সম্পদ এবং সম্পত্তি জীবনযাপনের জন্য অবশ্য প্রয়োজন, এবং মানুষের মর্যাদা বাড়াবার জন্যও । মুসলিম উত্তরাধিকারী আইন মেয়েদের অসম্মান করবার নানাবিধ ব্যবস্থা নিয়েছে। স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তার সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ পান, তাদের কোনও সন্তান না থাকলে স্বামী দুই ভাগের এক ভাগ পান—অথচ স্বামী মারা গেলে স্ত্রী তার সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ পান, তাদের কোনও সন্তান না থাকলে স্ত্রী চার ভাগের এক ভাগ পান। স্ত্রী এবং স্বামীর ক্ষেত্রে সম্পত্তি বণ্টনের এমন অসাম্য কেন? অসাম্য কেন সন্তানের ক্ষেত্রে? ছেলে ও মেয়ে থাকলে মেয়ে ছেলের অর্ধেক সম্পত্তি পান। মৃত বাবা ও মায়ের অন্যান্য উত্তরাধিকারীর অবর্তমানে একমাত্র ছেলে তার বাবা ও মায়ের সব সম্পত্তির মালিক হন এবং এ ক্ষেত্রে একমাত্র মেয়ে হলে তিনি মৃত বাবা মায়ের সম্পত্তির দুই ভাগের এক ভাগ পান। স্বামী এবং স্ত্রীর ক্ষেত্রে, ছেলে এবং মেয়ের ক্ষেত্রে সম্পত্তির এমন অসম বণ্টন কেন, প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলের নেত্রী? ধনী দরিদ্রে পার্থক্য ঘোচানো যেমন প্রয়োজন, পুরুষ এবং নারীতেও কি নয়? যদি এই ব্যবধান, এই অসাম্য ঘোচানো সম্ভব না হয় তবে জমিজমার রাষ্ট্ৰীয়করণই করুন না কেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যেটি সবচেয়ে মঙ্গলময়। নাকি এ সম্ভব নয় যেহেতু চারপাশের পুরুষ-উপদেষ্টার চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মের চাপ, সাম্রাজ্যবাদের চাপ, বিদেশি সাহায্যের চাপ আপনাকে ক্ষমতায় আসীন রাখবে। এবং আপনি নেহাতই আপনার স্বামীর নির্জলা প্রতিনিধি—আপনার নিজস্ব কোনও বিচারণ নেই, বিবেচন নেই, বোধ নেই, ধর্ম নেই, আদেশ নেই, অধ্যাদেশ নেই!
৫৭. যত যে রাণী হোক, সে তো নারীই
১. দেলমিরা আগুসতিনি উরুগুয়ের মেয়ে। দশ বছর বয়স থেকে কবিতা লেখেন। দেলমিরা তাঁর ‘সুদূর থেকে’ কবিতায় লিখেছেন—‘তুমি দূরে গেলেই আমার কান্না উপচে পড়ে/তোমার পায়ের শব্দ শুনে ঘুমের ভেতর সুখে নেচে উঠি,’ নিশ্চয় আমরা ভাবতে পারি, তিনি একজনকে বড় গভীর করে ভালবাসেন, যার নৈকট্য তিনি প্রার্থনা করেন। দেলমিরা লিখেছেন—‘আমার হৃদয় আর তুমি মুখোমুখি দাঁড়ানো, সমুদ্র এবং আকাশের মত/এদের মাঝখানে উড়ান মেঘের মত চলে যাচ্ছে স্রোত ও সময়, জীবন ও মৃত্যু।‘
দেলমিরা যাকে ভালবাসতেন, ভালবেসে যাকে তিনি জীবনের সঙ্গী করেছিলেন, সে-ই তাঁর লেখার একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দেলমিরা এই প্রতিবন্ধকতা শেষ অদি মেনে নিতে পারেননি, তিনি স্বামীর কাছে তালাক চেয়েছিলেন। বিনিময়ে স্বামী তাকে হত্যা করে এবং নিজেও আত্মঘাতী হয়। ১৮৮৬ সালে জন্মে মাত্র আঠাশ বছর বেঁচে ছিলেন কবি দেলমিরা আগুসতিনি। পাঠক, আমরা আজ দেলমিরা আগুসতিনিকে চলুন সর্বোত্তম শ্রদ্ধা জানাই এবং তার হত্যাকারী স্বামীকে অভিসম্পাত ।
২ জুলিয়া দ্য বারজোসের একটি কবিতার শিরোনাম জুলিয়া দ্য বারজোসকে। নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জুলিয়া বলছেন… ‘যে কণ্ঠস্বর আমার কবিতায় কথা বলে, সে তোমার নয়, আমার কণ্ঠস্বর/তুমি যদি পোশাক, আমি তার সুগন্ধ/আমাদের মাঝখানে শুয়ে আছে গভীর গহ্বর/তুমি সামাজিক মিথ্যের উপর দাঁড়ানো একটি ফ্যাকাসে পুতুল/আমি সত্য, আমি বীর্যবান অগ্নিকণা তুমি, তোমার পৃথিবীর মত স্বার্থপর, আমি নই/আমি আমার মত হতে আমার সকল কিছু নিয়ে জুয়োয় বসতে পারি/তুমি একজন নিপুণ সংসারী মেয়ে, শ্রীমতি জুলিয়া/আমি নই। আমি জীবন। আমি শক্তি। আমি নারী/তুমি তোমার স্বামী, তোমার মালিকের অধিকৃত দ্রব্য। আমি নই/আমি কারও সম্পত্তি নই, আমি সকলের, আমি সকলের জন্য, সকলের আমি/নিজেকে আমি শুভ্ৰ চিন্তা ও অনাবিল ভাবনা দিয়েছি। তুমি তোমার চুল কাল কর, মুখে প্রসাধন মাখো, আমি নই/আমার চুল কাল করে বাতাস, আমার মুখ রঙিন করে সূর্য তুমি ঘরের বধু বশ্যতা স্বীকার করা বিনীত বধ/নানা গোঁড়ামি ও কুসংস্কারে ক্লান্ত, আমি নই/আমি দ্রুতগামী অশ্ব, পৃথিবী ঘুরে খুঁজে ফিরি সামান্য সমতা।‘
১৯১৪ সালে জুলিয়া দ্য বারজোস পুয়েরতো রিকোয় জন্মেছেন, বড়ও হয়েছেন ওখানে। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নানা অসুখে ভুগে জীবনের অধিক সময় তার হাসপাতালেই কেটেছে। নুইয়র্ক শহরের রাস্তায় অজ্ঞাতপরিচয় জুলিয়া দ্য বারজোস একদিন মরে পড়ে ছিলেন (১৯৫৩)। বেঁচে থাকতে যৎসামান্য পরিচিতি পেলেও জুলিয়া এখন পুয়েরতো রিকের প্রধান কবি হিসেবে খ্যাতি পাচ্ছেন।
৩. কবি জুয়ানা, জুয়ানা ফেরনানদেজ জন্ম নিয়েছেন ১৮৯৫ সালে। ক্যাপটেন ডি. লুকাস ইবারব্যুরোকে বিয়ে করে নাম নিয়েছেন জুয়ানা দ্য ইবারব্যুরো। উরুগুয়েরর নানা রাজ্যে ঘুরে মনটেভিডিও শহরে এসে জুয়ানা স্থায়ী হন। ১৯১৯ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বেরোয় এবং তার প্রতিভার খবর ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ১৯২৯ সালে লাতিন আমেরিকা ও স্পেন জুড়ে তার অগাধ খ্যাতি ও ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানাতে জুয়ানা নিজের নাম রাখেন জুয়ানা দ্য আমেরিকা । বন্ধন নামে একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন–‘আমি প্লাবিত হয়েছি তোমার জন্য/আমাকে পান কর/স্ফটিকও আমার ঝরনার স্বচ্ছতাকে ঈর্ষা করে/আমি ডানা মেলেছি তোমার জন্য/আমাকে হানো/রাতের প্রজাপতি আমি, তোমার অধীর আগুনের চারদিকে ঘুরে মরি/—আমার চুলে পুতির মালার বদলে দোলে দীর্ঘ কণ্টক,/কানের দুলে দুটুকরো পদ্মরাগ মণির বদলে দুটো গনগনে কয়লা/আমাকে দেখে/আমার যন্ত্রণা দেখে তুমি হাসছ/একদিন তুমিই কাদবে/এবং তারপর তুমি আমার হবে/এর আগে যা তুমি হওনি কখনও ।’
