‘মুসলমান বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে কোবান শিক্ষাদান করা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন ,। আপনাবা কেহ মনে কবিবেন না যে, প্রাথমিক শিক্ষাধঃ সঙ্গে সঙ্গে কোবান শিক্ষা দিতে বলিয়া আমি গোড়ামীব পবিচয় দিলাম। তাহা নহে, আমি গোড়ামী হওঁতে বহু দূৰে! প্রকৃত কথা এই যে, প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়!’
তিনি বালিকাদের কোরান শেখাতে চেয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষার সাথে, কারণটিও বলে দিয়েছেন : ‘প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়। তিনি ইসলামি পিতৃতন্ত্রের সাথে সুর মিলিয়ে বলেন নি যে সব শিক্ষাই পাওয়া যায় ওই গ্রন্থে; তিনি বলেছেন প্ৰাথমিক শিক্ষার জন্যে ওই গ্রন্থটি উৎকৃষ্ট। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য।
পুরুষতন্ত্র নারীকে কয়েকটি ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করেছে; তার একটি গৃহিণীর ভূমিকা। রোকেয়া নারীর প্রথাগক ভূমিকায় বিশ্বাসী ছিলেন না, কিন্তু গৃহিণীর ভূমিকাটি তিনি মেনে নিয়েছিলেন। এটা তার একান্ত নিজের বিশ্বাস থেকে নয়, অন্যদেব বিশ্বাসকে তিনি দিয়েছিলেন স্বীকৃতি। তিনি প্রশ্ন করেছেন : ‘আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি? বোধ হয় আপনারা সমস্বরে বলিবেন, ‘সুগৃহিণী হওয়া’ (সুগৃহিণী,রোর, ৪৫)। বোকেয়া সুগৃহিণী হওয়াকে যে বড়ো কাজ বলে স্বীকার করেছেন, তা নয়; তবে তিনি মেনে নিয়েছেন। পুরুষতন্ত্রের এ-বিধানটি। বলেছেন, ‘পুরুষ বিদ্যালাভ করেন। অন্ন উপার্জনের আশায়’, আর আমরা উচ্চশিক্ষা লাভ (অথবা Mental Culture) করব। কিসের জন্যে? আমি বলি, সুগৃহিণী হওয়ার নিমিত্তই সুশিক্ষা (Mental Culture) আবশ্যক’ (রোর, ৪৫-৪৬)। সুশিক্ষার উদ্দেশ্য সুগৃহিণী হওয়া? তাহলে কি সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে পড়ে না শিক্ষা? যে-কাজ অশিক্ষিত পরিচারিকা করতে পারে একটু যত্ন নিলে, বা চিরকাল ধরে ক’রে আসছে নিরক্ষর সুগৃহিণীরা, তার জন্যে সুশিক্ষা এক প্রচণ্ড অপচয়। রোকেয়া ঘরকন্নার ক্লান্তিকর কাজের যে-দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন : ‘গৃহ এবং গৃহসামগ্ৰী পরিষ্কার ও সুন্দরীরূপে সাজাইয়া রাখা, পরিমিত ব্যয়ে সুচারুরূপে গৃহস্থলী সম্পন্ন করা, রন্ধন ও পরিবেশন, সূচিকর্ম, পরিজনন্দিগকে যত্ন করা, সন্তানপালন করা’ (রোর, ৪৬), এবং সেগুলো সম্পন্ন করার যে-রীতি নির্দেশ করেছেন, তাতে সুগৃহিণী হয়ে ওঠে একটি শিক্ষিত দাসী, শিক্ষার শোচনীয় অপব্যয়। রোকেয়া নিশ্চয়ই উন্নত জাতের দাসী উৎপাদনের জন্যে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন নি। রোকেয়া সূর্যোিত্তাপে রান্না’র স্বপ্ন দেখেছিলেন গৃহিণীকে ক্লান্তিকর ঘরকন্না থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যে, কিন্তু ‘সুগৃহিণীতে তিনি গৃহিণীর ওপর যে-ভার চাপিয়ে দেন তাতে খুব খুশি হবে পুরুষতন্ত্র। তারা তাদের স্ত্রীদের শিক্ষা দেয়ার জন্যে খুব ব্যগ্র হয়ে উঠবে, কিন্তু শুধু নষ্ট হয়ে যাবে রোকেয়ার নারীরা।
পুরুষতন্ত্রের সাথে, বাধ্য হয়ে, সামান্য সন্ধির কথা বাদ দিলে রোকেয়া হয়ে ওঠেন পৃথিবীর এক শ্ৰেষ্ঠ আমূল নারীবাদী, পিতৃ-ও পুরুষ-তন্ত্রকে যিনি ধারাবাহিক আক্রমণে বিপর্যস্ত করে গেছেন। কিন্তু বঙ্গীয় মুসলমান পুরুষতন্ত্র তাকেও নিষ্ক্রিয় ক’রে দিয়েছে, এবং তিনি যে-উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি ক’রে গেছেন, তাঁরা বহু দূরে স’রে গেছেন তার চেতনা থেকে। তার উত্তরাধিকারী নারীবাদ f হয়েছেন ‘ভদ্রমহিলা’, স্বামীর শিক্ষিত দাসী ও প্রমোদসঙ্গিনী, সামাজিক সুবিধাভোগী, এবং তারা ব্যৰ্থ ক’রে দিয়েছেন রোকেয়াকে।
বঙ্গীয় ভদ্রমহিলা : উন্নত জাতের নারী উৎপাদন
উনিশ শতকেব। বাঙলা দেখতে পায় এক অভিনব জাতের নারীর উদ্ভব, যার সাথে মিল নেই তার আগের নারীদের। বাঙলার নারী আগের হাজার বছর ধরে ছিলো গাঢ় অন্ধকারে; তার নিজের কোনো সত্তা ছিলো না, স্বাধীনতার কথা সে কখনো শোনে নি, তার কোনো স্বপ্ন ছিলো কিনা তা কেউ জানে না। পুরুষ তাকে পশুর থেকেও নিকৃষ্টরূপে বঁচিয়ে রেখেছে, আগুনে পুড়েছে, ইচ্ছেমতো গ্ৰহণ করেছে ও ছেড়েছে, তাকে অবরোধের কারাগারে আটকে রেখেছে। উনিশ শতকে পিঞ্জরাবদ্ধ পাখি ছিলো নারীর জনপ্ৰিয়তম রূপক, তবে আবহমান বাঙালি নাৰী পিঞ্জর বা ‘সোনার খাচা’য় পোষা ময়না ছিলো না; সে ছিলো পশুর থেকেও নিকৃষ্ট, পশুকেও মূল্যবান গণ্য করেছে বাঙালি পুরুষ কিন্তু নারীকে কখনো মূল্যবান মনে করে নি। তার জন্ম ছিলো বাঙালি পুরুষতন্ত্রের জন্যে বিভীষিকা, তার মৃত্যু ছিলো তৃপ্তিকর। তার সাথে পুরুষ কখনো আন্তরিক সম্পর্কে আসে নি, তার শরীরকেও কখনো পরিতৃপ্ত করে নি ব’লেই মনে হয়, যদিও তার ‘মদন আট গুণ’ বলে তাকে ধিক্কার দিয়েছে। শতাব্দীপরম্পরায় বাঙালির জন্ম হয়েছে পুরুষের ক্ষণিক উত্তেজনায়, অক্রিয় নারীদেহ ক্ষণিক পীড়নের ফলে। উনিশশতকের আগের বাঙালি নারী সম্পূর্ণ মুখাবয়বহীন, পুরুষতন্ত্রের যুপকাঠে রক্তাক্ত উৎসৰ্গিত একটি প্রাণী নারী। এ-অঞ্চলেব দুটি সম্প্রদায়, হিন্দু ও মুসলমান, প্রবল পিতৃতান্ত্রিক; উনিশশতক পর্যন্ত তার বাস করেছে গভীর মধ্যযুগীয়তার মধ্যে, এখনো তারা সম্পূর্ণ উঠে আসে নি ওই মধ্যযুগ থেকে বরং সেখানে ফেরার জন্যে তারা আজ খুবই ব্যগ্ৰ। ঐতিহাসিকভাবে এ-অঞ্চলে অধিকাংশ পুরুষেরই কোনো স্বতন্ত্র সত্তা ছিলো না, তারাই ছিলো মুষ্টিমেয় সমাজপতির প্রচণ্ড পীড়নের শিকার; তাই নারীর দুরবস্থা ছিলো এখানে শোচনীয়তম। তারা ক্রীতদাসের ক্রীতদাসী ছিলো না, তারা ছিলো পশুর অধীনে পশুতর নারী।
