ছোটদা কী করে এত ধীর, এত স্থির, এত শান্ত থাকতে পারে, জানি না। মাও এমন ছিল। মাকে যদিও আমরা কেউ জানাইনি যে মার ক্যানসার হয়েছিল। মা বুঝেছিল সবই। কোনও অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই, ধরিত্রীর মতো সহিষ্ণ ছিল মা।
মাঝে মাঝে মনে হয় ছোটদা বোধহয় ক্যানসারের আতংককেই, এর সর্বগ্রাস কেই, ক্যানসারের মৃত্যুকেই অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে নিয়েছে। সেই ছোটবেলার মতো, গিটার, গণআন্দোলন, রাজনীতি, প্রেম, গান্ধর্ব বিয়ে, বস্তির ঘর, চিপাঁচস, থিয়েটার, দুশো টাকার চাকরি, বাউণ্ডুলে জীবন, বিমান, রমণীকুলের পল্লবে ডাক, মদ্যপান সবই যেমন ছিল অ্যাডভেঞ্চার! ছোটদার জন্য মায়া হয়, ভীষণ মায়া। এবার যখন এসেছিল দিল্লিতে, আশায় টগবগ করছিল ছোটদা, কিন্তু ডাক্তাররা কোনও আশার কথা শোনালো না। না শোনাক, তারপরও ছোটদাকে নিয়ে ভালো ভালোসিনেমা দেখলাম, ভালো ভালো রেস্তোরাঁয় ভালো ভালো খাবার খেলাম, ছোটবেলার, বড়বেলার গল্প করলাম প্রচুর। থেকে থেকে আমি বিজ্ঞানের কথা পেড়েছি, বিগ-ব্যাঙ, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, প্রাণীর জন্ম, বিবর্তন, মানুষ। কত শত ঈশ্বরকে মানুষ রচনা করেছে, কত শত ঈশ্বর নির্বংশও হয়ে গেছে। ছোটদা সব মন দিয়ে শুনেছে এবার। মৃত্যুকে দুরকম ভাবে গ্রহণ করা যায়। এক, যাচ্ছি, এ যাওয়া সাময়িক, পরকালে আবার দেখা হবে। দুই, কোনওদিনই আর দেখা হবে না, আর সব প্রাণী যেমন যায়, বাঁদর-শিম্পাজি থেকে বিবর্তিত প্রাণীকেও তেমন যেতে হয়। সহস্র কোটি বছর ধরে প্রাণীজগতে এমনই হচ্ছে। ভালো যে জন্মেছিলাম, কত কিছু তাই জানলাম, দেখলাম, শিখলাম, কন্ট্রিবিউট করলাম। জীবনের অর্থ নেই। কিন্তু সামান্য কিছু হলেও তো অর্থপূর্ণ করতে পেরেছি জীবন! জীবনের ওইটুকুই সার্থকতা।
আমি দ্বিতীয় মতটিকেই সমর্থন করি। দ্বিতীয় মতে আছে সত্যকে বরণ করা, আর প্রথম মতে মিথ্যের আশ্রয়, মৃত্যুকে মেনে নিতে না পারা। মৃত্যুর মতো ভয়ংকর সত্যকে মানুষ মেনে নিতে পারে না বলেই তো স্বর্গ নরকের কল্পনা করেছে।
ছোটদা আর আমি আমার কিশোর বয়সে অচিনপুর নামে একটা উপন্যাস পড়তাম। উপন্যাসের প্রথম লাইনটা ছিল, মরবার পর কী হয়, নবুমামা?একটা আট ন বছর বয়সের ছেলে রাতের পুকুরে নেমে সাঁতার কাটতে থাকা তার নবুমামাকে এই প্রশ্নটি করেছিল। নবুমামা কী উত্তর দিয়েছিল, তা আমার আর মনে নেই। জানি না ছোটদার। মনে আছে কি না।
আমরা যতই বিজ্ঞান বুঝি, যতই তারা ধর্ম বুঝুক, কেউ মরতে চাই না। যতই বলি না কেন, দীর্ঘ যন্ত্রণাময় জীবনের চেয়ে চমৎকার নাতিদীর্ঘ জীবনই ভালো, সবাই আমরা। আসলে বাঁচতে চাই। দুঃখ কষ্টে জীবন ডুবে থাকলেও বাঁচতে চাই বেশির ভাগ মানুষ। অনন্তকাল যদি বাঁচা সম্ভব হতো, অনন্তকালই বাঁচতে চাইতাম। কেন মরবো, মরে কোথায় যাবো? কোথাও না। এই কোথাও না-টা কল্পনা করলে গা শিউরে ওঠে। এক সময় বিজ্ঞান হয়তো এমনই অগ্রসর হবে, যে, মানুষকে আর মরতে হবে না। এখনই তো অনেককিছুর রিসার্চ দেখে অনুমান করা যায়, ভবিষ্যতে মানুষ যতদিন খুশি বেঁচে থাকতে পারবে। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা ভবিষ্যতে জন্মাইনি। বর্তমানে জন্মেছি। নিশ্চয় করে আসলে কিছুই বলা যায় না। আর কুড়ি বছর পর হয়তো গোটা পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে। যেতে পারে পারমাণবিক বোমায়। আর তিরিশ বছর পর হয়তো এসটোরয়েড বা কমেট নেমে পৃথিবীর সব প্রাণীকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে, ডায়নোসরসহ সব প্রাণীকেই যেমন করেছিল ছশ পঞ্চাশ লক্ষ বছর আগে।
যখন চারদিক থেকে কোনও আশার বাণী শুনতে পাচ্ছিল না, ছোটদা এবার একটা কথা বলেছিল দিল্লিতে, সেই কথাটা এখনও বুকে বাজে, হু হু করে ওঠে ভেতরটা, আর বড় মায়া হয়, বড় মায়া হয় ছোটদার জন্য, বলেছিল, মারা যাচ্ছি এটা জানা, আর মারা। যাচ্ছি এটা না জানায় অনেক তফাৎ।
অনেকক্ষণ আমি চুপ হয়ে ছিলাম। হয়তো হঠাৎ করে বড়দা বা আমি মরে যাবো। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, ছোটদা রয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের মৃত্যুতে এইটুকু সান্ত্বনা যে। আমরা মৃত্যুর আগে প্রতিটি মুহূর্তে জানছি না যে মারা যাচ্ছি। এই যে আমি শরীরের কোনও আনাচ কানাচে ক্যানসার বাসা বাঁধছে কিনা তা জানার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হচ্ছি না, বা টেস্টগুলো করছি না, সে সম্ভবত এ কারণেই যে, যদি ক্যানসার হয় তা জেনে প্রতি মুহূর্তে কষ্ট পাওয়ার, দুশ্চিন্তা কার, হতাশায় ভোগার দরকার নেই। মৃত্যু একবারই আসুক, শতবার নয়, প্রতিদিন নয়।
ছোটদা আরও একটা কথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, ক্যানসার ধরা পড়ার পর দিনে একশ দুশ লোক ফোন করতো। এখন আর কেউ তেমন ফোন করে না। মনে মনে ভাবি, ক্যানসারের খবরটাই আজকাল মৃত্যুর খবরের মতো। সম্ভবত শোকবার্তাটা তাই প্রথমেই জানিয়ে দেয়।
এত খাচ্ছি, তারপরও ওজন কমছে- ছোটদা একদিন দুঃখ করে বললো। কোনও সান্ত্বনা তাকে দিতে পারিনি। জীবনে এমন কিছু কিছু সময় আসে, যখন ঠিক বোঝা যায় না কী বলবো বা কী বলা উচিত।
এরকম যদি হতো, রেডিওথেরাপি শেষ হওয়ার পর দেখা যেতো ছোটদার ক্যানসার সেলগুলো সব মরে গেছে, আর ফিরে আসবে না ক্যানসার! অন্তত কুড়ি পঁচিশ বছরের মধ্যে তো নয়ই। আমি প্রকৃতির কাছে, অলৌকিকতার কাছে প্রার্থনা করছি, ছোটদা বেঁচে থাকুক। বিপ্লবী ছোটদা, অঘটনঘটনপটিয়সী ছোটদা, অসম্ভবকে সম্ভব করা ছোটদা আরও দীর্ঘ দীর্ঘ বছর বেঁচে থাকুক। উড়ে ঘুরে দৌড়ে বাঁচুক। এভাবে অসুস্থ মানুষের মতো বিছানায় শুয়ে শুয়ে নয়। ছোটদা যা-ইচ্ছে-তাই-করে-বেড়ানোর ছেলে। ছোটদা আরও দীর্ঘ দীর্ঘ বছর যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াক। জীবনকে আরও অর্থপূর্ণ করুক, আলোকিত করুক। আবার গিটারে আগের সেই সুর তুলুক, যে সুরে পুরো শহর এক সময় মোহিত হতো।
