ফলিকল বাড়তে থাকে, সাথে সাথে রক্তে বাড়তে থাকে ইষ্ট্রোজেন। চক্রের ১৩ দিনের দিন রক্তে এর পরিমাণ শুরুর দিনের ছ-গুণ হয়ে দাঁড়ায়। এ-সংবাদ পৌঁছে যায় হাইপোথালামাসে, সেটি বুঝতে পারে যে আর ফলিকল উদ্দীপ্ত করার দরকার নেই; তাই কমিয়ে দেয়। ফুলকল-উদ্দীপক হরমোন উৎপাদন। তখন হাইপোথালামাস নিঃসরণ করে একটি হরমোন, যার নাম হলুদ-উৎপাদক-হরমোন-নিঃসারিক হরমোন। বাঙলায় নামটি বেশ বিদঘুটে শোনাচ্ছে, এর কাজ হচ্ছে হলুদ-উৎপাদক হব।মোন নিঃসরণে পিটুইটারিকে উদ্দীপ্ত করা। এর প্রভাবে পিটুইটারি উৎপাদন করে হলুদ-উৎপাদক হরমোন বা লিউটিনাইজিং হরমোন। এ-হরমোন ডিম্বাণু ফলিকলগুলোর কোনো একটিকে ফুটিয়ে তার ভেতরের ডিম্বাণুটিকে বের হতে সাহায্য করে; এবং ফলিকলের কোষগুলোকে উজ্জ্বল হলুদ বর্ণেরঞ্জিত ক’রে তোলে। এ-জন্যেই এর নাম লিউটিনাইজিং বা হলুদ-উৎপাদক হরমোন। চক্রের ১৪ দিনের দিন হঠাৎ রক্তনালি দিয়ে হলুদ-উৎপাদক হরমোনের প্রবল প্রবাহ বয়ে যায়। এ-হরমোন পৌঁছে ডিম্বাশয়ে, সেখানে এটি সবচেয়ে বিকশিত ফলিকলটিকে ফুটিয়ে ডিম্বাণুটিকে বের করে দেয়। একে বলা হয় ওভিউলেশন বা ডিম্বস্ফোটন। ডিম্বাণুটি ধৰিঃ পড়ে ডিম্বনালির আঙুলাকৃতির প্রান্তে, এবং সেটি ডিম্বাণুটিকে ছেড়ে দেয় ডিম্বন্যালিতে। ফোটা বা উর্বর ডিম্বাণু এগোতে থাকে সামনের দিকে।
ডিম্বনালিতেই ঘটে উর্বরায়ণ বা গর্ভসূচনা। ডিম্বাণু বেরিয়ে যাওয়ার পর তার শূন্য ফলিকল বা আধারটি চুপসে যায়, হলুদ-উৎপাদক হরমোন সেটিকে হলদে ক’রে তোলে। চোপসানো ফলিকলটিকে বলা হয় হলুদ বস্তু। এ-হলুদ বস্তুটি, এবং অন্যান্য ১১ থেকে ১৯টি ফলিকল যেগুলো তাড়াতাড়ি বাড়তে পারে নি, সবাই মিলে একটি নতুন হরমোন উৎপাদন করতে থাকে। এর নাম প্রোজেসটেরোন। এর অর্থ গর্ভ-উৎপাদক। প্রোজেসটেরোন দ্বিতীয় প্রধান নারী হরমোন। এর নানা কাজের মধ্যে প্রধান কাজটি হচ্ছে জরায়ুকে ভুণধারণ ও লালনপালনের জন্যে প্রস্তুত করা। প্রোজেসটেরোন জরায়ুর দেয়ালআস্তরণকে পুরু করে তোলে, গ্রন্থি থেকে পুষ্টিকর তরল পদার্থের নিঃসরণ ঘটিয়ে জরায়ুকে ভূণলালনের উপযুক্ত করে। ডিম্বাণু ফোটার পর চক্রের পর্বকে বলা হয় হলুদপর্ব বা গর্ড-উৎপাদক পর্ব। যদি ডিম্বাণু উর্বর অর্থাৎ গর্ভসঞ্চার না হয়, এবং ভূণ এন্ডোমেট্রিয়ামে স্থান না নেয়, তাহলে ডিম্বাশয়ে হলুদ বস্তুটি ও উদ্দীপ্ত ফলিকলগুলো মারা যায়। তখন রক্তে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেসটেরোন হ্রাস পায়। এর ফলে হাইপোথালামাস আবার গোনাডোট্রোফিন নিঃসারিক হরমোন ছাড়তে থাকে, এবং পিটুইটারি। আবার ফলিকল-উদ্দীপক হরমোন উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। রক্তে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেসটেরোন ক’মে যাওয়ার ফলে পরবর্তী ঋতুস্রাবের দিন চারেক আগে থেকে জরায়ুর মোটা রসপূর্ণ আস্তরণ কুঁচকে যেতে থাকে; এর ফলে এর রক্তনালিগুলো গুটিয়ে যায়। ভাঙতে শুরু করে গোটানো রক্তনালিগুলো, আস্তরণের গভীরতর স্তরে ঘটতে থাকে রক্তপাত। এর ফলে রক্তের ওপর ভাগের আস্তরণ পৃথক হয়ে পড়ে; এটি ভেঙেচুরে পড়ে জরায়ুতে, এর সাথে পড়ে এন্ডোমেট্রিযাম থেকে টুইয়ে পড়া রক্ত ও তরল পদার্থ। ঋতুস্রাবে রক্ত বেশি থাকে না, নিঃসৃত বস্তুর এক তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক হয় রক্ত। এ-রক্ত সাধারণত চাপ বাঁধে না। কয়েক ঘন্টার মধ্যে এতোটা বর্জ্য জমে যে জরায়ু সংকুচিত হয়ে যোনির ভেতর দিয়ে তা বের করে দেয়। শুরু হয় ঋতুস্রাব।
ঋতুক্ষরণ তিন থেকে পাচ দিন ধরে চলে; তবে এক দিনের ক্ষরণ যেমন ঘটে, তেমনই আট দিন ধরেও ক্ষরণ ঘটতে পারে। ক্ষরণে সাধারণত গড়ে ৩০ মিলিলিটার রক্ত ঝরে। চক্রের প্রথম পর্ব, অর্থাৎ ঋতুক্ষরণ শুরু থেকে ডিম্বাণু ফোটা পর্যন্ত সময়টা নির্দিষ্ট নয়। এ-পর্বটি ৯ থেকে ২৫ দিনের, বা তারও বেশি দিনের হতে পারে। ডিম্বাণুটি কবে ফুটবে, তা জানাই কঠিন; জানলে সহজে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা যেতো। কেননা ডিম্বাণু ফলিকল থেকে বোরোনোর পর বাঁচে প্ৰায় ৭২ ঘন্টা, তবে তা উর্বর হতে পারে ৩৬ ঘন্টা পর্যন্ত। শুক্রাণু বাঁচতে পারে। ৪৮ ঘন্টা। তাই ২৮ দিনের একটি চক্রে উর্বরতার কাল ১২০ ঘন্টার বেশি নয়; কমও হতে পারে। সমস্যা হচ্ছে নারীর ডিম্বস্ফোটনের দিনটি জানা দুরূহ। তবে চক্রের ৯ম দিনের আগে ও ২০তম দিনের পর গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা কম। চক্রের দ্বিতীয় পর্ব, অর্থাৎ ডিম্বাণু ফোটার দিন থেকে নতুন চক্রের ক্ষরণ শুরুর দিন সব সময়ই হয় ১৪ দিন; তাই ডিম্বাণু ফোটার দিনটি জানা গেলে পরবতী চক্র শুরুর দিন কবে হবে, তা ব’লে দেয়া যায়। কিন্তু ডিম্বাণু ফোটার দিনটি নির্দিষ্টভাবে জার্নাঁ খুবই কঠিন। নারীর ভেতরে যা ঘটে, তার জন্যে তার প্রাপ্য ছিলো স্তব; কিন্তু পিতৃতন্ত্র তাকে করেছে তিরষ্কার; ঘোষণা করেছে। দূষিত ব’লে। কারণ নারীর কোনো-না-কোনো দোষ খুঁজে বের করতে পারলেই পিতৃতন্ত্র তার বিধানকে করে তুলতে পারে আরো নির্মম।
প্রেম ও কাম
প্রেম ও কাম পরস্পর সম্পর্কিত, দুটিই নারীপুরুষের জীবনের বিশেষ পর্বে প্রবলভাবে দেখা দেয়, যদিও জীবনে দুটির গুরুত্ব সমান নয়। প্রেম স্বল্পায়ু, মানুষ প্রেমে বাঁচে না, জীবনে প্রেম অপরিহার্য নয়; প্ৰেম বিশেষ বিশেষ সময়ে কোনো কোনো নরনারীর জীবনে জোয়ারের মতো দেখা দেয়, তাতে সব কিছু- অধিকাংশ সময় তারা নিজেরাই- ভেসে তলিয়ে যায়; তবে আজীবন মানুষ বাস করে নিম্প্রেম ভাটার মধ্যে। প্রেম তীব্র আবেগ, তা ঝড় জোয়ার বন্যা স্রোত ঘূর্ণির মতোই; ওগুলোর মতোই প্রেমও দীর্ঘস্থায়ী নয়, এবং ঘার বার দেখা দিতে পারে। তবে প্ৰেমকে অতিশায়িত ক’রে দেখা রোম্যান্টিক আন্দোলন-উত্তর কালের, পুরুষের, স্বভাব। প্রেমের থেকে কামের, আশ্লেষের, আয়ু অনেক বেশি কাম দোলনা থেকে কবর, চিতা পর্যন্ত বেঁচে থাকে। অপ্ৰেম জীবন দশকপরম্পরায় যাপন করে মানুষ, অধিকাংশের জীবনেই কখনোই প্রেমের ছোয়া লাগে না; কিন্তু কামহীন জীবন অসম্ভব। যাদের কাম আচরিতার্থ, যারা সঙ্গী পায় না। কামোর, তারাও একান্ত কামযাপন করে। প্ৰেম বলতে গত আড়াই শো বছর ধরে পশ্চিমের পৃথিবী যা বোঝে, এবং পশ্চিম থেকে ঋণ করে আমরা যা বুঝি এক শতাব্দী ধ’রে, তা রোম্যানটিকদের আবিষ্কার। পুরোনো পৃথিবীতে প্রেম ছিলো না; আজি আছে একটি বড়ো কিংবদন্তি হয়ে। যে-আবেগ প্ৰেম নামে নরনারীর মনে জেগে ওঠে বিপরীত লিঙ্গের কারো জন্যে, কিশোরতরুণের কাছে যা রক্তমাংসের অনেক ওপরের কোনো স্বপ্ন ব’লে মনে হয়, তা আসলে মাংসের জন্যে মাংসের সোনালি ক্ষুধা।
