পিতৃতন্ত্রের সাথে বেশ কিছুটা মিটমাটের উদাহরণ ‘বোরকা’ প্ৰবন্ধটি } তিনি এতে যে শিকার হয়েছেন স্ববিরোধিতার, তা নিজেও বুঝেছেন; তাই আত্মসমর্থনের যে-চমৎকার প্রতিভা ছিলো তাঁর, তা তিনি প্রযোগ কবেছেন পুরোপুরি। তিনি বলেছেন, ‘তাহারা প্রায়ই আমাকে ‘বোরক’ ছাড়িতে বলেন। বাল, উন্নতি জিনিসটা কি? তাহা কি কেবল বোরকার বাহিরেই থাকে? যদি তাই হয় তবে বুঝিবে যে জেলেনী, চামারনী, কি ডুমুনী প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা আমাদের অপেক্ষা অধিক উন্নতি লাভ করিয়াছে’। (বোরকা’,রোর, ৫৬)? বোরকা জিনিশটি কুৎসিত, মধ্যযুগীয় পিতৃতন্ত্র এটি চাপিয়ে দিয়েছে নারীর ওপর, এটা তার বোঝার কথা; তবু তিনি এর পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি কি মনে করেছিলেন যে নারী উন্নতি করবে। বোরকার ভেতরে থেকেই? তা কি হবে না নারীর জন্যে চরম গ্রানিকরা? অবরোধপ্রথার উদ্ভব ঘটে নারী সম্পর্কে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ইসলামি ধারণা থেকে যে নারী হচ্ছে ‘ফিৎনা’। ইসলামি বিশ্বাস হচ্ছে যে নারীর কাম প্রবল, তা নষ্ট ক’রে দিতে পারে সমাজশৃঙ্খলা; তাই নারীকে রুদ্ধ করে রাখতে হবে অবরোধে। ইসলামি ধারণায় নারী মানসিক শক্তিতে দুর্বল, সে নিজের কামকে বশে রাখতে পারে না; তাই নারীর কামের গ্রাস থেকে সমাজকে বাচানোর জন্যে নারীকে আটকে রাখতে হবে অবরোধে, তাকে ঢেকে দিতে হবে বোরকায়। রোকেয়া বোরকা মেনে নিয়েছেন, খুব অবজ্ঞা করেছেন ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী’কে, কেননা তিনি চেয়েছেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীর কল্যাণ; এবং একটি কথা বুঝতে চান নি যে তাঁর অবজ্ঞার ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনীরা আসলেই অনেক উন্নতি করেছে অবরুদ্ধ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীদের থেকে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীরা যেখানে অপদাৰ্থ, ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী’রা সেখানে অনেক মুক্ত। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ত বিশ্বাস যে, অবরোধের সহিত উন্নতির বেশী বিরোধ নাই’ (রোর, ৫৭)। ‘বেশী বিরোধ নাই’ ব’লে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে অবরোধ ও উন্নতির মধ্যে বিরোধ রয়েছে, এবং তিনি বোরকার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ক্রমশ চ’লে গেছেন নিজেরই বিপক্ষে।
তিনি বলেছেন, ‘অবরোধ-প্ৰথা স্বাভাবিক নহে-নৈতিক।…মানুষের ‘অস্বাভাবিক’ সভ্যতার ফলেই অন্তঃপুরের সৃষ্টি’ (রোর, ৫৭)। ‘স্বাভাবিক’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন অসভ্যতাকে, আর অস্বাভাবিক’ বলতে সভ্যতাকে; তিনি সভ্যতা ও অস্বাভাবিকতার পক্ষে, তাই অবরোধেরও পক্ষে। যদি তিনি মেনে নেন সভ্যতার সৃষ্টি অন্তঃপুরকে, তাহলে তাকে মেনে নিতে হয়। অন্যান্য বিধানও। তিনি নৈতিকতার কথা বলেছেন, এ-নৈতিকতা পুরুষতন্ত্রের নৈতিকতা; যে-পুরুষতািন্ত্ৰ মনে করে নারী ফিৎনা বা বিশৃঙ্খলা। রোকেয়৷ কি নিজেকে ফিৎনা ব’লে স্বীকার করবেন? রোকেয়ার পক্ষে স্বাভাবিক ছিলো পুরুমকে বোরকা পরানোর প্রস্তাব করা, যেমন করেছেন তিনি ‘সুলতানার স্বপ্ল’-এ, পুরুষকে ঢুকিয়েছেন। অবরোধে। তিনি বোরকার পক্ষে একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন (রোর, ৫৮) :
‘বেলওয়ে প্লাটফরমে দাঁড়াইয়া কোন সন্ত্রান্ত মহিলাই ইচ্ছা করেন না যে, তাহার প্রতি দর্শকবৃন্দ আকৃষ্ট হয়। সুতরাং ঐরুপ কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকেব। ঘৃণা, উদ্রেক করিলে কোন ক্ষতি নাই।.. রেলওয়ে ভ্ৰমণকালে সাধারণের দৃষ্টি (public gaze) হইতে বাক্ষা পাইবার জন্য ঘোমটা কিম্বা বোরকার দবকার হয়।’
যদি রেলস্টেশনে কোনো মহিলা দর্শক আকৃষ্ট করেন, তবে ্দোষটা কার? মহিলার, না লোলুপ দর্শকের? যে-অপরাধ পুরুষের, তার জন্যে শাস্তি পাবেন মহিলা? তিনি ‘কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকের ঘৃণা উদ্রেক ক’রে রক্ষা করবেন পর্দা? রোকেয়া অবরোধবাসিনীতে রেলস্টেশনে নারীর দুরবস্থার বেশ কয়েকটি শোচনীয় কাহিনী বলেছেন, আর তিনিই চাচ্ছেন নারী বোরকা পরে সেখানে পুরুষের মনে ঘৃণা জাগিয়ে আত্মরক্ষা করবে। তিনি অবরোধের পক্ষে দিয়েছেন সভ্যতার দোহাই : ‘সকল সভ্য জাতিদেরই কোন-না-কোন রূপ অবরোধ-প্ৰথা আছে (রোর, ৫৯)। তিনি জানেন যে তথাকথিত সভ্যতা হরণ করেছে নারীর অধিকার, আর তিনি লড়াই করছেন ওই পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার বিরুদ্ধেই। তিনি অবরোধের পক্ষে একটি ভুল যুক্তি দিয়েছেন : ‘আমরা যে এমন নিস্তেজ, সঙ্কীর্ণমনা ও ভীরু হইয়া পড়িয়াছি, ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই- শিক্ষার অভাবে হইয়াছে’ (রোর, ৬১)। অবরোধ ও শিক্ষা একসাথে চলতে পারে না; কাউকে মহাপণ্ডিত ক’রে যদি রেখে দেয়া হয়। অবরোধে, তাহলে সে তেজপূর্ণ, মহৎ সাহসী হবে না; ব্যর্থ হয়ে যাবে তার শিক্ষা; শিক্ষিত হওয়ার পরও সে থাকবে পুরুষের দাসী ও কামসামগ্ৰী। তবে রোকেয়া জানেন। অবরোধ ক্ষতিকর; তিনি বলেছেন (রোরা, ৫৯-৬০) :
‘আমাদের অববোধ-প্রথাটা বেশী কঠোর হইযা পড়িষাছে … ঐ সকল কৃত্রিম পর্দা কম (numderate ); কবিতে হইবে 1. আমরা অন্যান্য পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব।…বোরকাব আকৃতি অত্যন্ত মোটা (c(parse) হইয়া থাকে। সুহাকে কিছু সুদর্শন কবিতে হইবে।‘
তিনি অবরোধকে সুদৰ্শন করার প্রস্তাব করেছেন, চেয়েছেন মসৃণ অবরোধ; কিন্তু অবরোধ হচ্ছে অবরোধ, তা কোনো মসৃণতা জানে না। ‘বোরকা’ রচনাটিতে বিস্ময়করভাবে রোকেয়ার ওপর চেপে আছে আরব পিতৃতন্ত্র, এবং তিনি বিচ্যুত হযেছেন নিজের স্বভাব থেকে। ধৰ্মকর্মের কথাও রোকেয়া বলেছেন। পুরুষতন্ত্রের চাপে, কিন্তু ভালোভাবে চোখ দিলে দেখি যে ধর্মকে রোকেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ব’লে ভাবতেন না। ‘বঙ্গীয় নারী-শিক্ষা সমিতি : সভানেত্রীর অভিভাষণ’-এ (রোর, ২৮২) রোকেয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন :
