শহীদুল্লাহ কায়সার দীর্ঘকাল ধরে একটি সুবিদিত সরকারবিরোধী দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। আর তার পুঁজিবাদ বিরোধিতাও সরকার বা অন্য কারো অজানা নয়, তবুও তার পক্ষে ‘আদমজী সাহিত্য-পুরস্কার পেতে কোনো বাধা হয় নি। সরকার প্রবর্তিত ট্রাস্ট পত্রিকায় চাকরি করেও শামসুর রাহমানইতো আমাদের বর্ণমালার বিরুদ্ধে আক্রমণের সবচেয়ে জোরালো উত্তর দিয়েছেন কবিতার মাধ্যমে। যে সব প্রবীণ আর তরুণ কবি ‘দাউদ’ বা ‘আদমজী’ সাহিত্য-পুরস্কার গ্রহণ করলে ‘পুঁজিপতিদের চরণাশ্রিত হয়ে পড়ার কাল্পনিক ভয়ে এমন যত সব বেসামাল উক্তি করেছেন তারা আমাদের এ সব তরুণদের দিকে তাকিয়ে দেখলে বুকে সাহস আর মনে বল পাবেন। আর বুঝতে পারবেন, খাঁটি লেখকদের চরিত্র এমন হালকা নয় যে, মাত্র পাঁচ হাজার তংকার বিনিময়ে তাঁরা পুঁজিপতিদের চরণাশ্রিত হয়ে পড়বেন। আমাদের সাহিত্যের খবরাখবর যারা রাখেন তারা জানেন, এখনকার লেখক সংঘ ঠিক সূচনার যুগের লেখক সংঘ নয়। নয় বলেই ‘মহাকবি সম্মেলন’, স্বদেশী গানের আসর ‘আফ্রো-এশীয় সাহিত্য সংস্কৃতি’ অনুষ্ঠান প্রভৃতির আয়োজন করা লেখক সংঘের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। লেখক সংঘের মুখপত্র ‘পরিক্রমে আমি এ যাবত সরকার কিংবা পুঁজিপতিদের প্রচারণামূলক কোনো লেখা দেখি নি। কালের দীর্ঘ ব্যবধানে নোবেল প্রাইজের আজ এমন একটা বিশ্বব্যাপী ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছে যে, আলফ্রেড নোবেলের ডিনামাইট আবিষ্কার আর তার সর্বাত্মক ধ্বংসর ভূমিকার কথা লোকে ভুলেই গেছে–তার দান ও অবদানের মূল্যটাই রয়ে গেছে চিরজীবী হয়ে। আমার বিশ্বাস, অনুরূপভাবে ‘আদমজী’ বা ‘দাউদ শিল্পগোষ্ঠীর যদি কোন অশুভ ভূমিকা থেকেও থাকে, কালক্রমে সমাজ বিবর্তনের সাথে সাথে তা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে, টিকে থাকবে তাদের অবদান আর তার থেকে সৃষ্ট ঐতিহ্যটুকু। অবশ্য ক্ষেত্র আর পরিমাণ অনুসারে তা হবে ক্ষুদ্রায়তন।
তবে সব কিছুই কালের ওপর, সমাজ বিবর্তন আর তার মূল্যবোধের ওপরই নির্ভরশীল। যা কিছুতে শুভের সম্ভাবনা আছে, তাকে বিনষ্ট করার আমি বিরোধী। আর এও আমার বিশ্বাস, মানুষের মতো কোন প্রতিষ্ঠানও অশোধনীয় নয়।
[‘সাহিত্য ও সাহিত্য-পুরস্কার’ প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৪-এ সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ গ্রন্থে।]
সাহিত্য ও সাহিত্যিক
সাহিত্য এক পুরোনো ব্যাপার। মানুষ যখন থেকে মানুষ হয়ে উঠেছে অর্থাৎ ভাবতে আর অনুভব করতে শিখেছে তখন থেকেই সাহিত্যের সূচনা। সংক্ষেপে সাহিত্য ভাব আর অনুভূতির প্রকাশ। প্রকাশ সাহিত্যের অপরিহার্য শর্ত। সব মানুষই অল্পবিস্তর ভাবতে আর অনুভব করতে পারে কিন্তু প্রকাশ করতে পারে লাখে এক। এখানেই সাহিত্যিকের অনন্যতা। ভাব আর অনুভূতি প্রকাশিত হয়ে দেখা না দিলে সাহিত্য হয় না। তাই উপহাসের বেশি নীরব কবি’ কথাটার কোন মূল্য নেই।
মাটির নিচে অজস্র ফল্গুধারার অস্তিত্ব ভূতত্ত্ববিদদের স্বীকৃতি পেয়েছে; কিন্তু সব ধারা নদী হয়ে, ঝরনা হয়ে কিংবা সমুদ্রের রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসে না। যে সব স্রোত নিজের দুর্বার গতিতে মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে আসে স্রেফ সেগুলোই রূপ নেয় নদী, ঝরনা আর সমুদ্রের। বাদবাকি হারিয়ে যায় মাটির নিচে।
ভাব বা অনুভূতির বেলায়ও এ কথা–যার মনে কোনো চিন্তা বা অনুভূতি দুর্বার হয়ে ওঠে, প্রকাশের জন্য করে আকুলি-ব্যাকুলি সেই হয় সাহিত্যিক, অর্থাৎ সে খুঁজে নেয় বা খুঁজে পায় নিজের প্রকাশের মাধ্যম। অবশ্য কৃত্রিমতা সব ক্ষেত্রেই আছে–সাহিত্যেও দেদার। স্রেফ লেখক হওয়ার জন্যও অনেকে লেখে–হয়তো মনের ভেতর। আন্তরিক কোনো অনুভূতির সঞ্চার হয় নি, কোনো ভাবই মনের ভেতর হয়ে ওঠে নি। দুর্বার, তবুও লিখতে চায় কেউ কেউ, লেখেও হরহামেশাই। এমন লেখাকে স্রেফ কাগজের ফুলের সঙ্গেই দেওয়া যায় তুলনা। বাগানের পুষ্পসভায় যেমন কাগজের ফুলের কোনো স্থান নেই, তেমনি সাহিত্যের শাহি দরবারেও স্থান নেই আন্তরিকতাহীন কৃত্রিম রচনার। আন্তরিক ও হৃদয়-উৎসারিত রচনা আমাদের বর্তমান সাহিত্যে বিরল বললেই চলে। এর জন্য বহুতর কারণ যে রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। সামাজিক, অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক–অন্য সব মানুষের মতো লেখকদের জীবনও এ তিন সূত্রে বাঁধা–এ তিনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সামাজিক জীব বলেই এ তিনের বন্ধন অস্বীকার করা লেখকেরও সাধ্যাতীত।
এককালে যখন শিল্পী-লেখকরা রাজা-বাদশা কি ভূস্বামীদের পোষ্য ছিল তখন লেখা হয়তো পণ্য ছিল না, এখন অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত–অন্য দশটা পণ্যের মতো এখন লেখাও একটি পণ্য মাত্র। লেখকরাও পণ্যোৎপাদনকারী। এ পণ্যের ওপরই নির্ভর করে তার জীবিকা আর সামাজিক সত্তা। ফলে স্বভাবতই চাহিদা আর সরবরাহের supply and demand এর কথা এসে পড়ে। আমি অন্য এক প্রবন্ধেও বলেছি, সাহিত্যের উত্তৰ্ষ, প্রকরণ আর বিষয়বস্তুও তাই চাহিদার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। সমাজে যদি সৎ, আন্তরিক ও উচ্চ চিন্তার কদর থাকে লেখার মান আর গতিও সেভাবেই মোড় নেবে আর সমাজ যদি হালকা কৃত্রিম সিনেমাধর্মী রহস্য-রচনারই অনুরাগী হয়ে ওঠে সাহিত্যেরও প্রধান প্রবণতা তা না হয়ে পারে না।
