পুলকপর্ব: পুলক শরীরমিলনের লক্ষ্য। পুলক এক অনির্বচনীয় অনুভূতি; নারী এ-পর্বে বোধ করে তীব্রতম সুখ, যা প্রতি নারীর জন্যে অনন্য। পুলকই কাম্য, কেননা তা নরনারীকে পৌঁছে দেয় সুখের শিখরে; একে ভয়ও পায় অনেকে। ফরাশিরা একে বলে ‘ছোটো মৃত্যু’। নারীর পুলকের সূচনা হয় শ্রোণীদেশে, পরে ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। এর সূচনা ঘটে স্তব্ধতায়, তারপর ঘটে। অদম্য পেশিসঞ্চালন, শিহরণ, ভাসমানতার অনুভূতি, উষ্ণতা, মানসিক উত্তেজনামুক্তি, ও উল্লাস। পুলক ঘটে প্রতিবর্তীতার ফলে। ভগাঙ্কুরের সাথে শিশ্ন, ওষ্ঠ বা আঙুলের ঘর্ষণের ফলে উত্তেজনার সংবাদ পৌঁছে সুষুম্নাকাণ্ডে; সেখান থেকে তা পৌঁছে দেয়া হয় নারীর শ্রোণীনিয়ন্ত্রক স্নায়ুরাশিতে। এর ফলে ঘটে পুলক। তবে সব নারীর সব সময় পুলক নাও ঘটতে পারে। ঘটবে কী ঘটবে না, তা নির্ভর করে ওই প্রতিবর্তীতায় তার মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণের মাত্রার ওপর। যে-নারী কোনো যৌননিষেধগ্রস্ত নয়, সে হয়তো সহজেই পৌঁছোয় পুলকে; কিন্তু যে নারী যৌননিষেধগ্রস্ত, সে হয়তো কখনোই পৌঁছোয় না। কেউ কেউ পুলকের সময় আলোড়িত ক’রে তোলে তার শরীর ও পরিবেশকে, শীৎকারে ভরে দেয় চারপােশ, কেউ কেউ থাকে স্তব্ধ। পুরুষের সাথে নারীর পুলকের পার্থক্য হচ্ছে নারীর কোনো বীৰ্যপাত ঘটে না।
আগে মনে করা হতো পুলক রয়েছে দু-ধরনের; একটি ভগাঙ্কুরীয়, আরেকটি যোনীয়। এ-ধারণার মূলে রয়েছে ফ্রয়েডের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সূত্র। তাঁর বিশ্বাস ছিলো যে ভগাঙ্কুরীয় পুলক নারীর বিকাশহীনতার পরিচায়ক, কেননা তা হস্তমৈথুনেই লাভ করা যায়, বালিকাও তা লাভ করতে পারে; আর যোনীয় পুলক নারীর কাম ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের পরিচায়ক, কেননা এতে বাল্যের কাম ভগন্ধুর থেকে স্থানান্তরিত হয় যোনিতে। ফ্রয়েডীয় সিদ্ধান্ত প্রথাগত কুসংস্কারের প্রকাশ : পুলক হচ্ছে পুলক, কীভাবে তার উৎপত্তি ঘটেছে তা বিবেচনার বিষয় নয়। কেউ যদি কবিতা পড়ে, সূর্যস্ত দেখে, জনসভায় বক্তৃতা দেয়ার সময় নিজের নামে শ্লোগান শুনে পুলক বোধ করে, তাও চমৎকার! এটা নিশ্চিত যে পুলকের উৎস ভগাঙ্কর, উত্তেজিত ভগান্ধুরই শুরু করে ঘটনাটি, তবে যোনিও এতে কিছুটা অংশ নেয়। ষাটের দশক থেকে নারীর কামে যোনির মর্যাদা কমে গেছে, প্রধান হয়ে উঠেছে ভগান্ধুর। কারো কারো ভগাঙ্কুর এতো প্রতিভাশালী যে একের পর এক, মেশিনগানের মতো, পুলক বোধ করতে পারে; কেউ কেউ পঞ্চাশটি পুলকের সংবাদও দিয়েছে! তবে সম্প্রতি নারীর পুলককেও পুরুষ ব্যবহার করছে নারীকে নতুন ধরনের দাসী ক’রে তুলতে; পুরুষ দাবি করছে সে যখন শিশ্ন চালাবে, তখন নারীকে বাধ্যতামূলকভাবে পেতে হবে পুলকের পর পুলকের পর পুলক। নারীর একটি দায়িত্ব হয়ে উঠেছে পুলক অর্জন করা, যে-নারী পুলক অর্জন করে না পুরুষ তাকে মনে করে প্রতারক; তাই পশ্চিমে নারী এখন পুরুষকে কামসেবা করতে গিয়ে বাধ্য হচ্ছে পুলকলাভের অভিনয় করতে। পুরুষ এখন মনে করছে নারী হচ্ছে পুলকলাভের যন্ত্র, তার কাজ শয্যাকে পুলকে পুলকে প্লাবিত করা [দ্র ক্লাইন ও স্পেন্ডার (১৯৮৭, ১১০-১২৪)]। নারীর পুলকও পুরুষেরই জন্যে!
শমপর্ব: শমাপর্ব পুলকোত্তর বা পুলকহীন সঙ্গমোেত্তর পর্ব, যখন নারীপুরুষ ফিরে যায় তাদের প্রাক-উত্তেজনা অবস্থায়। এ-পর্বে ঘটে সব কামনার নিবৃত্তি বা দেখা দেয় ব্যৰ্থতার ফলে যন্ত্রণা। পুলকের পর পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে যোনি নীরস হয়ে ওঠে, তবে উত্তেজিত করা হ’লে নারী আবার পুলকের পর পুলক পেতে পারে। নারী যদি অধিত্যকাপর্বের পর কোনো পুলক অনুভব না করে, বা ব্যর্থ সঙ্গমের পর হস্তমৈথুন করে পুলক বোধ না করে, তবে তার শান্ত অবস্থায় ফিরতে অর্ধেক দিনরাত কেটে যেতে পারে। বার বার উত্তেজনা ও পুলকলাভে ব্যর্থতা নারীর জীবনে নিয়ে আসতে পারে হতাশা ক্লান্তি অবসাদ, দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা। পৃথিবী জুড়ে অধিকাংশ নারী পুলকের অভাবে অবসাদগ্ৰস্ত।
ষাটের দশকে পশ্চিমে নারীবাদ নানা মুক্তির সাথে ঘটায় নারীর কামেরও মুক্তি; প্রধান হয়ে ওঠে পুলক, ভগাঙ্কর; কামে প্রথাগত রীতির বদলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আরেক রীতি— মুখসঙ্গম। পুলক একটি শ্লোগানে, মহান ভাবাদর্শে, পরিণত হয়। ফ্রয়েড সৃষ্টি ক’রে গিয়েছিলেন ভগাঙ্কুর ও যোনির বিরোধ; তাঁর কাছে ভগাঙ্কুর ছিলো অবিকাশের আর যোনি বিকাশের পরিচায়ক। তাঁর মতে প্রকৃত নারীকে সুখ বোধ করতে হবে যোনিতে, ভগাঙ্গুরে নয়। যদি করে, তবে সে রয়ে গেছে বালিকা; তার বিকাশ ঘটে নি, তার চিকিৎসা দরকার। এটা ইহুদি-খ্রিস্টান ধারণার ছদ্মবৈজ্ঞানিক রূপ; তিনি উচ্ছেদ না ক’রে সম্পন্ন করেন নারী খৎনা। ষাটের দশকে নারীবাদীরা ফ্রয়েডকে বাতিল করেন, বাতিল করেন অনেকটা যোনিকেও। তাদের মতে ভগান্ধুরই সুখবোধের অনন্য প্রত্যঙ্গ, এটির সাহায্যেই পুলক বোধ করে নারী; যোনি গৌণপ্রত্যঙ্গ। মাস্টার্স ও জনসন (১৯৬৬, ৪৫) বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ মানব অঙ্গসংস্থানে ভগাঙ্কুর অনন্য। এর কাজ ইন্দ্ৰিয় উদ্দীপনা গ্রহণ ও বৃদ্ধি করা। তাই নারীর রয়েছে এমন একটি প্রত্যঙ্গ, যার শারীরিক ভূমিকা শুধু যৌন উত্তেজনার সূচনা ও বৃদ্ধি করার মধ্যেই সীমিত। পুরুষের দেহসংস্থানে এমন কোনো প্রত্যঙ্গ নেই।’ কিন্তু যোনি কি বাতিল, এটা কি সম্পূর্ণরূপেই একটি নির্বোধ চামড়ার থলে? গ্রিয়ার (১৯৭০, ৪৩) প্রতিবাদ ক’রে বলেছেন, ‘এটা বাজে কথা যে পুরুষ যখন যোনিতে শিশ্ন চালায় তখন নারী কোনো কিছু অনুভব করে না; শূন্য যোনির বদলে যখন যোনির ভেতর একটি শিশ্ন ভরা থাকে তখন পুলক গুণগতভাবেই ভিন্ন।’ যোনি একেবারে অনুভূতিহীন নয়, এটিও সক্রিয় হতে পারে; অনেক যোনি শিশ্নকে ওষ্ঠ ও জিভের মতো চুষতে পারে। নারীবাদীরা ষাটের দশকেই মেটানি যোনি ও ভগাঙ্কুরের ফ্রয়েডীয় বিরোধ; তবে প্রধান ক’রে তোলেন ভগাঙ্কুরকেই। এর ফলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে মৌখিক সঙ্গম। পশ্চিমে নারীরা অনেকটা ফিরে পেয়েছে তাদের শরীর, কিন্তু গ্রহ জুড়ে নারীর শরীর এখনো পুরুষের জমিদারি।
বিয়ে ও সংসার
পিতৃতন্ত্র নারীর জন্যে যে-পেশাটি রেখেছে, তা বিয়ে ও সংসার; এ-ই। পিতৃতন্ত্রের নির্ধারিত নারীর নিয়তি। এরই মাধ্যমে নারীকে বিস্তৃত জীবন থেকে সংকুচিত ক’রে, তার মনুষ্যত্ব ছেটে ফেলে, তাকে পরিণত করা হয় সম্ভাবনাশূন্য অবিকশিত প্রাণীতে। নারীকে দেয়া হয়েছে বিয়ে নামের অনিবাৰ্য স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন, যার মধ্য দিয়ে সে ঢোকে একটি পুরুষের সংসার বা পরিবারে; পালন করে পুরুষটির গৃহিণীর ভূমিকা, কিন্তু বন্দী থাকে দাসীত্বে। প্রথাগত স্ত্রীর ভূমিকা একটি প্রশংসিত পরিচারিকার ভূমিকা, যে তার প্রভুর সংসার দেখাশোনার সাথে কাম ও উত্তরাধিকার দিয়ে চরিতার্থ করে প্রভুর জীবন। বিয়ে ও সংসার নারীর সম্ভাবনার সমাপ্তি; অবশ্য পুরুষতন্ত্র বিশ্বাস করে না। নারীর কোনো সম্ভাবনায়ই, মনে করে দাসীত্বেই নারী লাভ করে পরিপূর্ণতা। এঙ্গেলস (১৮৮৪, ২১৪) পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের প্রতিষ্ঠাকে বলেছেন “স্ত্রীজাতির এক বিশ্ব ঐতিহাসিক পরাজয়’; এর ফলে পুরুষ গৃহস্থলির কর্তৃত্বও দখল করল, স্ত্রীলোক হল পদানত, শৃংখলিত, পুরুষের লালসার দাসী, সন্তানসৃষ্টির যন্ত্র মাত্র। বিয়ে, তাঁর মতে, ‘মোটেই স্ত্রী ও পুরুষের সদ্ভাব সূত্রে দেখা দেয় নি, দেখা দেয় ‘নারী পুরুষের একজন কর্তৃক অপরের উপর আধিপত্য হিসাবে”; আর পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে স্ত্রী-ই হল প্রথম ঘরোয়া ঝি’। এঙ্গেলস (১৮৮৪, ২২৯) দেখিয়েছেন ‘আধুনিক ব্যক্তিগত পরিবার স্ত্রীলোকের প্রকাশ্য অথবা গোপন গাৰ্হস্থ দাসত্বের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে… বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্ততপক্ষে বিত্তবান শ্রেণীগুলির মধ্যে পুরুষই হচ্ছে ৬পার্জনকারী, পরিবারের ভরণপোষণের কর্তা এবং এইজন্যই তার আধিপত্য দেখা দেয়, যার জন্য কোন বিশেষ আইনগত সুবিধা দরকার পড়ে না। পরিবারের মধ্যে সে হচ্ছে বুর্জোয়া; স্ত্রী হচ্ছে প্রলেতারিয়োত।’ প্রতিটি পরিবার গড়ে ওঠে একজন ব্ৰাহ্মণ ও একটি শূদীর সমবায়ে, যাতে পুরুষটি ব্ৰাহ্মণ নারীটি শূদ্রী। পুরুষই বিয়ে ও সংসারের কর্তা, সে-ই সংসারে সার্বভৌম, তার বিধানই সংসারে ধ্রুব ধর্মগ্রন্থ নারীটি ওই সংসারের পরিচারিকা। বাড়ির দাসীর সাখে বুর্জেয়া স্ত্রীটির পার্থক্য হচ্ছে দাসীটিকে (যৎসামান্য) বেতন দেয়া হয়, আর নারীটি (কখনো কখনো মর্যাদা ও বিলাসে) রক্ষিত হয়। রোজা লুক্সেমবার্গ তাঁর সময়ের বুর্জোয়া নারীদের বলেছিলেন ‘পরগাছার পরগাছা’, ম্যাককিনন (১৯৮২, ৮) প্রলেতারিয়েত নারীদের বলেছেন ‘ক্রীতদাসের ক্রীতদাসী; এবং মিল রয়েছে দু-শ্রেণীর নারীর মধ্যেই যে তারা একই রকমে শোষিত। রক্ষণশীল বঙ্কিমও ‘প্রাচীনা ও নবীনায় (১৮৮৭, ২৫১) বলেছেন, ‘পুরুষ প্ৰভু, স্ত্রী দাসী; স্ত্রী জল তুলে, রন্ধন করে, বাটনা বাটে, কুটনা কোটে। বরং বেতনভাগিনী দাসীর কিঞ্চিৎ স্বাধীনতা আছে, কিন্তু বনিতা দুহিতা স্বাসার তাহাও ছিল না।’ তবে তারা শুধু শোষক ও শোষিতই নয়, তাদের ভিন্নতা আরো বেশি; শোষকশোষিতরা হয় একই প্ৰজাতির, কিন্তু স্বামীেূীঘ ভাবগতভাবে বিধাতা ও ভক্তের পর্যায়ের; হিন্দুমতে পতি পরম গুরু; সে ‘স্বামী’, ‘পতি’, বা ‘ঈশ্বর’: মুসলমান মতে স্বামীর পায়ের নিচে বেহেস্ত, স্বামী প্রায় সেজদার উপযুক্ত; খ্রিস্টান মতে স্বামীই নারীর ঈশ্বর। মিল্টনের ইভ আদমের কাছে আত্মসমৰ্পণ ক’রে বলে। [উদ্ধৃত, ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্ (১৭৯২, ১০১)] :
