বাঙালির কামজীবন এক নিষিদ্ধ গোপন এলাকা, যদিও বাঙালি পুরুষ কামে চিংড়ির মতোই উৎসাহী। বাঙালির সামাজিক জীরনে কাম বেশ প্রবল ভূমিকা পালন ক’রে থাকে, বাঙালি পুরুষেরা একত্ৰ হ’লেই কামালাপে মেতে ওঠে, এবং তাদের সমস্ত আচরণেই কামলোলুপতা প্রকাশ পায়। বাঙালি সমাজকে অবদমিত কাম-দিয়ে-ঘেরা সমাজও বলা যায়; এবং ওই অবদমন নিয়মিতভাবে প্ৰকাশ পায় ধর্ষণরূপে। তবে শয্যায় তাদের আচরণ সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। বাঙালি নারীপুরুষের কামজীবন সম্পর্কে কিন্সে ও অন্যান্যের পুরুষের যৌন আচরণ (১৯৪৮), নারীর যৌন আচরণ (১৯৫৩), বা মাস্টার্স ও জনসনের মানুষের যৌন সাড়ার (১৯৬৬) মতো বই লেখা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তবে এ-বিষয়ে যে কিছুই লেখা হয় নি, তাতে বোঝা যায় বাঙালির কামজীবন সুস্থ নয়। যা গোপন ক’রে রাখা হয়, তা সাধারণত অসুস্থ হয়ে থাকে। এটা নিষিদ্ধ বিষয়; আর এর পীড়ন ভোগ করে নারী। বাঙালি নারীর যৌনজীবন বলাৎকার ও চরম বিবক্তিকর অবসাদের সমষ্টি। উচ্চশিক্ষিত কিছু নারী আমাকে জানিয়েছেন তারা পুলক সম্পর্কে কিছু জানেন না, তাদের স্বামীরা লাফ দিয়ে উপসংহারে পৌঁছেন, এই তাদের চাঞ্চল্যকর কামজীবন। দরিদ্র অশিক্ষিত নারীরা সাধারণত ভোগ করে স্বামীর বলাৎকার। বাঙলাদেশে প্রতিটি শয্যাকক্ষ, যদি থাকে, নারীর জন্যে বলাৎকার বা বিরক্তিকর অবসাদকক্ষ।
নারীর জীবনে কাম এক প্রধান ব্যাপার, তবে নারী যেমন তার জীবনকেই সমৰ্পণ করে কোনো পুরুষের কাছে, তেমনই সমৰ্পণ করে তার কামকেও। তার শরীর তার অধিকারে নয়, তার কামও তার অধিকারে নয়; মাৰ্গারেট স্যাংগার বলেছেন, ‘কোনো নারী নিজেকে স্বাধীন বলতে পারে না, যে তার নিজের শরীরের মালিক ও নিয়ন্ত্রক নয়।’ নারী মালিক আর নিয়ন্ত্রক নয়। তার কামেরও। ক্যাথেরিন ম্যাককিনন (১৯৮২, ১) বলেছেন, মার্ক্সবাদে যেমন শ্রম নারীবাদে তেমন কাম : যা মানুষের একান্ত আপন, কিন্তু যা হরণ করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি।’ নারীর কামকে অপরিতৃপ্ত রাখাই পুরুষতন্ত্রের রীতি। নারী কামে সক্রিয় সম্ভোগী হতে পারে না, কোনো সংস্কৃতিই চায় না। কামে নারী উদ্যোগী ভূমিকা নিক; সব সংস্কৃতিই চায় নিজের কাম দিয়ে নারী সেবা করবে। পুরুষের। নারীর জন্যে বিয়ে হচ্ছে কাম দিয়ে পুরুষের সেবা। নারী পুরুষের ভোগ্যসামগ্ৰী। কামে নারী ও পুরুষের ভিন্নতা অসীম জৈবিক সামাজিক মনস্তাত্ত্বিকভাবে : সব সংস্কৃতি চায় যে কামে পুরুষ থাকবে কর্তা, পুরুষই নিয়ন্ত্রণ করবে শয্যা; পুরুষই স্থির করবে। কখনও কতোটা কামের প্রয়োজন, কীভাবে তা পরিতৃপ্ত করা হবে। কামে পুরুষ ভূমিকা পালন করে সক্রিয় কর্তার, পুরুষের কাম তার দেহ থেকে ধাবিত হয় নারীর শরীরের দিকে, নারীর শরীর পুরুষের কামের শিকার। দ্য বোভোয়ার বলেছেন (১৯৪৯, ৩৯৪), ‘নারীকে বিদ্ধ ও উর্বর করা হয় তার যোনি দিয়ে, যা শুধু পুরুষের মধ্যবর্তীতার ফলেই পরিণত হয় কামকেন্দ্রে, এবং এটা সব সময়ই এক ধরনের বলাৎকার।’ পুরুষতন্ত্র নারীর ওই রন্ধটিকেই মনে করে নারীর কামের আকার, যেনো ওই রন্ধটিতে কয়েক মুহূর্ত কাজ করলেই নারীর কাম পরিতৃপ্ত হয়ে যায। আধুনিক যৌনবিজ্ঞান ও নারীবাদীরা দেখিয়েছেন কামসূখের জন্যে ওটি উত্তম নয়; কেননা যোনির দেয়ালের স্পর্শকাতরতা কম। নারীর রয়েছে একটি অনন্য কামপ্রত্যঙ্গ, ভগাঙ্কুর, যেটি নারীকে পৌঁছে দিতে পারে চরম পুলকে। তবে পুরুষতন্ত্র এটিকে শুধু উপেক্ষাই করে না, অনেক অঞ্চলে এটিকে উচ্ছেদও করে, যাতে নারী কখনো কাম বোধ না করে। তাই নারীর জন্যে অবধারিত বলাৎকার; বলাৎকারের ফলেই বালিকা নারী হয়ে ওঠে। পৃথিবী জুড়ে রখনো নারীর জন্যে বিবাহিত বা অবিবাহিত প্রথম সঙ্গম বলাৎকার। বাঙলাদেশের যে-কিশোরীকে আত্মীয়রা খাটের সাথে বেঁধে বাধ্য করে বাসর রাত কাটাতে, যে-কিশোরী জানে না তার শরীরকে, যে প্রস্তুত হয় নি নিজের ভেতরে কোনো শিশুগ্রহণের জন্যে, এটা তার জন্যে যেমন বলাৎকার, তেমনই বলাৎকার শিক্ষিত তরুণীর জন্যেও, কেননা তার ভেতরেও একইভাবে ঠেলে ধাব্ধিয়ে ভেঙেচুড়ে ছিড়ে ফেড়ে ঢোকে একটি অচেনা উদ্যত অবিবেচক শিশ্ন। অধিকাংশ সমাজে লৈঙ্গিক রাজনীতির হিংস্র রূপটি- বলাৎকার বা ধর্ষণ- দেখা দেয় বাসর শয্যায়। প্রথম রাতেই ছিন্নভিন্ন ওই নারীরা আর খাপ খাওয়াতে পারে না কামের সাথে, কাম হয়ে ওটে তাদের জীবনের ভীতি, অবৰ্ণনীয় অবসাদ।
কামে নারীকে নির্ভর করতে হয় পুরুষের ওপর; পুরুষই নেয় আক্রমণাত্মক ভূমিকা, নারী নিজেকে সমর্পণ করে তার আগ্রাসনের কাছে। পুরুষ, যদি সে নিজে প্রস্তুত থাকে, নারীর ভেতরে ঢুকতে পারে যে-কোনো সময়, তাই শুধু পুরুষই করতে পারে ধর্ষণ: নারী প্রস্তুত কিনা তা পুরুষের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বা পুরুষ মনে করে নারী সব সময়ই প্রস্তুত। চিরকালই অধিকাংশ নারী পুরুষকে তার ভেতরে গ্রহণ করেছে অপ্ৰস্তৃত অবস্থায়; তীব্ৰ পীড়নে ঘুম ভেঙে তারা দেখে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। পুরুষ, অসুস্থ অবস্থায়ও তারা বাধ্য হয় পুরুষকে প্রবেশাধিকার দিতে। নারী পুরুষকে অপ্ৰস্তুত অবস্থায় ব্যবহার করতে পারে না; কিন্তু পুরুষ পারে অপ্ৰস্তুত নারীর ভেতরে ঠেলে ঢুকতে। পুরুষ চাইলে লাশের সাথেও সঙ্গম করতে পারে। সঙ্গমে অধিকাংশ সমাজে নারীর অনুমতি বা আগ্রহের প্রয়োজন হয় না; পুরুষের কাছে নারী নিজের শস্যক্ষেত্র, ওই খেতে পুরুষ যে-কোনো সময় যে-কোনো দিক দিয়ে ঢুকতে পারে। পুরুষ নিজের কামের প্রহরীরূপে স্বর্গীয় সত্তাদেরও নিয়োগ করতে দ্বিধা করে না; হাদিসে আছে স্বামী যদি সঙ্গম চায় আর স্ত্রী না চায়, তাতে কামোর্ত স্বামীটি যদি জেগে রাত কাটায়, তবে ফেয়েশতাদের অভিশাপ সারা রাত বৰ্ষিত হয় পাপী নারীটির মাথার ওপর [দ্র পিতৃতন্ত্রের খড়গ’। এতো গুরুত্বপূর্ণ পুরুষের কাম, নারী আছে ওই কামের খাদ্য হওয়ার জন্যে। এ-জন্যেই সঙ্গমকে অনেকে মনে কবেন নারীর পরাজয, সঙ্গমের আসনেও প্রকাশিত দেখেন পুরুষাধিপত্য। দ্য বোভোয়ারও (১৯৪৯, ৪০৫-৪০৬) বলেছেন :
