–তা করোনি।
–যমুনা খুন করেছিল তার প্রেমিককে। আমি কাউকে খুন করিনি।
— তা করোনি।
–যমুনা দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল খুনের বিচার থেকে বাঁচতে। আমি দেশ থেকে পালাইনি।
–তুমি দেশ ছেড়েছিলে।
–দেশ ছাড়তে আমাকে বাধ্য করেছিল সরকার। রাজনৈতিক কারণে। দুটো দেশ ছাড়ার কারণ এক নয়।
— তা নয়।
–যমুনা একটা মালায়ালি ছেলেকে বিয়ে করে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছিল, যখন সোলার এনার্জির ওপর গবেষণা করছিল কেরালায়। আমি কেরালায় কোনও কিছু নিয়ে গবেষণা করিনি, ভারতের কোনও লোককে বিয়েও করিনি, ভারতের কোনও নাগরিকত্বও নিইনি।
–তা নাওনি।
–যমুনা কলকাতায় গিয়েছিল কেরালা থেকে। কলকাতায় চাকরি করতো। বাড়ি কিনেছিল, মেয়েকে ভালো ইস্কুলে পড়াতো। এসবের কিছুই আমার জীবনে ঘটেনি। আমি কলকাতায় থেকেছি বটে, তবে চাকরি করিনি। বাড়িও কিনিনি।
— তা ঠিক।
–যমুনার লেসবিয়ান রিলেনশিপ ছিল। নির্মলা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে থাকতো। কলকাতায় আমি একা ছিলাম। কোনও মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল না।
– তা ঠিক। ছিল না।
–যমুনার মেয়ে হারভার্ডে পড়তো। আমার কোনও ছেলে বা মেয়ে নেই, হারভার্ডেও পড়ে না।
–তা ঠিক।
–যমুনা মরে গেছে। আমি মরিনি।
–তা মরোনি।
–যমুনা আত্মহত্যা করেছে। আমি আত্মহত্যার বিরুদ্ধে। যমুনার বোন এসে যমুনার মৃতদেহ নিয়ে যায় দেশে। আমি মরিওনি, আমার মৃতদেহ কেউ নিয়েও যায়নি কোথাও।
— তা যায়নি।
— তাহলে কেন বলছো আমি যমুনা?
–তুমি যা বলছে তা আমি মানছি। তারপরও বলবো তুমি যমুনা।
–কেন? যমুনা সাহসী ছিল বলে? আর আমাকেও সাহসী হিসেবে মনে করো বলে? কিন্তু সাহসী মেয়েদের গল্প তো হামেশাই লিখছে লেখকরা। আর, যমুনাকে আমার কিন্তু খুব সাহসী মেয়ে বলে মনে হয় না। সাহস থাকলে ও আত্মহত্যা করতো না।
— তা ঠিক।
–এখনও বলবে আমিই যমুনা? নিশ্চয়ই নয়।
–আসলে তুমি যতই অস্বীকার করো না কেন, তুমিই যমুনা।
এরপর আমি আর কথা বলার উৎসাহ পাইনি। কী কারণে আমার উপন্যাসের চরিত্রকে আমার চরিত্র বলে ভাবা হয়, আমি জানি না। সে কি কয়েক বছর আমার আত্মজীবনী পড়ছে বলে গুলিয়ে ফেলে সব? উপন্যাস আর আত্মজীবনীর পার্থক্য ঠিক বুঝতে পারে না? ঠিক বুঝি না এ লেখকের দোষ, নাকি পাঠকের দোষ? যমুনা যে কাজগুলো করেছে, তার কিছুই আমি করিনি। যমুনা যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষায় আমি কথা বলি না। তবে কী কারণে আমাকে যমুনা বলে ভাবা হয়! যমুনার জন্ম ময়মনসিংহে, জীবনের কিছুটা সময় কলকাতায় বাস করেছিল, যমুনার এক বোন আছে, আমেরিকায় থাকে, যমুনার ভাই পারিবারিক সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে, এ ছাড়া যমুনার আর কোনও কিছুর সঙ্গে আমার কোনও কিছুর মিল নেই। কিন্তু এই মিলটুকুর কারণে আমাকে যমুনা বলে মনে করাটা রীতিমত অযৌক্তিক।
আমি তো আমার পরিচিত জগতের কথাই উপন্যাসে লিখবো, যা চিনি না জানি না তা কী করে লিখবো? লিখতে গিয়ে আমার নিজের জীবন, আমার চারপাশের জীবন, আমার দেখা, শোনা এবং পড়া নানারকম জীবনের অভিজ্ঞতাই আমার গল্প। উপন্যাসের চরিত্রে চলে আসে। কিন্তু উপন্যাসের কোনও চরিত্রকে আমার চরিত্র বলে। মনে হওয়ার কারণ কী? — হতে পারে লিখতে লিখতে আমার অজান্তে কোনও না। কোনওভাবে আমি একাকার হয়ে যাই সেই চরিত্রের সঙ্গে, সেই চরিত্র আর আমার চরিত্র ভিন্ন হলেও কোথাও না কোথাও দুটো চরিত্রের গভীর মিল থেকে যায়, খালি চোখে যে মিল দেখা যায় না, আর, দেখা গেলেও আমি হয়তো দেখিনা, অন্যরা দেখে। অথবা আমার যারা চেনা জানা, যারা বলে আমার উপন্যাসের চরিত্র আমার চরিত্রই, তারা আমাকে চেনে বা জানে বলে বিশ্বাস করে, আসলে তারা আমার কিছুই চেনে না বা জানে না।
মিডিয়া আর মিডলক্লাস মিডিওকার
কাল সকালে কলকাতা থেকে এক বন্ধুর ফোন এলো। কথাগুলো আমাদের এমন ছিল–
শ– আহ, কী যে ভালো লাগছে আজ। আনন্দবাজারে তোমাকে নিয়ে লিখেছে। আমি পড়ছি শোনো। সেই আগুন জ্বলে উঠেছে এখন তসলিমা নাসরিনের মধ্যেও। ইন্টারনেট খুললেই গোটা দুনিয়া তাঁর ঘরের ভেতর। সময়টা যেহেতু ফুরিয়ে আসছে, জীবনের সবটুকু রস আগ্রাসী ভাবে পেতে ইচ্ছে করে তাঁর। ফেসবুক-টুইটারে থেকে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে যোগাযোগ রাখছেন। আইপ্যাডেও সমান সিদ্ধহস্ত। আর এ সব নিয়েই তিনি এখন দিব্যি আছেন বাহান্নতে।
ত– বাহান্নতে?
শ– হ্যাঁ বাহান্নতে।
ত– বাহান্ন লিখেছে?
শ– হ্যাঁ বাহান্ন লিখেছে।
ত– কিন্তু আমি তো বাহান্ন নই।
শ– বাহান্ন নও মানে? বাহান্নই তো লেখা আছে এখানে।
ত– কে লিখেছে?
শ– সংযুক্তা বসু লিখেছে। আনন্দবাজারের সাংবাদিক।
ত–ও তো আমাকে ফোন করেছিল কদিন আগে। বাহান্ন শব্দটাই তো উচ্চারিত হয়নি। পঞ্চাশ নিয়েই কথা হচ্ছিল। ও কিছু প্রশ্ন করেছিল। আমি ওর প্রশ্ন আর আমার উত্তর নিয়ে একটা ব্লগও লিখেছি। সংযুক্তা তো পড়েছে ব্লগটা।
শ– তোমার ওই পঞ্চাশ নামের ব্লগটা তো? আমিও তো পড়েছি। আমি তোমার সব ব্লগ পড়ি।
ত– কিন্তু ভাবছি, সংযুক্তা এই ভুলটা করলো কেন। পঞ্চাশের বদলে বাহান্ন লেখার কারণ কী? সে কি জানে না আমার বয়স? আমাকে তো জিজ্ঞেস করলো, পঞ্চাশ হওয়ার পর কেমন ফিল করছেন বলুন। বয়স না জানলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতো, আমার যে কোনও বই ওল্টালে তার জ্যাকেটেই পেতে পারতো জন্ম তারিখ, আমার ওয়েবসাইটেও আছে, নেটে সার্চ করলেই বেরিয়ে পড়তো। আমার বয়স জানা তো বেজায় সহজ। কিন্তু বানিয়ে বাহান্ন লিখবে কেন! আজকাল সাংবাদিকরা বড় আলসে হয়ে গেছে। সন্ধেবেলায় কোন মদের পার্টিতে যাবে তার হিসেব রাখতেই ব্যস্ত। সিরিয়াসলি সাংবাদিকতার কাজটা করে না। মানে বাট মুভ করে না। ডেস্কে বসেই দুনিয়ার খবর লেখে।
