‘পুরুষ ও নারীর কাছে একই শব্দ প্ৰেম বোঝায় দু-জিনিশ। নারী প্রেম বলতে যা বোঝে, তা খুবই স্পষ্ট : তা শুধু ভক্তি নয়, তা প্রত্যাশাহীন নিঃশর্ত সম্পূর্ণ দেহমান সমর্পণ। তার প্রেমের শর্তহীনতার বৈশিষ্ট্য তার প্ৰেমক পরিণত করে এক ধরনের ধর্মবিশ্বাসে; এবং এই তার একমাত্র বিশ্বাস। পুরুষ যখন ভালোবাসে কোনো নারীকে, তখন সে নারীর কাছে চায় প্ৰেম;..যদি কোনো পুরুষ বোধ কবে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের বাসনা, তাহলে, আমার কথা হচ্ছে, সে পুরুষ নয়।‘
পুরুষ ধরেই নেয় যে নারী যখন প্রেমে পড়ে, তখন সে ভুলে যায় তার অস্তিত্ব, তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব; কেননা প্রেমে পুরুষ ঈশ্বর আর নারী ভক্ত। ভক্ত যেমন নিজেকে সম্পূর্ণ সমৰ্পণ করে প্রভুর পদতলে, নারীও করে তাই; কেননা প্ৰভু ছাড়া নারী নিরস্তিত্ব। পুরুষতন্ত্র নারীর আত্মোৎসর্গ আত্মসমর্পণপরায়ণতাকে মনে করে প্রাকৃতিক; মনে করে প্রকৃতিই নারীকে সৃষ্টি করেছে এভাবে। কিন্তু এর সাথে প্রাকৃতিক বা জৈববিধির কোনো সম্পর্ক নেই; এখানেও কাজ করে সামাজিক সূত্র। পুরুষ নারীকে শিখিয়েছে আত্মোৎসর্গ করতে, তাকে বাধ্য করেছে আত্মসমৰ্পণ করতে। নারী ও পুরুষের পরিস্থিতি ভিন্ন বলে তারা সব কিছুই দেখে ভিন্নভাবে, ভিন্নভাবে দেখে প্রেমকেও। নারী অস্বায়ত্তশাসিত, সমাজ তাকে কোনো কিছুর কর্তা হয়ে উঠতে দেয় না, তাই নারী প্ৰেমেও আত্মতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে না। নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া তার উপায় নেই; প্রেমে তাই সে নিজেকে সমর্পণ করে সমাজপতি পুরুষের কাছে। নারী সমৰ্পণ করে নিজের দেহ ও আত্মা পরম সত্তার কাছে, ওই পরম সত্তা কখনো পুরুষ কখনো বিধাতা। নারী জানে পরনির্ভরতাই তার নিয়তি, তাই তার জন্যে ভালো হচ্ছে কোনো দানবের বদলে কোনো দেবতাকে পুজো করা। তাই প্রেমকে নারী ক’রে তোলে ধর্ম, আত্মসমৰ্পণ ক’রে সে করতে চায় আত্মরক্ষা। নারী তার প্রেমে পড়ে, যে তাকে উন্নীত করতে পারে নিজের অবস্থান থেকে; সে পুজো করে পৌরুষের. সম্পদের, সামজিক অবস্থানের। যে-নারী নিজের থেকে নিম্ন অবস্থানের কারো জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে, সে বেছে নেয় চরম মর্ষকামিতা।
নারীর জীবনে প্রেমের অবকাশ খুবই কম। তার রয়েছে স্বামী, সংসার, সন্তান, গৃহস্থলি, কাম, এবং অনেকের রয়েছে পেশা! কাম জৈবিক, প্রেম সাংস্কৃতিক; নারী প্রেম শেখে প্রেমের অতি প্রচারের ফলেই। প্ৰেম এখন সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপিত পণ্য, অন্যান্য পণ্যের মতো এরও প্রধান ক্রেতা নারী। তবে অধিকাংশ সংস্কৃতিই নারীর জন্যে প্রেম নিষিদ্ধ ক’রে রেখেছে, তাদের জন্যে রেখেছে। বিবাহিত প্ৰেম, যা বিশেষ দরকারে পড়ে না। অনেক কিশোরীতিরুণী বিশেষ বয়সে প্রেমের স্বপ্ন দেখে : তাদের ওই স্বপ্নের পেছনে রয়েছে তাদের শরীরের প্ররোচনা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ। মনোবিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলেন নারী প্রেমিকের মধ্যে খোজে পিতাকে। আসলে তারা পিতা নয়, খোজে। পুরুষকেই; যে তাকে দিতে পারে মহিমা। পুরুষ নারীর চোখে মহিমান্বিত, বাল্যকাল থেকেই তারা দেখে পুরুষের মহিমা; প্রেমিক বা স্বামীর মধ্যে তারা দেখতে চায় তা। পুরুষাধিপত্যবাদী সমাজে নারী পুরুষের কাছে নিজেকে মনে করে শিশু, প্রেমিক যখন তাকে ডাকে “মিষ্টি মেয়ে’, ‘ময়না’, ‘আমার পাখি’, তখন তা তার হৃদয় স্পর্শ করে। পুরুষের বাহুতে আবার বালিকা হয়ে ওঠার আনন্দ তাদের অসীম। নারীর আত্মসমৰ্পণ। তার টিকে থাকার অভিলাষের প্রকাশ; ধর্মে ভক্ত বিধাতার কাছে আত্মসমৰ্পণ ক’রে নিজের জন্যে একটি অসামান্য স্থান ক’রে নেয়, নারীও তেমনি প্রেমে স্থান ক’রে নেয় নিজের জন্যে। দেবতার পদতলে সে হয়ে ওঠে নৈবেদ্য। প্রেমে নারীর আচরণ সামাজিক ব্যবস্থারই ফল, বাঙালি-সৌদি-মার্কিন নারীর প্রেম-আচরণ এক রকম নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ নারী কখনো প্রেমের আবেগ বোধ করে নি।
প্রেম অপরিহার্স নয়; তবে কাম অপরিহার্য। অধিকাংশ সমাজেই প্ৰেম নিষিদ্ধ, তবে কাম নিষিদ্ধ নয়। নারীর জীবনে সাধারণত কাম আসে বিয়ের মধ্য দিয়ে, বিয়েই তাদের জন্যে কামের কানাগলি। তবে নারীর বিয়ে নিজের কামের জন্যে নয়, পুরুষের কামের জন্যে; নারীর বিয়ে নারীর আত্মরক্ষার জন্যে! কোনো সংস্কৃতিই নারীর কামতৃপ্তিকে মূল্য দেয় নি, ববং বহু যত্নে লিখেছে তার কাম দমন করার বিধান। পুরুষ নারীকে চিরকাল ভয় করেছে তার কামশক্তির জন্যে, পুরুষ বুঝতে পেয়েছে কামবাসনা ৩ার য৩োই প্রবল হোক স্থলনের পর তার আর কোনো উদ্যম থাকে না; কিন্তু নারী যেনো অনন্তকাল লিপ্ত হয়ে থাকতে পারে। আরবরা নারীকে ফিৎনা বা বিশৃঙ্খলা ব’লে ভয় করে; তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে; হিন্দুরা তার কামশক্তি দেখে হয়েছে আতংকিত। পুরুষ নিজের কামকে বিরামহীনভাবে চরিতাৰ্থ করেছে, কিন্তু নারীর কামতৃপ্তির কথা ভাবে নি। পুরুষের কাছে সতী সে, যে সঙ্গমের সময়ও নড়াচড়া করে না; ভিক্টোরীয় এক পুরোহিত বলেছিলেন, ‘নোড়ো না, নারী।’ নারীর কাম সম্পর্কে পুরুষতন্ত্র দুটি বিরোধী ধারণা পোষণ ও প্রচার করে; একটি হচ্ছে নারীর কাম ক্ষুধার শেষ নেই, কিছুতেই ওই আগুন নেভে না; অন্যটি হচ্ছে নারী কাম পছন্দ করে না, নারী প্রাকৃতিকভাবেই একপুরুষে পরিতৃপ্ত। দুটিই অপপ্রচার; কেননা নারী তৃপ্ত হয়, এবং নারী কাম পছন্দ করে, নারী জৈবিকভাবে একপুরুষের সতী নয়। একাধিক পুরুষের সাথে কামসংসর্গে তার আপত্তি নেই, তবে পুরুষতন্ত্রের ভয়ে অধিকাংশ নারীই তা স্বীকার করে না। একপতিপত্নী প্রথার উদ্ভব সম্পর্কে বাখোফেন বলেছেন যে নারীরাই উদ্যোগ নিয়েছিলো একটি পুরুষের সাথে সঙ্গমের অধিকার পাওয়ার, কেননা বহু পুরুষের সাথে সঙ্গম তাদের ভালো লাগে নি। তার এ-মত সমর্থন করেছেন বিপ্লবী এঙ্গেলসও (১৮৮৪, ২১০); তিনি বলেছেন বহু পুরুষের সাথে সঙ্গমের পীড়ন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে আগ্রহের সঙ্গে পরিত্রাণ হিসাবে তারা অবশ্য পাতিব্ৰত্যের অধিকার, একটি পুরুষের সঙ্গে অস্থায়ী বা স্থায়ী বিবাহ চেয়ে থাকবে।’ তাঁর এ-সিদ্ধান্তের মূলে আছে ভিক্টোরীয়বাদ, যার সিদ্ধান্ত হচ্ছে নারীরা কাম পছন্দ করে না। নারীরা কাম পছন্দ কবে না বলে একটি পুরুষের শয্যায় নিষ্ঠার সাথে পালন করতে চেয়েছে পাতিব্ৰত্য, এবং নারীদের আগ্রহেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একপতিপক্ট বিয়ে, এ-মত ঠিক নয়। পুরুষ চেয়েছে ব’লই এটা ঘটেছে; পুরুষ তার বহুসম্ভোগেব পথ খোলা রেখে নারীকে নিজের একান্ত সম্ভোগের বস্তু ক’রে তোলার জন্যেই সৃষ্টি করেছে একপতি(বহু)পত্নী বিয়ে। নারী কাম পছন্দ করে, খুবই উপভোগ করে। একনিষ্ঠতা জৈবিক নয়, সামাজিক; আর তা মনে চলতে বাধ্য হয়। শুধু নারী। পুরুষ কখনোই একনিষ্ঠতাকে মনপ্ৰাণে স্বীকার করে নি; রাজ্যের সাধুতম পুরুষটিও অভ্যন্তরে অত্যন্ত লোলুপ।
