সিপিআইএম-এর চরিত্র বলে এখন আর কিছু নেই। আমার মতো একজন ধর্ম মুক্ত মানববাদী লেখককে রাজ্য থেকে দূর দূর করে যারা তাড়াতে পারে, তারা ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে একই সুরে কথা বলবে, অবাক হওয়ার কী আছে! মেয়েদের যৌন হেনস্থার জন্য মেয়েদের পোশাককে দায়ি করা মানে মেয়েদের পছন্দ মতো কাপড় চোপড় পরার স্বাধীনতাকে ধর্ষণ করা। সত্যি কথা বলতে, সেদিন রেজ্জাক মোল্লা মেয়েদের স্বাধীনতা আর অধিকারকে জনসমক্ষে ধর্ষণ করেছেন।
নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার অভিযানে নেমে রেজ্জাক মোল্লা বলছেন, এখন যারা প্যান্ট-গেঞ্জি-টপ পরছে তারা গোল্লায় যাক। আপনারা সালোয়ারের উপরে উঠবেন না। এই বিষয়গুলি টেনে না ধরলে বিপদ। আমরা বাড়ির দুই মেয়ের একজন ডবলিউবিসিএস এবং একজন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। তাদের দুজনকে সালোয়ার কামিজের মধ্যে ধরে রেখেছি। তিনি তাঁর কন্যাদের সালোয়ার-কামিজের মধ্য ধরে রেখেছেন, এর মানে তাঁর কন্যাদের অধিকার নেই তাদের পছন্দের পোশাক পরার। কারণ তিনি মেয়েদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। পুরুষ সিদ্ধান্ত নেবে মেয়েরা কী পোশাক পরবে। এসব বলে কমিউনিস্ট নেতা আরও স্পষ্ট করলেন যে তিনি নিজ বাসভূমে এক উৎকট পিতৃতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র বহাল রেখেছেন। এ কম লজ্জার নয়। তার ওপর আবার কতটুকু নির্লজ্জ হলে রাজ্যের বা দেশের মেয়েরা কী পোশাক পরবে, তা নির্ধারণ করতে নামেন। কোন পোশাক শালীন, কোন পোশাক শালীন নয় তাও বেশ ঘোষণা করে দেন। মেয়েদের বেলায় শুধু শালীনতা অশালীনতার প্রশ্ন ওঠে কেন! তিনি তো কোনও পুরুষের কোন পোশাক শালীন, কোন পোশাক অশালীন তা বলেন না! তাঁর বাড়ির বা পাড়ার পুরুষেরা খালি গায়ে লুঙ্গি বা গামছা পরে তার চোখের সামনে প্রতিদিন হাঁটাহাঁটি করে না। তিনি নিজেও নিশ্চয়ই করেন। কখনও কি মনে হয়েছে লুঙ্গি শালীন পোশাক নয়, খালি গা শালীন নয়, গামছা পরা অশ্লীল? যে কারণে একটি মেয়ের জিনসকে তিনি অশালীন বলছেন, সে কারণে একটি ছেলের জিনসকে তিনি অশালীন বলছেন না কেন? যে কারণে একটি মেয়ের টিসার্টঅশালীন, সে কারণে একটি ছেলের টি শার্ট কেন অশালীন নয়? শালীনতার সংজ্ঞা তৈরি করার দায়িত্বটি কার? পুরুষের? রেজ্জাক মোল্লাদের?
আধুনিক পোশাকের বদলে রবীন্দ্র-যুগের ঠাকুরবাড়ির পোশাকের পক্ষপাতী রেজ্জাক মোল্লা। বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের আমলে যে ড্রেস-কোড ছিল তা সঠিক বলে মনে করি। রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে মেয়েরা শাড়ির সঙ্গে লম্বা হাতের ব্লাউজ পরতেন, কেউ কেউ মাথায় ঘোমটাও দিতেন। সেই পোশাকই রেজ্জাক চাইছেন এখনকার মেয়েরা পরুক। আধুনিক মেয়েরা ফিরে যাক উনবিংশ শতাব্দীর পোশাকে।
শাড়ির প্রতি হিন্দু হোক মুসলিম হোক, পশ্চিমবঙ্গের সব রক্ষণশীল মানুষেরই পক্ষপাত। ইস্কুলের শিক্ষিকাদের কদিন পর পরই ড্রেস কোড দেওয়া হয়, সালোয়ার কামিজ চলবে না, সবাইকে শাড়ি পরতে হবে। অশালীন বলতে যদি শরীরের ত্বক প্রকাশ হওয়াকে বোঝানো হয়, তবে শাড়ি সবচেয়ে অশালীন পোশাক। এবং সবচেয়ে শালীন পোশাক প্যান্ট-সার্ট। শাড়ি পরে দৌড়ঝাঁপ করা, দৌড়ে বাসে ট্রামে ট্রেনে ওঠা ঝামেলা, শাড়িতে টান পড়লে শাড়ি খুলে পড়বে। শাড়ি ভারতীয় উপমহাদেশের আদি পোশাক। আমাদের পূর্বনারীরা যখন শাড়ি পরতেন, তখন কিন্তু সঙ্গে সায়া-ব্লাউজ পরতেন না। সে নিশ্চয়ই অশালীনতার চূড়ান্ত। সবকিছুর বিবর্তন হয়, কাপড় চোপ ড়েরও। বিবর্তনে যাদের বিশ্বাস নেই, তারা হাতের কাছে যা পায়, তা-ই আঁকড়ে ধরে, তা নিয়েই অনন্তকাল কাটিয়ে দিতে চায়।
রেজ্জাকের বক্তব্য, লেখাপড়া করা মানে প্যান্ট-টপ পরতে হবে এমন নয়, আপনারা শপিং মলের মতো জায়গায় যাবেন না। কমিউনিস্ট নেতা মৌলবাদী নেতার মতো কথা বলছেন, মেয়েরা কী পরবে না, কোথায় যাবে না, তা বলে দিচ্ছেন। এর অন্যথা হলে বিপদ হবে, তারও হুমকি দিচ্ছেন। মেয়েদের শুধু পুরুষের সম্পত্তি নয়, এই সমাজেরও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে বিশ্বাস করা হয়। সে কারণে সমাজের লোকেরা একটা মেয়ে কী পরলো, কী করলো, কোথায় গেল, কী খেলো, কার সঙ্গে কথা বললো, কার সঙ্গে শুলো, কখন বাড়ি ফিরলো এসবের খবরাখবর রাখে। লক্ষ্মণ রেখা পেরোলেই সর্বনাশ। সমাজের লোকেরাই সিদ্ধান্ত নেবে মেয়েকে একঘরে করতে হবে নাকি পাথর ছুঁড়ে মারতে হবে। মেয়েদের শরীরকে অর্থাৎ মেয়েদের যৌনতাকে শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলার আরেক নাম পুরুষতন্ত্র। এই শেকল যতদিন না ভাঙা হবে, ততদিন মেয়েদের সত্যিকার মুক্তি নেই, ততদিন তাদের পোশাক আশাক আর তাদের চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকবে। রেজ্জাক মোল্লা আমাদের এই পুরুষতা ন্ত্রিক নারীবিরোধী সমাজের যোগ্য প্রতিনিধি। তিনি আজ পুরুষদের একরকম আহ্বা নই জানালেন টপ জিনস পরা মেয়েদের ধর্ষণ করার জন্য। বলেছেন টপ জিনস পরা ধর্ষিতারা যেন ধর্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না করে, কারণ ধর্ষিতারা নিজেদের ধর্ষণের জন্য দায়ী, ধর্ষকরা নয়। এখন পঙ্গপালের মতো পুরুষেরা নেমে পড়বে রাস্তা-ঘাটে ঘরে-বাইরে শপিং মলে, নির্দ্বিধায় নিশ্চিন্তে মেয়েদের ধর্ষণ করবে। রাজনীতির হর্তা কর্তাদের সম্মতি পেলে কে বসে থাকে।
