রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। পুরুষতন্ত্রের বদলে নারীতন্ত্র, পুরুষাধিপত্যের স্থলে নারী-আধিপত্য। তার ডিক্টোপিয়াধর্মী রূপকথাগুলোতে সমাজের দুরবস্থার জন্যে সম্পূর্ণরূপে দায়ী করেছেন তিনি পুরুষদের, যারা তার চোখে সমস্ত দোষের সমষ্টি। তারা অপদাৰ্থ, দায়িত্বহীন, অবিবেচক, মিথ্যাবাদী, এবং সমাজরাষ্ট্র পরিচালনার অযোগ্য। তার ‘জ্ঞানফল’-এ দেশটির নাম কনকদ্বীপ হ’লেও সেটি বসবাসের অযোগ্য: পুরুষেরা সেটি নষ্ট করেছে। রোকেয়া বাইবেলি স্বৰ্গচ্যুতির উপাখ্যানটি ব্যাখ্যা করেছেন নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, এবং ওই পতনই তার কাছে গ্ৰহণযোগ্য, নির্বোধের স্বৰ্গ গ্রহণযোগ্য নয়। নারী যে আগে নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলো একে তিনি নিয়েছেন নারীর গৌরব হিশেবে, কেননা নারীরই রয়েছে জ্ঞানের প্রতি সহজাত আকর্ষণ : ‘ফল ভক্ষণ করিবামাত্র হাভার জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত হইল।. এই সময় তথায় আদম গিয়া উপস্থিত হইলেন। হাভা তাঁহাকে স্বীয় হস্তস্থিত ফল খাইতে অনুরোধ করিলেন। পত্নীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে আদমেরও জ্ঞানোদয় হইল’ (রোর, ১৮০)। রোকেয়ার বর্ণনায় আদম নির্বোধ পুরুষ, জ্ঞানের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ নেই। ‘পত্নীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে’ কথাটি তাৎপর্যপূর্ণ; রোকেয়া বোঝাতে চান পুরুষ জ্ঞানী নারীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানে। আদম শুধু নির্বোধ, উচ্ছিষ্টভোজীই নয়, সে অমানিবকও; রোকেয়ার হাওয়া তার কন্যাদের বর দিয়ে দীর্ঘায়ু করেছে, কিন্তু আদম- ‘তাঁহার ইচ্ছাশক্তি তাদৃশ প্রবল না থাকায়’- পুত্রদের কোনো বক্স দেয় নি। ওই দ্বীপের পতন ঘটেছিলো পুরুষেরা ‘নারীর আহৃত জ্ঞানে নারীকেই বঞ্চিত করিয়ছিল’ (রোর, ১৮৮) ব’লে। মুক্তিফল’ও আরেক অ্যান্টি-ইউটোপিয়া, ভোলাপুরেরও পতন ঘটে নারীকে অধিকারহীন ক’রে রাখার ফলে। সেখানে নারীর অধিকারের মাত্রা প্ৰকাশ পেয়েছে ভাই প্ৰবীণের উক্তিতে : ‘না বোন, তোমাকে কৈলাস পর্যন্ত যাইতে দিতে পারি না। তুমি আমার সহিত গল্প কর, উপন্যাস পাঠ কর, আমার সঙ্গে পারমার্থিক গান গাও-এই পর্যন্তই যথেষ্ট, ইহা অপেক্ষা অধিক স্বাধীনতা বা সমকক্ষতা দিতে পারি না’ (রোর, ২:১২)। নারীকে দেয়া হয়েছে গল্প করার. উপন্যাস পড়ার, আর ‘পারমার্থিক গান গাওয়ার স্বাধীনতা; ভোলাপুর যে ভারতবর্ষ তাতে কোনো সন্দেহ নেই!
পুরুষের সৃষ্ট অ্যান্টি-ইউটোপিয়ার বর্ণনা রোকেয়াকে তৃপ্তি দিতে পারে নি, কেননা সেখানকার নষ্ট সমাজে নারীও অসুস্থ। তাই রোকেয়া পুরুষের সমাজকেই অস্বীকার ক’রে প্রতিষ্ঠা করেন তার নারীস্থান। রোকেয়ার পক্ষে অসম্ভব ছিলো Sultana’s Dream বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ না লেখা; কেননা নারীতন্ত্র বা নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত দেখা ছিলো তার জন্যে অনিবাৰ্য। এজন্যে তাকেই লিখতে হয় বাঙলা ভাষায় প্রথম ও শেষ ইউটোপিয়া; সম্ভবত কোনো এশীয় ভাষায়ও এটিই একমাত্র ইউটোপিয়া। পচিশ বছরের এক আমূল নারীবাদী তরুণীর নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে ‘সুলতানার স্বপ্ল’-এ, যা কোমলমধুর। কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহায় ক্ষমাহীন নির্মম। রোকেয়া ব্যাপকভাবে নারীস্থানেব সমাজজীবন উপস্থাপিত করেন নি, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করেছেন। পুরুষদের। পুরুষের ওই দেশে কী প্রয়োজন, তা তিনি বলেন নি; তবে প্রতিশোধগ্রহণের জন্যে পুরুষদের অত্যন্ত দরকার ছিলো সেখানে। রোকেয়া পুরুষজাতিটিকেই বাদ দিতে পারতেন। ওই সমাজ থেকে, কিন্তু তিনি দেন নি; তিনি হয়তো মনে করেছেন সামাজিকভাবে পুরুষ দরকার, তবে তার চেয়ে বেশি দরকার পুরুষপীড়নের জন্যে। রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া; তিনি কোনো আদিম স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেন নি, সৃষ্টি করেছেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞাননির্ভর সমাজ, কেননা বিজ্ঞানই শুধু মুক্তি দিতে পারে নারীকে। রোকেয়া নারীর শারীরিক দুর্বলতা সম্পর্কে ছিলেন সচেতন, তাই কোনো আদিম আর্কেডিয়া তার কাজে আসতো না; তার দরকার ছিলো এমন শক্তি, যা শারীরিক শক্তিকে সহজেই পরাভূত করে। বিজ্ঞান সে-শক্তি, তাই রোকেয়ার নারীস্থান বিজ্ঞাননির্ভর। রোকেয়ার নারীস্থান তাঁর স্বদেশের বিপরীত : ‘ভারতে পুরুষজাতি প্ৰভু,- তাহারা সমুদয় সুখ-সুবিধা ও প্ৰভুত্ব আপনাদের জন্য হস্তগত কবিয়া ফেলিয়াছে, আর সরলা অবলাকে অন্তঃপুর রূপ পিঞ্জরে রাখিয়াছে’ (রোর, ১৩৭)! তিনি তার নারীস্থান থেকে মুছে ফেলেছেন ভারতবর্ষের সমস্ত সামাজিক ব্যাধি। ‘সুলতানার স্বপ্ন রোকেয়ার নারীতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়ের ও পুরুষতন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়ের কাহিনী।
যে-পুরুষতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে ধারাবািহক লড়াই করেছেন রোকেয়া, তার সাথে কি তিনি কিছুটা সন্ধি করেছিলেন। কখনো কখনো? পিতৃতন্ত্রের সাথে সন্ধির কিছুটা পরিচয় রয়েছে তাঁর রচনাবলিতে। পিতৃতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থাটির সাথে, সম্ভবত বাধ্য হয়ে, তিনি সন্ধি করেছেন মাঝেমাঝে; কিন্তু খুব বেশি ছাড় দেন নি সেটিকে। চব্বিশ বছর বয়সে তিনি প্ৰচণ্ড আক্রমণ করেছিলেন ধর্মকে, ওই আক্রমণের পরেও যে তিনি টিকে ছিলেন তার কারণ তখন পরিবেশ ছিলো ভিন্ন: আজ হ’লে রাস্তায় তার লাশ পাওয়া যেতো, ব। তিনি নিন্দিত জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন নির্বাসনে। তার ওপর নিশ্চয়ই পড়েছিলো মুসলমান পিতৃতন্ত্রের প্রবল চাপ। তিনি বুঝেছিলেন টিকে থাকতে হ’লে কিছুটা সন্ধি পাতিয়ে নিষ্ক্রিয় ক’রে দিতে হবে পিতৃতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থাটিকে। তিনি মাঝেমাঝে ধর্মকর্মের কথা বলেছেন, কিন্তু প্রথাগত ধর্মে তার অন্ধ আস্থা ছিলো না। তার নারীস্থানেও ধর্ম আছে : সেখানে ‘ধর্মবিধান’ হচ্ছে ‘প্রেম ও সত্য’, যা খুবই প্রথাবিরোধী। তিরিশোত্তর রোকেয়া ধর্মের কথা কিছু বলেছেন, এবং অবরোধবাসিনীদের ভয়াবহ জীবন আঁকার পাশাপাশি অবরোধের পক্ষেও বলেছেন কিছু কথা। শুনে স্তম্ভিত বোধ করি যখন অবৰ্বোধিবাসিনীর রোকেয়া বলেন, ‘আমি অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হই নাই’ (অর্ধাঙ্গী’, রোর, ৩৫)!! নিশ্চয়ই বড়ো একটা চাপের মধ্যে পড়েছিলেন তিনি তখন।
