কিশোর বয়সে অভাব থাকে মাংসের অভিজ্ঞতার, তাই প্রেমকে মনে হয় একান্ত হৃদয়ের; কিন্তু অভিজ্ঞতার পর তা হৃদয়াবেগ রূপে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না, দুপুরের হৃদয় সন্ধ্যায়ই মাংসের উল্লাস হয়ে দেখা দেয়। প্রেম ও কাম একই জিনিশের সূচনা ও সমাপ্তি; সূচনার সঙ্গে জড়িত কাতরতা, যন্ত্রণা, আত্মোৎসর্গপরায়ণতা, মর্ষকামিতা, ব্যর্থতাবোধ; পরিণতির সঙ্গে জড়িত সম্ভোগ, সুখ, বিজয়, ধর্ষকামিতা। প্রেম উত্তেজনাপর্ব, যখন নারীপুরুষের মনে জগতে থাকে আবেগ; কাম হচ্ছে পুলকপর্ব, যখন শরীরের সাথে শরীরের ঘর্ষণে ওই আবেগ ছোয় চুড়ো; আর পরবর্তী জীবন হচ্ছে নিবৃত্তিপর্ব। প্রেম একটি মানসিক অবস্থা, এবং খুব স্বাভাবিক অবস্থা নয়; তা স্বাভাবিকতা থেকে পতন। বাঙলায় যে বলা হয় ‘প্রেমে পড়া’, তা নির্দেশ করে স্বাভাবিকতা থেকে ওই বিদ্যুতিকেই। প্রেমের উপসর্গগলোর মধ্যে রয়েছে অনিদ্রা, অন্যমনস্কতা, ক্ষুধাহীনতা, কাতরতা। প্রেমিকপ্রেমিকার চোখ ভ’রে থাকে তাদের প্ৰেমাস্পদ, তারা বাস করে অস্বাভাবিকতার মধ্যে। তবে প্রাপ্তির সম্ভাবনা তাদের কিছু কালের জন্যে সুখে ভরে দেয়। যাকে চাই তাকে না পাওয়া প্রেম, তাকে পাওয়া কাম।
মানুষ পেতে চায়, তাই কাম বা যৌনতা জীবনের খাদ্য ও পানীয়। কামচরিতার্থতা অনেকটা জীবনচরিতার্থতা। যার কামজীবন পরিতৃপ্ত নয়, সে সুস্থ নয়, খুব ভেতরে তার নিরন্তর দংশন চলতেই থাকে। একটি পুলকপ্লাবিত সঙ্গম নারীপুরুষকে যা দিতে পারে, তা আর কিছু দিতে পারে না; জন্মজন্মান্তরের আচরিতার্থ প্রেমের থেকে একবার পুলকিত সঙ্গম উত্তম। সঙ্গম বাইরের দিক থেকে রুচিকর নয়; সভ্য সংস্কৃত মানুষ কীভাবে মেতে উঠতে পারে অমন বন্যতায়, তা ভেবে অনেক মনীষী বিস্মিত হয়েছেন, এবং প্রায় সমস্ত কিশোরকিশোরী বোধ করে ঘৃণা। আমার মাবাবাও এমন করে, এমন করে আমার শিক্ষক অধ্যাপকও?-এসব প্রশ্ন জাগে তাদের মনে; এবং ঘেন্নায় তারা শিউরে নিঃশব্দে চিৎকার করে-না, না, তারা এমন করে না; তারা এতো খারাপ নয়। কিন্তু কামের কাছে কেউ বাবামা শিক্ষক অধ্যাপক মহাপুরুষ দেবদূত নয়; কামে সবাই মানুষ। পুংসকতার সাথে আদিমতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে ব’লেও অনেকের বিশ্বাস; লরেন্স বিশ্বাস করতেন যে বুর্জোয়ারা এতো সংস্কৃত যে তারা নপুংসক ক্লীব বন্ধ্যা; তাই তাদের উর্বর করার জন্যে দরকার অসংস্কৃত বর্বরের বীর্য। কাম মানবিক, কাম মানুষের সমান বয়সী।
পুরুষতন্ত্র প্রেমের জয়গান গায়, তবে প্রেমে বিশ্বাস করে না; আর কামের নিন্দা করে, তবে বিশ্বাস করে কামে। পুরুষতন্ত্রের প্রধান বিশ্বাসগুলোর প্রধানটি সম্ভবত কাম; তার বিধানগুলোতে কামকে যেটুকু নিন্দ করা হয়েছে, তা পুরুষের অংশগ্রহণের জন্যে নয়, নারীর অংশ গ্রহণের জন্যে। পুরুষ নিজের সম্ভোগের সমস্ত পথ খোলা রেখে নারীকে দীক্ষিত করেছে। সতীত্ত্বে, ঘরে রেখেছে। সতী আর বাইরে রেখেছে। পতিতা। পুরুষ নারীর কামকে নিরুদ্ধ করার জন্যে নারীকে অবরোধে, পর্দায়, জেনানায় বন্দী করেছে, তাকে সূর্যের আলো দেখতে না দিয়ে তার নাম রেখেছে অসূৰ্যম্পশ্যা, তার ভগাঙ্কুর ছিন্ন করেছে, তাকে সতীত্ববন্ধ পরিয়েছে; কিন্তু নিজের কামের তৃপ্তি খুঁজেছে নারী থেকে নারীতে। চীনের তাওবাদ- “প্রকৃতির দিকে পরম পথ”- দার্শনিক সত্যে পৌচেছে যে ‘একটি পুরুষ যতো বেশি নারীর সাথে সঙ্গম করবে ততো বেশি কল্যাণ হবে তার; যদি পুরুষ একরাতে দশটির বেশি নারীর সাথে সঙ্গম করতে পারে, তাহলে তাই সর্বোত্তম” [দ্র ট্যানাহিল (১৯৮০, ১৫৬)]। ইসলাম পুরুষের জন্যে বহুবিবাহের, এবং ক্রীতদাসীসম্ভোগের বিধান রেখে স্বীকৃতি দিয়েছে পুরুষের কামকে, আর নারীকে সতী রাখার সমস্ত ব্যবস্থা করেছে। পুরুষতন্ত্র নারীর জন্যে রেখেছে প্রেম, পুরুষের জন্যে রেখেছে কাম; নারীকে দিয়েছে প্রেমের মর্ষকামিতা উপভোগ, পুরুষের জন্যে রেখেছে কামের উদ্দীপনা। যার জীবনে কিছু নেই প্রেমই তার আশ্রয়, যার জীবনে রয়েছে সাফল্য প্রেম তার জীবনের মনে-না-পড়ার মতো খণ্ডাংশ। নারী হয়ে উঠেছে প্রেমের শিকার; নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে তার কাম, যদিও পুরুষতািন্ত্র বিশ্বাস করে আগুন আর রক্কের ক্ষুধা কখনো মেটে না। সত্য হচ্ছে সভ্যতার কয়েক হাজার বছর ধরে নারী পুরুষের প্রেমে নিজের জীবন ব্যর্থতায় ভরে তুলেছে, কিন্তু তার কাম চরিতার্থতা লাভ করে নি। লৈঙ্গিক রাজনীতির সূচনাই হয় শয্যায়; শয্যায় নারীকে পরাভূত ক’রে তাকে পরাজিত করা হয়েছে জীবনের সমস্ত এলাকায়। সমস্ত কামসূত্র লেখা হয়েছে পুরুষের জন্যে; তার কামবাসনাকে চূড়ান্তরূপে পরিতৃপ্ত করার জন্যে।
নারীর জীবনে অতিশায়িত করা হয়েছে প্রেমকে। তবে তাও বৈধ প্ৰেম, যে-পুরুষের সে আশ্রিত নারীর প্রেম শুধু তারই জন্যে। যে-নারীরা বৈধ প্রেমের পথে না গিয়ে গেছে অবৈধ প্রেমের পথে, তারা নিন্দিত হয়েছে, শাস্তি পেয়েছে, তাদের জীবন বিপদ ও যন্ত্রণায় ভ’রে উঠেছে; তবে বৈধ-অবৈধ সব প্রেমই মূলত নারীর জন্যে ব্যর্থতা। পুরুষ নারীর প্রেমে দেখতে চেয়েছে মর্ষকামের প্রকাশ; পীড়িত হয়েই তারা স্মরণীয় হয়েছে। বায়রনের একটি উক্তি হচ্ছে ‘প্ৰেম পুরুষের জীবনের একটি অংশ, আর নারীর সমগ্র অস্তিত্ব।’ নারীর জীবনে কোনো সাফল্য নেই, তাই নারীর সমগ্র অস্তিত্ব সংকৃচিত হয়ে পড়ে একটি আবেগে, বা পুরুষতন্ত্র চায় নারীর সমগ্র অস্তিত্ব সংকুচিত হোক পুরুষের জন্যে আবেগে, আর সে-ই ততো মহীয়সী যে সহ্য করে যতো বেশি পীড়ন। তবে মহাপ্রেম কিংবদন্তি; প্ৰেম প্ৰধান ব্যাধি হয়ে থাকে শুধু তাদেরই জীবনে, যাদের কামনা মেটে নি। পুরুষের মতো প্ৰেম নারীর জীবনেরও অংশমাত্র; প্রেম তার জীবনে প্রধান নয়, তবে তার জীবন সংকীর্ণ, ব্যৰ্থ বলে তাকে থাকতে হয়েছে প্রেমের অসুস্থতার মধ্যেই। এখনো কি থাকে? ভাবালুতার যুগের উপন্যাসে যে-নায়িকাদের পাওয়া যায়, তাদের জীবনে প্রেম ও পুরুষ ছাড়া আর কিছু ছিলো না, তাই তারা কেঁদে বালিশ ভেজাতো, তাদের চোখ থেকে অবিরল বেরিয়ে আসতো অশ্র, আজ তেমন ঘটে না। বিরাহিণীও আজকাল দুগ্ধপ্ৰাপ্য, কিন্তু এককালে নারীমাত্রই ছিলো বিরাহিণী, আর তার নানা দশারও শেষ ছিলো না। বিরহের একেক দশায় সে ভোগ করতো একেক ধরনের পীড়ন। প্রেম ও নারীর অচ্ছেদ্য সম্পর্ক সম্বন্ধে যতো উপকথা প্রচলিত রয়েছে, তা জৈবিক নয়; তা সামাজিক পরিস্থিতিরই পরিণতি। নিটশে বলেছেন [দ্র দ্য বোভোয়ার (১৯৪৯, ৬৫২) :
