সমাজ সাহিত্য গড়ে না সাহিত্য সমাজ গড়ে–কার আগে কে? মুরগি আগে না ডিম আগে? এ প্রশ্নের মতো এও এক অবান্তর প্রশ্ন। কারণ, আমরা জানি মুরগি আর ডিমের অস্তিত্ব যুগপৎ–তেমনি সমাজ আর সাহিত্যের বেলায়ও তা সত্য। সামাজিক উন্নতি সার্বিক না হলে তা কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না আর সার্বিক উন্নতির আওতায় সাহিত্য-শিল্পেরও রয়েছে এক প্রধান স্থান। সাহিত্য আর সমাজের অগ্রগতিও তাই যুগপৎ হতেই হবে। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটা অচল। এই দুই একে অন্যের পরিপূরক। তাই উন্নত দেশে অনুন্নত সাহিত্য বা অনুন্নত দেশে উন্নত সাহিত্য আশা করা যায় না। জৈবিক আর মানবিক এই দুই সত্তা নিয়েই ব্যক্তি–এ দুই সত্তা নিয়েই সমাজ, এ দুয়ের উন্নতির নামই সার্বিক উন্নতি। আমাদের সামাজিক উন্নতির গতি সার্বিক নয় বলেই জীবনে ও সমাজে আমরা পদে পদে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমাদের দালান-কোঠা, বিশ্ববিদ্যালয় আর কারখানার চিমনি ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে বটে কিন্তু চিন্তার ক্ষেত্রে সমতালে তেমন কোন ঊর্ধ্বগতি কোথাও লক্ষিত হচ্ছে না। সমাজে উচ্চ চিন্তার চাহিদা থাকলে অবস্থা এমন হওয়ার কথা নয়।
সৎ ও আন্তরিক চিন্তা, যে চিন্তায় লেখকের আস্থা আর প্রত্যয় রয়েছে তার মূল্য সাহিত্য-শিল্পে অপরিমেয়। সাহিত্য-শিল্পের মূল্য আর আবেদনও এ কারণে। আমাদের সাম্প্রতিক রচনায় তা অনেকখানি দুষ্প্রাপ্য হয়ে এসেছে। চিন্তার সততাই লেখককে দিয়ে থাকে সত্য-কথনের দুর্বার সাহস। মহৎ সাহিত্যের প্রাণ এ সত্য–এ সত্যের ফলেই সমাজ হয় কলুষমুক্ত। লেখায় সত্যের প্রতিফলন না ঘটলে সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হতে বাধ্য। আমার আশঙ্কা, আমরা যেন কতকটা স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ছি। বিজ্ঞানের অভিনব আর নিত্য-নতুন আবিষ্কার সাহিত্যের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন দিগন্ত। তাই বিজ্ঞানকে অস্বীকার করারও উপায় নেই আজ সাহিত্যের। বিজ্ঞান আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ। তাই বিজ্ঞান-বিমুখ সাহিত্যের জীবন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে পদে পদে। জীবন নিয়ে আর জীবনের জন্যই সাহিত্য–তাই সাহিত্য জীবন ভিত্তিক হওয়া চাই।
জীবনের বিধিবিধান আর তার সূত্র আবিষ্কারের দায়িত্ব বিজ্ঞানের–এ সবকে অস্বীকার করে চলা কোনো সাহিত্যিকের পক্ষেই সম্ভব নয় এবং উচিতও নয়। কারণ এ তাকে বাঁচার পথ ও পাথেয়র সন্ধান দেয়। সন্ধান দেয় বাস্তবধর্মিতার। আধুনিক সাহিত্যের এক বড় মাপকাঠি রচনার বাস্তবধর্মিতার। বিজ্ঞান যেমন বাঁচার পথ বাতলায় তেমনি সাহিত্য জোগায় বাঁচার আনন্দ। সাহিত্যিক বা পাঠক কারো পক্ষেই এ দুয়ের একটাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই।
সাহিত্য বা শিল্প জীবনের তথা অস্তিত্বের যা আনন্দ তাকেই জাগিয়ে তোলে, বহন। করে বাঁচার সুখ, জীবনকে করে তোলে আকর্ষণীয়। স্নেহে-ভালোবাসায়, প্রেম-প্রীতিতে যে একটা অনির্বচনীয় আবেগী মূল্য রয়েছে, সাহিত্য আমাদের সে সম্পর্কে সচেতন করে তোলে–মনুষ্যত্বের একটা অদৃশ্য অন্তর্জগৎ আমাদের অহরহ ঘিরে রয়েছে–যা না থাকলে মানুষ হিসেবে আমাদের জীবন ব্যর্থ হতো। মানুষের অন্তর্জগতের উদ্ঘাটন সাহিত্যের প্রতিদিনের দায়িত্ব। ক্রমবর্ধমান যান্ত্রিকতার চাপে মানুষের অন্তর্জগৎ আজ অনেকখানি চাপা পড়ে যাচ্ছে অর্থাৎ হৃদয়ের ব্যাপারে আমরা হয়ে যাচ্ছি যান্ত্রিক। তাই সাহিত্য আর সাহিত্যিকের দায়িত্বও গেছে বেড়ে–আজ লেখক ও শিল্পীকে অধিকতর হৃদয়ধর্মী আর বিবেকী হতে হবে।
মানবতার এক নীরব কণ্ঠস্বর আছে–সাহিত্য আমাদের তা শোনায়। এ কণ্ঠস্বর আদিমকাল থেকে বর্তমানের পথ বেয়ে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে চলেছে। এর গতি প্রবাহ অব্যাহত রাখার দায়িত্ব শিল্পীর–সাহিত্যিকের। এ প্রসঙ্গে বোরিস পাস্তেরনাকের এ কয়টি লাইন স্মরণীয় :
‘Artist, be ever watchful
Lest sleep should close your eyes,
You are eternity’s hostage
In bound to time that flies.’
[‘সাহিত্য ও সাহিত্যিক’ প্রথম প্রকাশিত হয় দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় (ডিসেম্বর ১৯৬৬)। পরে এটি সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়।]
সাহিত্যে আধুনিকতা
এক
সাহিত্যে আধুনিকতা কথাটা হালের উৎপত্তি। হাল মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগ। এর আগে সাহিত্যের আলোচনা ও মূল্যবিচার স্রেফ সাহিত্য হিসেবেই হতো। সাহিত্যের ব্যাপক ও সার্বিক রূপ ছিল তখন একমাত্র মূল্যায়নের বিষয়। রচনার মান নির্ণয় হতো সর্বকালীন ঐতিহ্যের মাপকাঠি দিয়ে। তখন কারুকার্যের চেয়েও বাণীর সৌন্দর্য ও সংবেদনশীলতার মূল্য দেওয়া হতো বেশি–সাময়িকতার চেয়েও চিরন্তনতার।
সাহিত্য তখন কাল-চিহ্নিত ছিল না। ইংরেজি সাহিত্যের কাল বা যুগ বিভাগ অনেকখানি মনগড়া ও বেপরোয়া। কারণ ওটা ওদের মত দেব-দেবী রাজা-রাণীর রাজতুকাল অনুসরণ করেই চিহ্নিত। বলা যায়, ওটা ইংরেজের ক্রাউন প্রীতির অন্যতম স্বাক্ষর। না হয় রাজা রাণীর তিরোধান বা সিংহাসন আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য রাতারাতি খোলস বদলায় না, নেয় না নতুন মোড় বা নবজন্ম। ষষ্ঠ জর্জের আকস্মিক মৃত্যুর পর কন্যা এলিজাবেথ সিংহাসনে বসলেন বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাতে ইংরেজি সাহিত্যে কোনো নবদিগন্তের দুয়ার খুলে গেল না বা বন্ধ হলো না পুরোনো স্রোত। প্রথম এলিজাবেথ ও ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকাল ছিল সুদীর্ঘ–এ সুদীর্ঘকালে বহির্জগতে এমন সব ঘটনা ঘটেছে যার ফলে ইংরেজের মনমানস হয়েছে নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ। পণ্য উৎপাদন, বণ্টন, বাজার ও সাম্রাজ্যের অভাবনীয় বিস্তার ইংরেজের জীবনে একদিকে নিয়ে এসেছিল সমৃদ্ধির নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা, অন্যদিকে জীবন সম্বন্ধে নব নব চেতনা ও মূল্যবোধ, তার চর্চা ও প্রকাশের অফুরন্ত সুযোগ-সুবিধা, যা প্রতিফলিত হয়েছে সে যুগের সাহিত্য ও শিল্পে এবং জীবনের বিকাশ ও মননশীলতার আরো বহুতর ক্ষেত্রে। এ সঙ্গে মনে রাখতে হবে ইংল্যান্ডের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য যার সাক্ষাৎ অনুষঙ্গ লেখা ও লেখকের স্বাধীনতা।
