‘ইতিহাসেবী পাতা উল্টিয়ে, এবং চাবপাশেব জগতের দিকে উদ্বিগ্ন উৎকণ্ঠায় তাকিয়ে আমার চেতনা পীড়িত হয়েছে বেদনার্তা ক্ষোভের সবচেয়ে বিষণু আবেগে, এবং আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। একথা স্বীকার করে যে হয়তো প্রকৃতিই পুরুষ ও নারীর মধ্যে সৃষ্টি করেছে বড়ো বিভেদ, নয়তো পৃথিবীতে এ-পর্যন্ত যে-সভ্যতাব বিকাশ ঘটেছে, তা খুবই পক্ষপাতপূর্ণ।‘
নারীপুরুষের প্রাকৃতিক বিভেদের কথাটা তাঁর নয়, প্রথাগতদের; তিনি বিশ্বাস করেন। যে সভ্যতা একদেশদশী, বিভেদ মানুষেরই সৃষ্টি। তিনি বেছে নিয়েছেন মধ্যবিত্ত নারীদের বলেছেন, ‘আমি বিশেষ মনোযোগ দেবো মধ্যবিত্তদের প্রতি, কেননা তারাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় আছে বলে মনে হয়।’ তিনি তার সময়ের নারীদের জানতেন ভালোভাবে, যারা পুরুষতন্ত্রের সমস্ত বাজে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলো মন দিয়ে; তিনি চান তাদের বিপরীত দৃষ্টিকোণ দেখতে, ও ভিন্ন মানুযে পরিণত করতে। মেরি বলেছেন [ভূমিকা] :
‘আমাক লিঙ্গশ্রেণীষীরা, আশা করি, আমাকে ক্ষমা করবেন, যদি আমি তাদের রমণীয় রূপের তোষামোদ করার বদলে তাদের গণ্য কবি বুদ্ধিমান প্রাণীরূপে, এবং যদি আমি মনে না করি যে তারা রয়ে গেছেন চিবশৈশবে, যারা নিজের দাড়াতে পারেন না।‘
তার লিঙ্গশ্রেণীয়রা দুর্বল সব দিকে, তিনি তাদের উদ্দীপ্ত করতে চেয়েছেন, যাতে তারা শরীর ও মন উভযেরই শক্তি অর্জনের চেষ্টা করেন :’ নারীর যে-অবস্থা তিনি দেখেছেন :
‘একমাত্র উপায়ে নবীরা পৃথিবীতে দাঁড়াতে পাবে-বিয়ে বসে। এ-কামনা তাদের পশুতে পরিণত কবে, যখন তাদের বিয়ে হয় তখন তারা এমন আচরণ কবে যা শুধু শিশুদের কাছেই আশা করা যায। -তারা সাজগোজ করে, তারা বস্তু মাখে।‘
মেরি তার বইটি উৎসর্গ করেছিলেন ফরাশি রাজনীতিক নেতা ট্যালিরাদের নামে। পােচ পাতার উৎসর্গবক্তব্যে তিনি কতকগুলো দাবি জানান, বলেন, ‘আমি আমার লিঙ্গের পক্ষে দাবি করছি, নিজের জন্যে নয়।’ ফরাশি বিপ্লবের বাণী ছিলো তায় সমস্ত চেতনা জুড়ে, তা তিনি প্ৰকাশ করেছেন স্পষ্ট ভাষায় [উৎসর্গ] :
‘স্বাধীনতাকে আমি দীর্ঘ কাল ধবে আমার জীবনের শ্ৰেষ্ঠ ধন, সব গুণেব ভিত্তি বলে গণ্য ক’রে আসছি, আমার সব চাওয়া সংকুচিত ক’রে হ’লেও আমি নিশ্চিত করবো। আমার স্বাধীনতাকে, যদি আমাকে উষর প্ৰান্তরে বাস করতে হয় তবুও।’
একটি মৌলিক প্রশ্ন করেছেন মেরি : ‘চরম বিচারক ক’রে কে তৈরি করেছে পুরুষদের?’ তিনি দাবি করেছেন নারীপুরুষের সাম্য, যার মূলে রয়েছে তাঁর নৈতিকবোধ ও বিশ্বাস যে পীড়ন অশুভ পীড়নকারী ও পীড়িত দুয়ের জন্যেই { তিনি বলেছেন, ‘তারা সুবিধাজনক দাসী হতে পারে, তবে দাসত্ত্বের বিক্রিয়া ঘটে সব সময়, তা পতিত করে প্রভুকে এবং তার শোচনীয় আশ্ৰিতকে ৷’
ভিন্ডিকেশন-এর প্রথম দু-পরিচ্ছেদের নাম মানুষের অধিকার ও দায়িত্ব বিবেচনা’ ও লৈঙ্গিক চরিত্র সম্পর্কে প্রচলিত মতামত বিবেচনা’। মেরি এ-দু-পরিচ্ছেদে নারী ও তার ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত মত আলোচনা ক’রে দেখিয়েছেন সেগুলোর ভ্রান্তি, এবং বর্জন করেছেন সেগুলো। শতাব্দী পরম্পরায় সবাই বলেছে ও লিখেছে। বিধাতাই নারীকে তৈরি করেছে। পুরুষের থেকে হীন ক’রে, নারী সহজাতভাবেই নিকৃষ্ট; একে তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন ‘বাজে কথা’ ব’লে। তাঁর কাছে মানুষের বৈশিষ্ট্য বুদ্ধি বা যুক্তিশীলতা; তিনি স্বীকার করতে রাজি নন যে বিধাতা নারীকে মানুষ হিশেবে তৈরি করে তারপর কেড়ে নিয়েছে তার বুদ্ধিবিবেচনা। মেরির মতে মানুষ ও সভ্যতার অগ্রগতির বড়ো বাধা স্বেচ্ছাচারী অবৈধ ক্ষমতা, এবং ক্ষমতাসংঘগুলো ব্যক্তি ও সমাজকে পীড়ন করে দূষিত ক’রে ফেলেছে। মেরি স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার চরম প্রতিপক্ষ, তিনি ঘৃণা করেন উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত ক্ষমতাকে; ভিন্ডিকেশন-এ বার বার মেরি প্রকাশ করেছেন তার ঘেন্না। তিনি বলেছেন, যে-সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অন্যদের ওপর আধিপত্য করে উত্তরাধিকারলদ্ধ ধন ও ক্ষমতার মতো কৃত্ৰিম অধিকার দিয়ে, তারা হয়ে ওঠে তোষামোদপরায়ণ, অলস, অগ্রগতির প্রতিবন্ধক। প্ৰচণ্ড আক্রমণ করেছেন মেরি অভিজাততন্ত্র, সেনাবাহিনী, ও গির্জাকে, কেননা এগুলো স্বেচ্ছাচারী শক্তিসংঘ। মেরি (১৭৯২, ৯৩) বলেছেন, ‘উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত মর্যাদা, ধন, রাজত্ব থেকে উৎসারিত হয়েছে।’ অশেষ দুৰ্দশা; এবং সব ধরনের ক্ষমতাই দুর্বল মানুষদের মাতাল করে তোলে; এবং এর অপব্যবহার প্রমাণ করে যে মানুষের মাঝে যাতে, বেশি সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে সমাজে ততো বেশি বিরাজ করবে। নৈতিক উৎকর্ষ ও সুখ’ (১৭৯২, ৯৬)।
মেরি রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, সেনাবাহিনী, পুরোহিততন্ত্রের করেছেন প্রবল সমালোচনা, কেননা এগুলো টিকে আছে উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাচারী শক্তির ওপর ভর ক’রে। তিনি বলেছেন এসব সংস্থা যতোদিন আছে, ততোদিন অসম্ভব পরিবর্তন, তাই দরকার এসব সংস্থার বিলোপসাধন। মেরি নারীর অবস্থার একটু-আধটু উন্নতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না; নারীর অবস্থা একটু ভালো করা হ’লে, বা একদল অভিজাত নারীকে একটু ওপরে উঠোনো হ’লে সমস্যার সমাধান হবে না, তাই তিনি চেয়েছেন সার্বিক বদল। তিনি বলেছেন, সামাজিক ও আর্থ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বদল ছাড়া সমাজের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বদল ঘটবে না। উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত ধন, ক্ষমতা সবই যুক্তি ও পরিবর্তনের প্রতিবন্ধক। সমাজের সম্পূর্ণ বদলের কথা না বলে শুধু নারীর অবস্থাবদলের কথা তাঁর কাছে ছিলো নিরর্থক, কেননা যে-শ্বেস্বচ্ছাচারী শক্তি পীড়ন করছে নারীকে, সে-শক্তিই আধিপত্য করছে সমাজের অধিকাংশ পুরুষের ওপর। মেরি বার বার চমৎকার আক্রমণ করেছেন উত্তরাধিকাপ্ৰাপ্ত স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকে, দেখিয়েছেন। ওগুলো কীভাবে রোধ করছে মানুষের মুক্তি। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে মেরি দেখিয়েছেন। পুরুষতন্ত্র নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্যে কীভাবে ভিন্ন ক’রে দিয়েছে নারীদের ভূমিকা, নারীকে দিয়েছে সাফল্যের ভিন্ন আদর্শ, ‘নিষ্পাপতা’র নামে রেখে দিয়েছে ‘অজ্ঞানতা’র মধ্যে। নারীকে কী শিক্ষা দেয়া হয়? মেরি (১৭৯২, ১০০) বলেছেন :
