১৯৭৩) বেশ সুদূর নারীবাদী লক্ষ্য থেকে, কিন্তু দ্বিতীয় বই অপর নবীর অবতল দৰ্পণ-এ (১৯৭৪) তিনি নারীবাদের জন্যে পেশ করেন গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, এবং এ-বইয়ের জন্যে তিনি বহিষ্কৃত হন লার্কর ফ্রয়োড়ীয় ইস্কুল থেকে। বইটি অতিবিতর্কিত। ১৯৭৭-এ বেরোয় এই লিঙ্গ যা একটি নয়, এর পর বরোয় এবং একজন অপরজনকে ছাড়া আলোড়িত হয় না (১৯৭৯), ফ্রিডরিখ নিটশের জলীয় প্রেমিক (১৯৮০), মায্যের সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ (১৯৮১), প্রাথমিক সংরাগ (১৯৮২)। তাঁর অবতল দিপর্ণ-এর প্রথম ভাগে রয়েছে ফ্রয়েডের নারীমনোবিজ্ঞানের কঠোর সমালোচনা, তবে তিনি মিলেটের মতো মনোবিজ্ঞানকে সহজাতভাবে প্রতিক্রিয়াশীল বলে বাদ দেন নি। বইটি তিনি ফ্ৰযোডকে দিয়ে শুরু এবং প্রাতোকে দিয়ে শেষ ক’রে নষ্ট ক’রে দেন স্বাভাবিক কালানুক্রম। এ-বইয়ের গঠনের সাথে মিল রয়েছে স্ত্রীরোগবিদদের ব্যবহৃত অবতল দর্পণের, যা দিয়ে তারা নারীদেহের নানা রন্ধ পর্যবেক্ষণ করে। তাঁর রচনাপদ্ধতি বিসাংগঠনিক। জুলিযা ক্রিস্তেভা বুলগেরীয়, ১৯৬৬তে আসেন প্যারিসে। রোল বার্তা তার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘জুলিয়া ক্রিস্তেভা বস্তুর স্থান বদলে দেন; তিনি ধ্বংস করেন অতিসাম্প্রতিক পৰ্ব্বধারণা, তিনি ধ্বংস করেন কর্তৃত্ব, একযৌক্তিক বিজ্ঞানের কর্তৃত্ব’ [দ্র মোই (১৯১, ৫, ১৫০)। তাঁর বইয়ের মধ্যে রয়েছে কাব্যভাষার বিপ্লব (১৯৭৪), ভাষায় কামনাবাসিনা (১৯৮০), বিভীষিকার ক্ষমতা (১৯৮০) প্রভৃতি। ক্রিস্তেভার প্রধান প্রবণতা ভাষার সমস্যা বিশ্লেষণ। তাঁর মতে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ভাবাদর্শগত ও দার্শনিক ভিত্তিটি কর্তৃত্বপরায়ণ ও পীড়নবাদী। ক্রিস্তেভা, রুশ ভাষাবিজ্ঞানী ভোলোসিনোভের মতো, ভেঙে দিতে চান ভাষাবিজ্ঞান, অলঙ্কারশাস্ত্র ও কাব্যতত্ত্বের মধ্যবর্তী দেয়াল, এবং তৈরি করতে চান একটি নতুন ক্ষেত্র, যার নাম পাঠগত তত্ত্ব।
২৪. নারীদের নারীরা : নারীদের উপন্যাসে নারীভাবমূর্তি
উপন্যাসের উদ্ভব ঘটেছিলো নানা উদ্দেশ্যে; তার একটি নারীদের নীতিশিক্ষা দেয়া, অর্থাৎ শুরু থেকেই উপন্যাসের বিশেষ লক্ষ্যবস্তু নারীরা। পশ্চিমের পুঁজিবাদী পুরুষেরা চেয়েছিলো নারী উপন্যাস উপভোগ ও উপন্যাসের ফল ভোগ করবে, সতী হবে, এবং রমণীর গুণে সুখে ভ’রে উঠবে সংসার। তখন তারা ভাবে নি ওই নারীও উপন্যাস লিখবে একদিন, শোনাবে নিজের মর্মান্তিক পুরুষপীড়িত জীবনকাহিনী। পুরুষ নারীর সৃষ্টিশীলতায় বিশ্বাস করে নি কখনো, আজো সন্দেহের চোখে দেখে নারীর সমস্ত সৃষ্টিকে; সাধারণত তাকে স্বীকৃতি দেয় না, বা দেয় নিজেরই স্বার্থে। বাঙলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস লেখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এক বিদেশিনী, হেনা ক্যাথেরিন মুলেন্স, যিনি ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) নামের একটি উপন্যাস-খসড়ায় নারীদের দিতে চেয়েছিলেন খ্রিষ্টীয় করুণার শিক্ষা, পুরুষের ছক অনুসার ঢালাই করতে চেয়েছিলেন নারীদের। বাঙালি নারীরা যখন প্রথম উপন্যাস লেখা শুরু করে, তখন পুরুষ এ-কাজকে অনাচার বলেই গণ্য করে; আজো বাঙালি পুরুষ তাদের সম্পূর্ণরূপে স্বীকার ক’রে নেয় নি। তবে বাঙালি নারী উপন্যাসে হাত দিতে দেরি করে নি; পুরুষের প্রথম উদ্যোগের দু-দশকের মধ্যেই বেরোয় নারীর প্রথম উপন্যাস : স্বর্ণকুমারী দেবীর দীপনির্বাণ (১৮৭৬) { তার অন্য কয়েকটি উপন্যাস ছিন্ন মুকুল (১৮৭৬), বিদ্রোহ (১৮৯০), স্নেহলতা (১৮৯২), ফুলের মালা (১৮৯৪), হুগলীর ইমামবাড়ী (১৮৯৪), কাহাকে (১৮৯৮)। অল্প পরেই দেখা দেন জনপ্রিয় অনুরূপা দেবী ও নিরুপমা দেবী, তাঁরা দুজনে লেখেন প্রচুর উপন্যাস। নিরুপমার উপন্যাস অন্নপূর্ণর মন্দির, দিদি। (১৯১৫). বিধিলিপি (১৯১৭), শ্যামলী (১৯১৮); অনুরূপার উপন্যাস মন্ত্রশক্তি (১৯১৫), মহানিশা (১৯১৯), মা (১৯২০), গারবের মেয়ে, পথহারা, ক্রিবেণী (১৯২৮), জ্যোতিঃহারা, চক্র; এবং দেখা দেন প্ৰভাবতী দেবী সরস্বতী, শৈলবালা ঘোষজায়া, সীতা দেবী, শান্তা দেবী, ও আরো অনেকে। ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন যে উপন্যাস নারীর একান্ত শিল্পাঙ্গিক, বাঙালি নারীরা তার কথাকে অনেকখানি সত্যে পরিণত করেছে।
বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস জনপ্রিয় হয়েছিলো, কিন্তু তা পুরুষের কাছে গুরুত্ব পায় নি; বরং উপহাসের সামগ্ৰী হয়েছে। তারা প্রচুর উপন্যাস লিখেছেন, বিক্রিও হয়েছে প্রচুর; তবে তা হয়ে আছে এক উপসংস্কৃতিধারা, যেনো তা নারীদেব জন্যে নারীদের লেখা, পুরুষের মূলধারার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অযোগ্য। বঙ্কিমচন্দ্ৰ নারীদের উপন্যাসকে দেখেছেন আত্মম্ভরী পুংসুলভ করুণা ও উপহাসের চোখে। তিনি বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকদের গোণার মধ্যেই ধরেন নি, তখনো তারা দেখা দেন নি বলেই শুধু নয়, দেখা দিলেও পুছতেন না তিনি তাঁদের; তিনি পশ্চিমের প্রধান নারী ঔপন্যাসিকদেরও করুণা করেছেন। কমলাকান্তের দপ্তর-এ (১৮৭৫) মনুষ্য ফল’ রচনায় কমলাকান্তের মুখে বঙ্কিমচন্দ্ৰ বলেছেন :
‘তার পরে মালা–এটি স্ত্রীলোকের বিদ্যা–কখন আধখানা বৈ পূরা দেখিতে পাইলাম না। নারিকেলের মালা বড় কাজে লাগে না; স্ত্রীলোকের বিদ্যাও বড় নয়। মেরি সমরবিল বিজ্ঞান লিখিয়াছেন, জেন অষ্টেন বা জর্জ এলিয়ট উপন্যাস লিখিয়াছেন-মন্দ হয় নাই, কিন্তু দুই মালার মাপে।‘
