কিন্তু জীবন তখনো অপেক্ষা ক’রে ছিলো তার জন্যে; মৃত্যু থেকে উঠে এসে মেরি ঢোকেন জীবনে : এনকোয়ারি কনসারনিং পলিটিকেল জাষ্টিস-এর (১৭৯৩) আলোড়নজাগানো লেখক দার্শনিক উইলিয়াম গডউইনের সাথে গ’ড়ে ওঠে তার হৃদয়সম্পর্ক। গডউইনের সাথে সম্পর্কের সময়টা মেরির জীবনের সবচেয়ে সুখের সময়: ওই দার্শনিক ভালোবেসেছিলেন মেরিকে, ও মেরির লেখাকে। মেরির মৃত্যুর পর তিনিই লিখেছিলেন মেবিন্ন অকপট জীবনী, ও সম্পাদনা করেছিলেন মেরির রচনাবলি; মেরি ও গডউইন কেউই বিশ্বাস করতেন না বিয়েতে: তাদের কাছে বিয়ে ছিলো কৃত্রিম চুক্তি, যা সৎমানুষের জন্যে অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু তারা, মেরি গর্ভবতী হয়ে পড়লে, বিয়ে করেন। সন্তান প্রসবের জন্যে যখন অপেক্ষা করছিলেন মেরি, তখন তিনি লিখে চলছিলেন রিংস অফ উইমেন (১৭৯৮) নামে একটি উপন্যাস! মেরি যখন সুখী, তখনই পরিহাসের মতো এগিয়ে আসে মৃত্যু। নারীবাদের মহানারী, বিয়েতে অবিশ্বাসী। কিন্তু বিবাহিত, মেরি মৃত্যু বরণ করেন নারীদেরই এক পুরোনো শাস্তিতে; সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যু হয় মেরির ১৭৯৭-এর আগস্টে, আটত্রিশ বছর বয়সে। তিনি উপহার দিয়ে যান একটি মেয়ে, যার নাম মেরি গডউইন শেলি : পৃথিবীর বিখ্যাততম গথিক উপন্যাস ফ্ল্যাংকেনস্টাইন-এর লেখিকা, কবি শেলির দ্বিতীয় স্ত্রী।
মেরি ভিডিকেশন লিখেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন পশ্চিমে চলছিলো প্ৰচণ্ড সামাজিক রাজনীতিক ভাঙাগড়া, যখন বিপ্লব ছিলো অধিকাংশের স্বপ্ন। ফ্রান্সে তখন বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ঘোষণা করা হচ্ছিলো সাধারণ মানুষের অধিকার, বিলেতে আমূল্যবাদীদের ভয়ে শংকিত হয়ে পড়ছিলো অভিজাততন্ত্র। ওই আমূল্যবাদেরই এক উৎসারণ মেরির ভিন্ডিকেশন / তারা তখন প্রশ্ন তুলছিলেন সমস্ত প্রচলিত সামাজিক রাজনীতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে অনুপ্রাণিত ছিলেন লক ও রুশোর মত দিয়ে যে রাজা বা অভিজাততন্ত্র ক্ষমতার অধিকারী নয়, সাধারণ মানুষই সাৰ্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। বিলেতে তখন অধিকাংশ মানুষেরই ছিলো না। সাধারণ নাগরিক অধিকার, সব অধিকার ছিলো অভিজাতমগুলির। সেটা টম পেইনের রাইটস্ অফ ম্যান-এর কাল। যে-বোধ থেকে পেইন লিখেছিলেন ব্লাইটুসূ অফ ম্যান, সে-বোধেই মেরি লিখেছিলেন রাইটস্ অফ ওমান! মেরির আগেও কেউ কেউ বলেছেন নারীর ভূমিকা ও অধিকারের কথা, তবে মেরি তাদের মতো ক’রে বলেন নি; মেরি বলেছেন নিজের বিপ্লবী রীতিতে। তিনি কোনো পুরোনো ধারার উত্তরাধিকারী নন, তিনিই স্রষ্টা এক নতুন ধারার, যাকে এক সময় বলা হতো নারীমুক্তি আন্দোলন, এখন বলা হয় নারীবাদ। মেরি নারীর অধিকারের কথা বলতে গিয়ে তুলে ধরেন। সমগ্র রাজনীতিক ও সামাজিক সংশ্রয়কে, যা নারীপুরুষের জীবনের সাফল্য সম্পর্কে তৈরি করেছে দ্বৈত মানদণ্ড, নারীকে ঠেলে দিয়েছে নিকৃষ্ট অবস্থানে, করেছে। পুরুষাধীন। বিলেতে তখন নারী ছিলো পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই শোচনীয় অবস্থায়; ধর্ম সমাজ, আইন সব কিছুই নারীকে ক’রে রেখেছিলো। মনুষ্যেতর। গরিব নারীদের শেষ ছিলো না দুৰ্দশার, আর অভিজাত নারীরা জীবন যাপন করছিলো বিলাসী পশুর জীবন। মেরির আগে যারা নারীর অবস্থাবদলের কথা বলেছেন, তারা কেউ নারীর মুক্তির কথা বলেন নি; তারা বলেছেন। পুরুষাধীন থেকে নারীর আরেকটুকু ভালো থাকার কথা। তাঁরা সবাই প্রচার করেছেন যে পুরুষের কাছে মোহনীয়, রমণীয় হওয়াই নারীর সার্থকতা। সে-সমযে, যে-নারীরা কিছুটা মুক্তি’ পেয়েছিলেন, যারা ‘নীলমুজো’ নামে বদনাম অর্জন করেছিলেন, তারাও প্রথাগত ধারণা থেকে দূরে যান নি, তারাও বিশ্বাস করতেন নারীর সহজাত নিকৃষ্টতায়।
এ ভিডিকেশন অফ দি রাইটস্ অফ ওম্যান সুশীল ভদ্ৰবই বা কোনো সুশীলা ভদ্ৰবালার লেখা বই নয়, এটি বিপ্লবীর লেখা বিপ্লবী বই। মেরি চিত্তবিনোদন করতে বা ঘুম পাড়াতে চান নি, চেয়েছেন জাগিয়ে তুলতে। তিনি লিখতে চেয়েছেন উপকারী বই, বলেছেন, ‘আমার লক্ষ্য উপকারে আসা। বইটির প্রতি অনুচ্ছেদে ছড়িয়ে আছে মেরির তীব্র ব্যক্তিত্ব, তার কৌতুক ও ক্ৰোধ জ্বলে উঠেছে বার বার। মেরি নারীর অধিকারের কথা বলেছেন, তবে বলেছেন প্রধানত মধ্যবিত্ত নারীর কথা। উচ্চবিত্ত নারীদের তিনি ঘেন্না ও করুণা করতেন, বিশ্বাস করতেন যে উচ্চবিত্ত শ্রেণীটি লুপ্ত হয়ে যাবে। দারিদ্র্য তার চোখে মহান ছিলো না, দারিদ্র্যের নির্মমতার সাথে খুব ভালোভাবেই পরিচিত ছিলেন মেরি; তাই নিম্নবিত্তদের জন্যে তার দরদের অভাব না থাকলেও কীভাবে তাদের সমস্যার সমাধান হবে, তা তিনি বলেন নি। তিনি বলেছেন মধ্যবিত্ত নারীদের কথা, কেননা তারাই রয়েছে ‘স্বাভাবিক অবস্থায়’। মেরি তাঁর বইয়ের শুরুতে, প্রথম তিন পরিচ্ছেদে, প্রতিষ্ঠা করেছেন মৌল নীতিগুলো, যার ওপর ভিত্তি ক’রে তিনি দাবি করেছেন নারীর অধিকার। তারপর তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রতিবেশের প্রভাবে বিকৃত হয়েছে নারীরা; দেখিয়েছেন। আঠারোশতকের নারীবিরোধী ধারার কয়েকজনের, বিশেষ ক’রে রুশোর লেখার প্রতিক্রিয়াশীলতা ও ভ্ৰান্তি। শেষে আলোচনা করেছেন নারীর অবস্থান, শিশুশিক্ষা, পরিবার প্রভৃতি সম্পর্কে।
মেরির লক্ষ্য ছিলো সুস্পষ্ট, বইটির প্রতি পাতায় তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে নারীপুরুষের অসাম্য মানুষের তৈরি ব্যাপার। বইয়ের শুরুতে, ভূমিকার প্রথম বাক্যেই মেরি বলেছেন :
