‘তরুণীর নিজের বলতে আছে শুধু দেহখানি : এটি তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ; যে-পুরুষটি তার ভেতরে প্রবেশ করে, সে এটি গ্রহণ করে তার থেকে;.যে-অপমান সে আশংকা করেছে তা পরিণত হয়। সত্যে : তাকে পরাভূত করা হয়, সম্মত হতে বাধ্য করা হয়, জয় করা হয়। অধিকাংশ প্রজাতির মাদিটির মতো, সঙ্গমের সময় সে থাকে পুরুষটির নিচে। অ্যাডলাব এ থেকে উৎপন্ন হীনমন্যতার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বাল্যকাল থেকেই উচ্চমন্যতা ও হীনমন্ট, তার ধারণা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; উঁচু গাছে ওঠা কৃতিত্ব; স্বর্গ পৃথিবীর ওপরে, নরক নিচে; পড়ে যাওয়া, নিচে নামা ব্যর্থতা; ওপরে ওঠা সাফল্য; কুস্তিতে জিততে হলে প্রতিপক্ষের কােধ মাটির সাথে লাগিয়ে দিতে হয়। এতে, নারীটি পড়ে থাকে পরাজয়ের ভঙ্গিতে: তার চেয়েও খারাপ হচ্ছে পুরুষটি তার ওপর চড়ে থাকে যেভাবে সে চাবুক হাতে বল্পা ধ’রে চড়ে কোনো পশুর ওপর। সে নিজেকে সব সময় বোধ করে অক্রিয়; তাকে শৃঙ্গার করা হয়, বিদ্ধ করা হয়; সে ভোগ করে সঙ্গম, আর পুরুষটি নিজেকে প্রয়োগ করে সক্রিয়ভাবে।’
সঙ্গমের আসনও আধিপত্য-অধীনতার প্রকাশ? অসুস্থ সভ্যতায় সব কিছুই যেখানে রাজনীতি, সব কিছুই যেখানে নির্দেশ করে আধিপত্য-অধীনতার সম্পর্ক, সেখানে অন্তরঙ্গতম ব্যাপারটিও হয়ে ওঠে আধিপত্য-অধীনতার প্রতীক। বাইবেলের ভাষ্যকারেরা বুঝেছিলেন এর রাজনীতিটুকু, পুরুষ ওপরে নারী নিচেই তাঁদের মনে হয়েছে প্রাকৃতিক বিধিবদ্ধ আসন। নুহের প্লাবনের কারণ হিশেবে তাঁরা দেখিয়েছেন নারীপুরুষের বিপরীত বিহারকে, যাতে ‘নারীরা প্ৰভুত্ব করে পুরুষের ওপর’ [দ্র ফিজেস (১৯৭০, ৫১)]।
পুরুষতন্ত্রে প্রধান পুরুষের কাম; তবে নারীর রয়েছে কামসুখভোগের অধিকতর শক্তি। কাম অনেকাংশে পুরুষের একটি প্রত্যঙ্গের কাজ; কয়েক মুহূর্তে স্থলিত হ’তে পারলেই পুরুষ মুক্তি পায়। কিন্তু নারীর কাম তার পরিস্থিতির মতোই জটিল বহুস্তরিক। কোনো স্থলনে যেহেতু তার কামনার সমাপ্তি ঘটে না, তার কাম যেহেতু তার সমগ্ৰ শরীর ও চেতনায় ছড়িয়ে পড়ে, সে যেহেতু হঠাৎ জ্বলে উঠে৷ হঠাৎ নিভে যায় না, তার সূচনা থেকে সমাপ্তি যেহেতু ধীরমন্থর জলস্রোতের মতো, তাই সুখ। যেমন তাকে পরিষ্যাপ্ত করতে পারে, তেমনই সুখের অভাবও তাকে জ্বালাতে পারে দীর্ঘ সময় ধ’রে। সঙ্গমে চূড়ান্ত আত্মবিলোপ ঘটে নারীর; সে ডুবে যায় অক্রিয় অবসন্নতায়, তার চোখ বুজে আসে, যেনো ভেসে যায় ঝড় প্লাবনে অনন্ত অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, প্রবেশ করে মাংস, জরায়ু, কবরের অন্ধকারে। নারীর মতো চূড়ান্ত আত্মবিলুপ্তির মধ্যে কাম পুরুষ কখনো উপভোগ করতে পারে না; পুরুষকে থাকে সচেতন, তার সচেতনতা তার বড়ো বাধা। নারীর জন্যে সঙ্গম ধ্যান, ধ্যানে আত্মসচেতনতা বিঘ্নকর; পুরুষের জন্যে সঙ্গম কাজ, কাজে আত্মসচেতনতা অপরিহার্য। তাই ওই ধ্যানের সময় নারীকে ডাকলে, কেমন লাগছে জানতে চাইলেও সে বিরক্ত বোধ করে; কেননা অনির্বাচনীয়কে সে উপলব্ধি করতে চায় অনির্বাচনীয়রূপেই। ষাটের দশকে নারীর কাম সম্পর্কে মাস্টার্স ও জনসনের (১৯৬৬) গবেষণা পশ্চিমে নারীকে অনেকখানি মুক্তি দেয়। পুরুষের কােমাধিপত্য থেকে; এবং নারীবাদীরা ঘোষণা করেন তাদের কামসার্বভৌমত্বের কথা। কয়েক দশক আগে ভোটাধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তাদের কাছে, ষাটের দশকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কামাধিকার। এর ফলে পশ্চিম মুক্তি পায় ভিক্টোরীয়বাদ নামের রোগ থেকে, নারী অনেক বেশি উপভোগ করে তার শরীর। ষাটের দশকে নারী ফিবে পায় তার শরীর।
মাস্টার্স ও জনসন নারীর যৌন সাড়াকে ভাগ করেছেন চারটি পর্বে : উত্তেজনাপর্ব, অধিত্যকাপর্ব, পুলকপির্ব, ও শমাপর্ব। পুরুষও যায় এ-চারটি পর্বের ভেতর দিয়ে; তবে তাদের প্রত্যঙ্গের ভিন্নতা অনুসারে উপভোগ করে ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
উত্তেজনাপর্ব : এর সূচনা ঘটে কোনো পুরুষের শরীরসংস্পর্শে, তবে কোনো পুরুষকে দেখেও এবা সূচনা ঘটতে পারে। বিভিন্ন নারী বছরের বিভিন্ন সময় বোধ করে বিশেষ উত্তেজনা; কেউ ঋতুকালে, কেউ চক্রের মধ্যভাগে, কেউ ঋতুসূচনার আগে বোধ করে তীব্ৰ কাম-উত্তেজনা। সব ধর্মেই ঋতুকালে সঙ্গম নিষিদ্ধ, যদিও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অনেক নারী এ-সময়েই বেশি কাম বোধ করে। এ-সময়টা নিরাপদও, গর্ভসূচনার কোনো সম্ভাবনা নেই। নারীর উত্তেজনাপর্ব পুরুষের উত্তেজনাপর্বের থেকে দীর্ঘ, পুরুষ যতো সহজে উত্তেজিত হয়ে পড়তে পারে নারী তেমন হয় না। এ-পর্বে স্তনবৃন্ত খাড়া হয়ে ওঠে, ভগাঙ্কর আয়তনে বাড়ে, ‘ওষ্ঠগুলো’ কোমল পুরু হয়ে স্ফীত হয়, যোনি সিক্ত হয়; এবং রক্তপ্রবাহের ফলে তুকে দেখা দিতে পারে ঝিলিক, যাকে বলা হয় ‘কাম ঝিলিক’।
অধিতাক পৰ্ব : উত্তেজনাপর্বেরই সম্প্রসারণ অধিত্যকাপর্ব, উত্তেজনাপর্বে যা কিছুর সূচনা ঘটে, এ-পর্বে সে-সব পেঁৗছে তুঙ্গে। নারী এ-পর্বে ভেতরে চায় শিশ্ন। এ-পর্বে জরায়ুর গ্ৰীবা বৃদ্ধি পায়, যোনিরন্ধও বাড়ে। এর ফলে যোনির গভীরদেশে তৈরি হয় একটি থলের মতো এলাকা, যেখানে ঘটবে বীর্যপাত। এ-সময় যোনির বাইরের দিকটা বেড়ে এ-এলাকাটির ব্যাস হ্রাস পায়। মাস্টার্স ও জনসন একে বলেছেন ‘পুলকমঞ্চ’। অধিত্যকাপর্ব যতো দীর্ঘ হয় ততোই সুখকর নারীর জন্যে।
