‘বাল্যকাল থেকেই নারীদের বলা হয়, এবং তাদের মাদের উদাহরণ দেখিযে, শিক্ষা দেয়া হয, যে পুরুষের দুর্বলতা সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞান, যাকে ঠিকভাবে বলতে হয় চতুরতা, নাম মেজাজ, দেখানো আনুগত্য, বালসুলভ শোভনতার প্ৰতি সতর্ক মনোযোগেব সাহায্যেই তারা পাবে পুরুযের বক্ষণাবেক্ষণ; আর যদি রূপসী হয়, তাহলে তাদের জীবনের কমপক্ষে বিশ বছবের জন্যে আর কিছুর দরকার নেই।‘
এভাবেই নষ্ট ক’রে দেয়া হয়েছে নারীকে। পুরুষ নারীর মধ্যে চেয়েছে ‘নমতা ও মধুর আবেদনময়ী সৌন্দর্য’, নারীকে ক’রে রাখতে চেয়েছে ‘চিরশিশু’, দেয় নি তাকে বিকশিত হতে। নারীকে যে-শিক্ষা দেযা হয়েছে, তা শুধু নিরর্থকই নয়, ক্ষতিকরও। মেরি (১৭৯২, ১০৩) বলেছেন :
‘আমাকে দুর্বিনীত বলতে পাবেন, তবু আমি যা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস কবি তা আমাকে বলতে হবে যে রুশো থেকে ৬৪ গ্রেগবি পর্যন্ত যাব নালীশিক্ষা ও ভদ্রতা সম্পর্কে লিখেছেন, তথবা সবাই নারীকে সাহায্য করেছেন আবো কৃত্রিম, দুর্বল চরিত্রেব হয়ে উঠতে, এবং পবিণামে তাদের ক’রে তুলেছেন মাজের আরো বেশি অপদাৰ্থ সদস্য।‘
তিনি দেখিয়েছেন নারীদের দেয়া হয়েছে যে-শিক্ষা, তা তাদের পরিণত করেছে। পুরুষের ভোগ্যবস্তুতে। নারীকে তার বুদ্ধির বিকাশ ঘটাতে দেয়া হয় নি, তাকে উ ৎসাহিত করা হয়েছে ইন্দ্ৰিয়ের বিকাশ ঘটাতে। মস্তিষ্কহীন নারী ও সেপাইয়ের তুলনা ক’রে মেরি (১৭৯২, ১০৬) বলেছেন, ‘তাদের শেখানো হয়েছে। অন্যদের সন্তোষ বিধান করতে, এবং তারা বেঁচে আছে শুধু সন্তোষবিধানের জন্যে!’ রুশো ছিলেন মেরির প্ৰিয়, কিন্তু মেরি রুশোর নারীতত্ত্ব বাতিল ক’রে দিয়েছেন যুক্তিসম্মতভাবে। রুশো শিক্ষা দিয়েছেন নারী মুহূর্তের জন্যেও নিজেকে স্বাধীন ভাধিবে না, পুরুষের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় ক’রে তোলার জন্যে নারী হবে আবেদনময়ী ছেনাল, নারী হবে পুরুষের অবসর বিনোদনের মধুর সহচরী! মেরি (১৭৯২, ১০৮) একে বলেছেন, ‘হোয়াট ননসেন্স!’ নারীকে যে প্রেমের কথা বেশি ক’রে শোনানো হয়, তারও বিরুদ্ধতা করেছেন মেরি, কেননা তা নারীকে দুর্বল ক’রে তোলে। নারীকে সমাজ একরাশ বাজে শিক্ষা দিয়ে যে অদ্ভুত প্ৰাণীতে পরিণত করেছে, মেরি তা আলোচনা ক’রে বাতিল ক’রে দিয়েছেন। পুরুষ সম্পর্কে মেরি (১৭৯২, ১২১) বলেছেন :
‘পুরুষকে আমি ভালোবাসি আমার সমকক্ষ সঙ্গী হিশেবে; তবে তার রাজদণ্ড, সত্য বা আরোপিত, যেনো আমার দিকে প্রসারিত না হয়, যদি না কোনো ব্যক্তির যুক্তিবুদ্ধি দাবি কবে আমার শ্ৰদ্ধানুগত্য, এমনকি তখনো আমার আনুগত্য হবে তার বুদ্ধির কাছে, পুরুষটির কাছে নয়।‘
নারী এতোদিন ধরে পুরুষের অধীন রয়েছে বলেই যে নারী পুরুষের থেকে নিকৃষ্ট এটা মেরির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা সমান, তাই তারা পালন করবে। একই মানবিক দায়িত্ব। মেরি (১৭৯২, ১৩৯) বলেছেন, ‘আমি মেনে নিচ্ছি যে নারীর রয়েছে ভিন্ন দায়িত্ব পালনের ভার; তবে সেগুলো হবে মানবিক দায়িত্ব, এবং আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি যে সে-সব পালনের নীতিও হবে অভিন্ন।’
ভিন্ডিকেশন-এর চতুর্থ পরিচ্ছেদ বিভিন্ন কারণে নারী যে-অধঃপতিত অবস্থায় পৌচেছে, সে-সম্পর্কে মন্তব্য’। মেরি বলেছেন, নারী প্রাকৃতিকভাবেই দুর্বল, না পরিস্থিতির প্রভাবে দুর্বল এটা স্পষ্ট; এবং তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে নারী পরিস্থিতির শিকার। মেরির মতে নারী বর্তমানকে উপভোগ করতে গিয়ে, ভবিষ্যতের কথা না ভেবে নষ্ট করেছে নিজেকে। মেরি মনে করেন ‘নারীকে শুধু পুরুষের বিনোদেব জন্যে সৃষ্টি করা হয় নি, এবং তার লৈঙ্গিকতা নষ্ট ক’রে দেবে তার মানবিকতা, তা হ’তে পারে না।’ পুরুষ নারীকে ক’রে রাখতে চেয়েছে লৈঙ্গিক প্রাণী, নারীকেও শিখিয়েছে যে লৈঙ্গিক প্রাণী হওয়াই তার জন্যে ভালো! নারীকে করতে দেয়া হয় নি বুদ্ধির চর্চা, তার প্রবৃত্তিকে ক’রে তোলা হয়েছে প্রধান। মেরি বলেছেন, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে সাধারণ সূত্র তৈরি করার শক্তিই জ্ঞান, কিন্তু নারীকে দেয়া হয় নি তার সুযোগ। পুরুষ নারীকে এ-শক্তিলাভের সুযোগ তো দেয়ই নি, বরং প্রচার করেছে যে, নারীর লৈঙ্গিক স্বভাবের সাথে জ্ঞান সামঞ্জস্যহীন। মেরির মতে বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার সুযোগ না পেয়েই পতন ঘটেছে নারীর; তারা মেতে উঠেছে বা তাদের মাতিয়ে তোলা হয়েছে স্থল ইন্দ্ৰিয়চর্চায়। নারীর পেশা হয়েছে বিনোদন করা, নারী রূপের সার্বভৌমত্বকে মেনে নিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে তার স্বাধীনতাকে, এবং বোধ করেছে ‘হীনতার গৌরব’! নারীকে শেখানো হয়েছে তুচ্ছ সব ব্যাপারে গৌরব বোধ করতে। মেরি দেখিয়েছেন উপন্যাস, সঙ্গীত, কবিতা নারীকে ক’রে তুলেছে ইন্দ্ৰিয়াতুর প্রাণী; তারা সব কিছু অর্জন করতে চায় রূপ ও দুর্বলতা দিয়ে। তারা ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে, শ্যই সব কিছুতে নির্ভর করে পুরুষের ওপর।
ভিন্ডিকেশন-এর পঞ্চম পরিচ্ছেদ কয়েকজন লেখক, যারা নারীকে পরিণত করেছেন করুণার পাত্রে, যা প্রায় মানহানির কাছাকাছি, তাদের সমালোচনা’। অসামান্য, এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী, পরিচ্ছেদ এটি; এটি নারীবাদীদের অনুপ্রাণিত করে চলছে দু-শো বছর ধ’রে। এটির প্রেরণায় আধুনিক নারীবাদীরা বাতিল ক’রে দিয়েছেন সাম্প্রতিক অনেক মহাপুরুষকে, যেমন মেরি বাতিল করেছিলেন রুশো ও অন্যদের। মেরি অনুরাগী ছিলেন রুশোর, বিশ্বাসী ছিলেন তাঁর রাজনীতিক আদর্শে; কিন্তু রুশোর নারীদর্শন তাঁর কাছে মনে হয়েছে অত্যন্ত আপত্তিকর, কেননা তা নারীকে পুরুষাধীন রাখার দর্শন। উদ্ধৃতির পর উদ্ধৃতি দিয়ে মেরি বাতিল করেছেন রুশোকে, দেখিয়েছেন রুশোর প্রতিক্রিয়াশীলতা। মেরির আলোচনার পর রুশো আর রুশো থাকেন না, হয়ে ওঠেন এক বিভ্রান্ত দার্শনিক, র্যাব নারীতত্ত্ব গ্রহণ করলে মানুষের মুক্তির কথা হয়ে ওঠে হাস্যকর প্রলাপ। মেরি দেখিয়েছেন রুশো তার নিজের দর্শনের করুণ শিকার; তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। উদারনীতিক আদর্শের সাথে। মেরি বলেছেন, রুশোর যেখানে দেখা উচিত ছিলো যুক্তি দিয়ে, সেখানে তিনি দেখেছেন আবেগ দিয়ে; এবং নারীকে নষ্ট করেছেন। নারী সম্পর্কে রুশোর তত্ত্বকে মেরি বলেছেন ‘পুংস্বৈরাচার’। রুশোর আদর্শ নায়িকা সোফি মেরির কাম্য নারীর সম্পূর্ণ বিপরীত। রুশো চান পুরুষনির্ভর রূপসী ছেনাল; মেরি চান স্বাধীন, চরিত্রসম্পন্ন নারী, যে আর্থিকভাবে আত্মনির্ভর। রুশোর কাছে যা রমণীয়, মেরির কাছে তা অনৈতিক ও বিপজ্জনক। রুশোর আদর্শ নারী একই সাথে নির্বোধি ছেনাল ও শোচনীয় সতী। রুশো নারীকে শিখিয়েছেন স্বামী স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে অসতী’ও বললে নারী তার প্রতিবাদ করবে না; সে অভিযোগ মেনে নিয়ে থাকবে স্বামীর অনুগত। মেরির মতে এটা নারীকে সম্পূর্ণ নষ্ট করার কুশিক্ষা। মেরি রুশোকে যেমন বাতিল করেছেন তেমনই বাতিল করেছেন জেমস ফোরডাইস ও ডঃ গ্রেগরিকে। তখন খুব প্রভাবশালী ছিলো ফোরডাইসের সারামনুস টু ইয়াং উইমেন (১৭৬৫), দি ক্যারেক্টর অ্যান্ড কভাক্ট অফ দি ফিমেল সেক্স (১৭৭৬), ও গ্রেগরির লেগাসি টু হিজ ডটার। মেরি দেখান এঁদের ভ্রান্তি। এ ছাড়া মাদাম গেনলিসের লেটার্স অন এডুকেশন, লর্ড চেষ্টারফিল্ডের লেটাস ও আলোচনা ক’রে দেখান এগুলোর অপশিক্ষা। এ-পরিচ্ছেদে মেরি পরিষ্কার করেন বিপুল আবর্জনা, যা এতোদিন চলছিলো দর্শন ও প্রাজ্ঞতার নামে।
