আমি ওপরের কথাগুলি নিন্দাচ্ছলে বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের গোটা সমাজই যেখানে পুঁজিবাদী, সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো যেখানে পুরোপুরি পুঁজিবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে ব্যক্তিগতভাবে আমরা চাই না চাই, পুঁজিবাদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। পুঁজিপতিদের নামাঙ্কিত পুরস্কার গ্রহণ করলে পুঁজিপতিদের ‘চরণাশ্রিত’ হয়ে লেখকদের আত্মবিক্রয়ের সম্ভাবনা আছে মনে করে এমন কাজকে ধিক্কারজনক যাঁরা বলছেন তারাও যে কীভাবে পুঁজিপতিদের দ্বারস্থ হচ্ছেন বা হতে বাধ্য হচ্ছেন, তার প্রতিই মাত্র আমি ইঙ্গিত করতে চেয়েছি ওপরে। না হয়, অন্তত জীবিকার ব্যাপারে কারো নিন্দা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কুমির নির্বংশ হওয়ার আগে জলে বাস করে কুমিরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা স্রেফ ইচ্ছা করে উট পাখি সাজা।
সাম্যবাদী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যখন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি-পুরস্কার পেয়েছিলেন, তখন ‘স্টেটসম্যান’ মক্তব্য করেছিল—’জ্যাঁ পল সাত্রের পক্ষে যা সহজ, ভারতের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরম শত্রু হয়েও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পক্ষে তা (অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি-পুরস্কার প্রত্যাখ্যান) সম্ভব হয় নি।’ ওদের রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারেরও অর্থমান পাঁচ হাজার। বলা বাহুল্য, আমাদের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়।
প্রচলিত সাহিত্য-পুরস্কার বিরোধী তাদের বিবৃতিতে এমন দাবিও করেছেন : ‘সাহিত্য-পুরস্কারগুলিকে শিল্পগোষ্ঠী বা ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নামাঙ্কিত না করে বায়ান্ন সালের মহান ভাষা আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের উত্তাল গণসংগ্রামের বীর শহিদদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত নামে ঘোষণা করার প্রস্তাব করুন।’ অতি উত্তম প্রস্তাব, এমন প্রস্তাবে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু টাকা? সেতো আর প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে আলাউদ্দিনের দৈত্য এসে দিয়ে যাবে না কারো হাতে। জনসাধারণ থেকে চাদা তুলে তা দিয়ে শহিদদের নামে সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণার তেমন প্রস্তাব কেন যে তারা দিলেন না বুঝতে পারছি না, দিলে তাই হতো সমুচিত ও যুক্তিসঙ্গত। এঁদের মতে পুরস্কারের টাকাটা আদমজী, দাউদ কিম্বা ব্যাঙ্ক-প্রতিষ্ঠানগুলোই আগের মতো দিতে থাকুক কিন্তু ওদের নাম নেওয়া চলবে না মুখে! টাকাদাতার নাম ভুলে থাকা কি মুছে ফেলা সঙ্গত কিনা সেটা বিবেক আর নৈতিকতার প্রশ্ন। কিন্তু আদৌ বাস্তবে কিনা তাও বিচার করে দেখা প্রয়োজন। ধরা যাক, অর্থ-প্রদানকারী শিল্পপতি কি শিল্পগোষ্ঠীর নাম উহ্য রেখে শহিদ বরকত’ কিংবা ‘শহীদ আসাদুজ্জামান সাহিত্য-পুরস্কার না হয় ঘোষণা করা হলো। এতে কি পুরস্কারের চরিত্র বদলে যাবে? আর ব্যাপারটি তো ওখানেই চুকে খতম হয়ে যাবে না। টাকার উৎস কিছু লোকের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও সকলের কাছ থেকে তা সম্ভব হবে না কিছুতেই। বিশেষত যে সংস্থার মারফত এ পুরস্কারগুলি বিতরিত হবে তা তো শূন্য মার্গে বিচরণশীল হওয়ার কথা নয়। তেমন সংস্থার নিশ্চয়ই খাতাপত্র, হিসাব-নিকাশ আর তা লেখা-জোকার ব্যবস্থা থাকবেই। টাকা দাতা শিল্পপতি বা শিল্পগোষ্ঠীর নাম-ধাম অন্তত সেখানে তো লিখে রাখতেই হবে। তা হলে কি বুঝতে হবে ঐ অনুচাষীদের নাম খাতা-পত্রে লেখা থাক তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু বাইরে জাহির করা চলবে না! বলতে পারা যাবে না ‘আদমজী শহিদ বরকত কিংবা ‘দাউদ শহিদ আসাদুজ্জামান সাহিত্য-পুরস্কার! কারণ এ করা হলে পুঁজিপতিদের নামাঙ্কিত হওয়ার অপরাধ আর পাপ তো পুরোপুরিই থেকে যাবে। মনে হচ্ছে, আমাদের এ বন্ধুদের আদম চৌধুরী আর দাউদ মিয়ার পুকুরের রুই কাতলার প্রতি তেমন অরুচি নেই, কিন্তু পুকুর দুটির মালিকের নাম উচ্চারণেই তাদের যত আপত্তি! একেই বলে ভাবের ঘরে চুরি। শহিদদের নামে সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তনে আমার ষোল আনা সায় আছে, এ ব্যাপারে বিবৃতিকারীরা। উদ্যোগ গ্রহণ করলে আমি যথাসাধ্য সাহায্য করতেও প্রস্তত। তবে যেখানে শর্তহীন ভাবেও কৃতজ্ঞতা স্বীকৃতির উহ্য, লেখ্য, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কোন দায় নেই, তেমন অবস্থায়ও আমি অকৃতজ্ঞ হতে রাজি নই। অকৃতজ্ঞতা আমাদের সেকেলে’ নৈতিক বোধের বিরোধী। কৃতজ্ঞতা মহৎ চরিত্রের একটি লক্ষণ–সে কথা না হয় নাই উল্লেখ করলাম। মরহুম ডক্টর শহীদুল্লাহ সাহেব একবার এক পত্রে আমাকে লিখেছিলেন–যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয় সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়।
॥ ৩ ॥
সাহিত্য-শিল্প যেমন দীর্ঘ মেয়াদি ব্যাপার তেমনি সে সবের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানাদির গড়ে ওঠা একটা জন-স্বীকৃত ঐতিহ্যে রূপ নিতেও বেশ সময় লাগে। তাই এ সব প্রতিষ্ঠানকে গড়ে ও বেড়ে ওঠার সময়-সুযোগ দিতে হয়। কালে কালে সব কিছুরই সূচনার ইতিহাস মানুষ ভুলে যায়, প্রতিষ্ঠান আর তার ঐতিহ্যই থাকে বেঁচে। এবং কালক্রমে রূপ নেয় জাতীয় প্রতিষ্ঠানে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, এশিয়াটিক সোসাইটি, রাজশাহীর বরেন্দ্র সমিতি, বলদা মিউজিয়াম সবই বিত্তশালীদের অর্থে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান। এমন কি বিশ্বকবির বিশ্বভারতীও এর ব্যতিক্রম নয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগীয় ‘চেয়ার’, ‘মেডেল বৃত্তি’ ও ‘লেকচার’ বিত্তবান পুঁজিপতিদেরই দান! দ্বারভাঙা বিল্ডিং এর দ্বারভাঙা নাম বিনা কারণে হয় নি। এ সব বিত্তশালীদের অনেকেই হয়তো অত্যাচারী ও প্রজাপীড়ক ছিল, কিন্তু সে কথা কে আজ স্মরণে রেখেছে? পীড়ন-শোষণ কখনো কায়েমি হয়ে থাকে না, কায়েমি হয়ে থাকে সকর্ম আর তার স্মৃতি। হাজী মুহসিনও এক জমিদার বংশেরই ওয়ারিশ–আর জমিদার কোনো কালেই নিষ্কলঙ্ক ছিল ইতিহাসে তেমন প্রমাণ নেই। গোড়াতে যদি এঁদের নাম চিহ্নিত করার ধুয়া উঠতো তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠানই গড়ে ওঠারই সুযোগ পেত না। পূর্ব পাকিস্তানে দানশীল বিত্তবানের সংখ্যা অতি নগণ্য,তাই অনেক ব্যাপারে সরকারের ওপর নির্ভর না করে পারা যায় না। ভাষা-আন্দোলনের অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা। কিন্তু তার যাবতীয় ব্যয়ভার সরকারকেই করতে হয় বহন। অথচ সরকার ছিল একদিন ভাষা-আন্দোলনের পরম শত্রু। বাংলা উন্নয়ন বোর্ডও সরকারি অর্থেই পরিচালিত। আমাদের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’ শুধু যে সরকারি সাহায্য পেয়ে থাকে তা নয়, অনেক শিল্পীপতি আর ব্যাঙ্কের কাছ থেকেও অর্থ-সাহায্য পায় ও নিয়ে থাকে। এ তথ্যও বোধ করি অনেকেরই জানা। এ সব সাহায্য ছাড়া ‘বুলবুল একাডেমী’ টিকে থাকতে পারতো কিনা সন্দেহ। বিত্তবান আর শিল্প প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাহায্য ছাড়া আজো আমাদের কোনো বড় রকমের সাহিত্য কি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা যায় না–’সোভেনিয়র’ বা ‘স্মারক পুস্তিকা’র তাৎপর্য ও ভূমিকা যারা কখনো এ ধরনের অনুষ্ঠান করেছেন তাদের কাছে অজানা নয়। ওপরে যে এক সাহিত্য সম্মেলনের উল্লেখ করেছি তাও এ পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার্য। যারা পুঁজিপতি ‘নামাঙ্কিত’ সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণে অসম্মত তারাও কী করে যে পুঁজিপতিদের কৃপাপ্রার্থী তা দেখাতেই শুধু তথ্যটার উল্লেখ করা হয়েছে এ লেখায়। পাকিস্তান লেখক সংঘও সরকারি উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত, গোড়ার দিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ যে তার ওপর ছিল না তা নয়। কিন্তু লেখকরা আজব চরিত্রের মানুষ। যারা খাঁটি ও আন্তরিক শিল্পী তাদের অন্তরে সব সময় একটা ‘বিদ্রোহী সত্তা’ প্রচ্ছন্ন থাকে। তাই দীর্ঘদিন এদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কারো পক্ষে সম্ভব হয় না। লেখক সংঘের ব্যাপারেও এ দেখা গেছে। লেখক সংঘের পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যরা বহুবার সরকারি কোনো নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর বিবৃতি যে দিয়েছে তা ওয়াকিফহালদের ভাল করেই জানা। আমাদের ভাষা আর সাহিত্যের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও, বহু প্রবীণ ও তরুণ কবি-সাহিত্যিকরা যখন চুপ মেরে থেকেছেন অথবা ঝোঁপ বুঝে কোপ মেরেছেন, তখনও লেখক সংঘের সদস্যরা সোচ্চার হতে দ্বিধা করেন নি এতটুকু। সরকারের রবীন্দ্র-বিরোধিতা একটি সুপরিচিত ব্যাপার। লেখক সংঘের সদস্যরা সাহস আর ধৈর্যের সাথে তারও মোকাবিলা করতে কসুর করেন নি। ঐ বিরুদ্ধতার সবচেয়ে মূল্যবান জবাব দিয়েছেন লেখক সংঘের অন্যতম সদস্য, ‘দাউদ’ পুরস্কারপ্রাপ্ত ড. আনিসুজ্জামান, রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটি সুপরিকল্পিত বই সম্পাদনা করে।
