বয়ঃসন্ধির কালে বালিকার ডিম্বাশয়ে থাকে দু-লক্ষের মতো ডিম্বাণু, তার মধ্যে এক ধরনের ডিম্বাণু থাকে, যেগুলোর ভেতরে দেখা দেয় তরল পদার্থ; ওগুলোর নাম ফলিকল। ফলিকল শব্দের অর্থ আধার। ফলিকল-উদ্দীপক হরমোনের কাজ ফলিকলকে উদ্দীপ্ত করা, এর ক্রিয়ার ফলে ডিম্বাশয়ের কোনো কোনো ফলিকল বিকশিত হয়। প্রথম দিকে খুব কম ফলিকলই বিকশিত হয়; তবে সেগুলো বৃদ্ধি পাওয়ার সময় উৎপন্ন হয় ইষ্ট্রোজেন নামের একটি হরমোন। ইষ্ট্রোজেন শব্দের অর্থ “ডিম্ব-উৎপাদক’ নাম থেকেই এর কাজ বোঝা যায়। ইষ্ট্রোজেন বালিকাকে করে নারী। উদ্দীপ্ত ফলিকলগুলো মাসখানেক ধ’রে ইষ্ট্রোজেন উৎপাদন ক’রে মারা যায়। এ-সময়ে আরো অনেক ফলিকলও উদ্দীপ্ত হয়, এগুলোও ইস্ট্রোজেন উৎপাদন করে। প্ৰতি মাসে আরো বেশি ক’রে (১২ থেকে ২০টি) ফলিকল উদ্দীপ্ত হ’তে থাকে, তাই ধীরেধীরে ইষ্ট্রোজেন উৎপাদনও বাড়ে। ইস্ট্রোজেনের অনেক কাজ; এটি স্তননালি ও স্তনবৃন্তের চারপাশের এলাকার বৃদ্ধি ঘটায়; এটি ডিম্বনালি, জরায়ু ও যোনিকে বাড়ার জন্যে উদ্দীপ্ত করে। এটি নিতম্বে মেদ সঞ্চার করে, তবে শরীরের বৃদ্ধি শ্লথ ক’রে দেয়। ক্রমশ শরীরে বেশ বৃদ্ধি পায় ইস্ট্রোজেনের পরিমাণ, ঋতুসূচনা সন্নিকট হয়ে আসে। ইস্ট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ার ফলে জরায়ুর ভেতরের দেয়ালের আস্তরণ বাড়ে। ওই আস্তরণকে বলে এন্ডোমেট্রিয়াম। এ-সময়ে হ্রাস পায়ে ফলিকল-উদ্দীপক হরমোন। যেই ফলিকলউদ্দীপক হরমোনের পরিমাণ কমতে থাকে, অমনি ডিম্বাশয়ে ফলিকল বাড়া থেমে যায়, এবং ইস্ট্রোজেন নিঃসরণও হ্রাস পায়। তখন জরায়ুর ভেতরের দেয়ালের আস্তরণ গঠিত যে-সব রক্তনালিতে, সেগুলো ভেঙে যায়; জরায়ুতে রক্তক্ষরণ ঘটে। চুৰ্ণবিচূর্ণ হয়ে যায এন্ডোমেট্রিয়াম। রক্ত, তত্ত্বর তরল পদাৰ্থ এবং এন্ডোমেট্রিয়ামের কোষ জমা হয় জরায়ুতে, তারপর বাইরে বেরিয়ে আসে যোনিপথ দিয়ে। শুরু হয়। রক্তস্রাব, দেখা দেয় ঋতুসূচনা।
ঋতুসূচনার পর থেকে প্রথমে অনিয়মিত, পরে নিয়মিতভাবে কিছু দিন পর পর দেখা দেয় মেয়েদের ঋতুস্রাব। সূচনার চার থেকে ছ-বছর, সতেরো থেকে উনিশ বছর বয়সের মধ্যে প্রতিটি মেয়ের ঋতুস্রাবের একটি বিশেষ ধরন দাঁড়িয়ে যায়। প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ধরন, তবে অধিকাংশ নারীরই, যদি সে গর্ভবতী না হয়, পয়তাল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত মাসে একবার ঋতুস্ৰাব ঘটে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের দিকে আবার অনিয়মিত হয়ে ওঠে; এবং চিরকালের জন্যে ক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়। একে বলে ঋতুসমাপ্তি মেনোপজয়। এক ঋতুস্রাবের সূচনা থেকে আরেক স্রাবের সূচনা পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ঋতুস্রাব চক্র। প্রতিটি চক্র শুরু হয়ে ক্ষরণ শুরুর দিন। তাই ঋতুচক্রের মধ্যে পড়ে ক্ষরণেব দিনগুলো, এবং আরেক স্রাব শুরু হওয়া পর্যন্ত দিনগুলো। অধিকাংশ নারী নিজের ঋতুচক্ৰ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কিছুই জানে না; এমনকি চক্রের দিনগুলো গোণার নিয়মও জানে না। উচ্চশিক্ষিত অধিকাংশ নারীও মনে করে একেকটি চক্র শুরু হয় ক্ষরণ সমাপ্ত হওয়ার পর দিন থেকে, যদিও চক্র শুরু হয় ক্ষরণ শুরুর দিন থেকে। সবার চক্ৰ সমান দীর্ঘ নয়; ঋতুচক্র ২২ থেকে ৩৫ দিনের হতে পারে, এবং গড়ে হয় ২৯ দিনের। পরবতী স্রাব ঠিক কোন দিন শুরু হবে, তা একশো ভাগ নিশ্চিতির সাথে বলা অসম্ভব, সাধারণত দু-চারদিন এদিক-সেদিক হয়। কিশোরীদের ঋতুস্রাব বেশ অনিয়মিত, সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দিন পর পর হয়, তবে কোনো কোনো মেয়ের হয় ঘন ঘন। ঋতুসূচনার পর প্রথম দু-এক বছর বছরে মাত্র দু-তিনবার দেখা দেয়, যখন দেখা দেয় তখন প্রবলভাবে দেখা দেয়। তবে পরে একটা নিয়মিত চক্র দাঁড়িয়ে যায়। ঋতুস্রাবে নারীর আভ্যন্তর ঘটনারাশির নিয়ন্ত্রক হাইপোথালামাস। মস্তিষ্কের এ-অংশটিও আবেগকাতর হয়, বিপর্যস্ত হয়; এবং প্রবল আবেগকাতরতার ফলে ঋতুস্রাব সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যেতে পারে। কোনো মেয়ে বাড়ি থেকে অন্য কোথাও গেলে, বা পেশা বদলালেও সাময়িকভাবে স্থগিত হতে পারে তার চক্ৰ। আবেগগত কারণে দু-তিন মাস, এমনকি বছর খানেকের জন্যেও স্থগিত হয়ে যেতে পারে ঋতুচক্র। এর নাম আমেনোিরয়েয়া বা ঋতুবিরতি। এটা রোগের ফলে ঘটতে পারে, এবং এর পেছনে কোনো রোগ নাও থাকতে পারে। রোগের কারণে না হ’লে ঋতুবিরতি কোনো গুরুত্বের ব্যাপার নয়। অনেকের ধারণা ঋতুস্রাবে শরীর পরিচ্ছন্ন হয়, তবে ঋতুস্রাবে শরীর পরিচ্ছন্ন হয় না; আর ঋতুস্রাব না হ’লেও তার ভেতরে কোনো আবর্জনা জমে না। ঋতুক্ষরণকে পুরুষেরা ঘেন্না করে, কামুকও এ-সময় নারীকে ছুতে চায় না; নারীরাও নিজেদের মনে করে অশুচি। এতে অশুচিত্বের কিছু নেই, সঙ্গম না। করারও কিছু নেই; বরং এ-সময়টা সম্পূর্ণ নিরাপদ, এবং অধিকাংশ নারী এ-সময়েই বোধ করে বেশি কামবেগ। ঋতুক্ষরণের রক্ত দূষিত নয়, ঘৃণার বস্তু নয়। গ্রিয়ার (১৯৭০, ৫১) বলেছেন, যদি তুমি নিজেকে মুক্ত মনে করো, তবে তুমি তোমার ঋতুরক্ত একটু চেখে দেখার কথা ভেবে দেখতে পারো-যদি তোমার এতে ঘেন্না লাগে, তবে আরো অনেক পথ বাকি আছে, মেয়ে।’
নারীর অভ্যন্তরে তার জীবনের প্রায় পয়ত্ৰিশ বছর ধরে মাসে মাসে পুনরাবৃত্ত হতে থাকে একই ধরনের সংকেত, সংকেতের ফলে ঘটতে থাকে একই ধরনের ঘটনা। ঘটনাগুলোর নিযন্ত্রক মস্তিষ্কের একটি অংশ, তার নাম হাইপোথালামাস। প্রথমে হাইপোথালামাস কাজ শুরু করে, সেটি গোনাডোট্রোফিন-নিঃসারিক হরমোন পাঠায় পিটুইটারি গ্রন্থিতে, উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে পিটুইটারির কোষ। পিটুইটারি ক্ষরণ করে দুটি হরমোন : একটি ফলিকল-উদ্দীপক হরমোন, আরেকটি হলুদ-উৎপাদক হরমোন। ফলিকল-উদ্দীপক হরমোনের কাজ ডিম্বাশয়ের ডিম্বাণু ফলিকলগুলোকে উদ্দীপ্ত করা। রক্তে ফলিকল উদ্দীপক হরমোন বাড়ার ফলে ডিম্বাশয়ে ১২ থেকে ২০টির মতো ডিম্বাণু উদ্দীপ্ত হয়। এ-ফলিকলগুলো বৃদ্ধি পায়, এবং উৎপাদন করে ইস্ট্রোজেন। ইস্ট্রোজেন-এর অর্থ ডিস্ক-উৎপাদক, এক্স কাজ ডিম্বাণু ফোটানো। ইস্ট্রোজেন একটি নারী হরমোন, এটি নারীদেহে নানা কাজ করে; তবে এর বিশেষ কাজ হচ্ছে জরায়ুর ভেতরের দেয়ালের আস্তরণ সৃষ্টি করা। ইষ্ট্রোজেন জরায়ুর আস্তরণকে উদ্দীপ্ত করে, তার ফলে আস্তরণ বিকশিত হয়। এ-আস্তরণের নাম এন্ডোমেট্রিয়াম। এর বৃদ্ধি ঘটে চক্রের ৫ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত। এটি সরু সরু নালিতে গঠিত, এতে থাকে কোষের কয়েকটি স্তর { ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে কোষের স্তর বৃদ্ধি পায়। জরায়ুতে যে পরিবর্তন ঘটে, তা বৃদ্ধিমূলক, তাই ঋতুচক্রের এ-পর্বকে বলা হয় চক্রের বৃদ্ধিপর্ব। এ-পর্বে নারীর ভেতরে তৈরি হয় নীড়, যেখানে বাসা বঁধতে পারে ভ্রূণ।
