বই দাখিল করে পুরস্কার পান নি এমন কেউ কেউ কিছুদিন আগে সংবাদপত্রে এ মর্মে বিবৃতি দিয়েছেন যে, ‘সাহিত্য-পুরস্কার গ্রহণ আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের পক্ষে কোনো সম্মান ও শ্লাঘার বিষয় নয়।’ কেন সম্মান ও শ্লাঘার বিষয় নয় তা তারা দয়া করে ব্যাখ্যা করেন নি। তারা নিজেরাও স্বীকার করেছেন এসব পুরস্কারের সঙ্গে কোনো শর্ত নেই। কোনো মতবাদ প্রচার বা সমর্থনের দায় নেই লেখকদের বিন্দুমাত্রও। যারা এসব পুরস্কারের অর্থ জোগাচ্ছেন তাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধ বইয়েরও এসব পুরস্কার পেতে কোন বাধা নেই, বাধা হয় নি এ যাবৎ। লেখার ব্যাপারে লেখকরা সম্পূর্ণ স্বাধীন। মতাদর্শ নির্বিশেষে যে কোনো সুলিখিত বই এসব পুরস্কার পেয়ে থাকে। এ যাবৎ পেয়েও এসেছে। আমাদের মধ্যে যারা পুঁজিবাদবিরোধী, যেমন–শওকত ওসমান, শহীদুল্লাহ কায়সার, শামসুর রাহমান, সরদার জয়েন উদ্দীন প্রমুখ, তাঁরা যেমন এসব পুরস্কার পেয়েছেন, তেমনি যারা ইসলামি ভাবধারা অনুসারী, যেমন, বরকতউল্লাহ, আকবর উদ্দীন, ফররুখ আহমদ প্রমুখ, তাঁরাও পেয়েছেন। এসব পুরস্কার পাওয়ার আগে বা পরে এঁদের কেউই পুঁজিবাদ বা পুঁজিপতিদের কোন রকম প্রচারণায় লিপ্ত হয়েছেন, তেমন কথা আমি অন্তত শুনি নি।
বলা বাহুল্য, ছোট বড় কোনো সাহিত্য-পুরস্কারই সহজলভ্য মোয়া নয়। এক একটা বই লিখতে কত বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়, খরচ করতে হয় কতখানি মেদ মগজ তা খাঁটি লেখক মাত্রেরই জানা। তেমন করে লেখার জন্য যে পুরস্কার, আমার মতে তা লেখকের ‘অর্জিত ধন’–তা পড়ে পাওয়া কিম্বা অনুগ্রহের দান নয়। তা চাইতে হয় না অনুগ্রহ প্রার্থীর মতো বা লিখতে হয় না ঐসব পুরস্কারের জন্য বই নেহাত বশংবদের মতো। শওকত ওসমানের কাঁকরমণি, তস্কর ও লস্কর, এতিমখানা ইত্যাদি তো দারুণ পুঁজিবাদবিরোধী বই। তার পুরস্কার প্রাপ্ত ক্রীতদাসের হাসিকে তো আইউব শাসনামলের রূপক হিসেবেও নেওয়া যায়। অর্থাৎ নির্যাতনের সাহায্যে কারো মুখে হাসি ফোঁটানো যায় না এ কথাই তো তিনি বলতে চেয়েছেন রূপকের মারফত। ইচ্ছা করলে পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রায় সব বইয়েরই মূল বক্তব্যের সাহায্যে এর কোনোটাই যে পুঁজিবাদের সমর্থনে রচিত নয় তা প্রমাণ করা যায়। বরং অনেক বইতে পুঁজিবাদবিরোধিতা পেয়েছে প্রকাশ। প্রাগুক্ত বিবৃতিতে এমন কথাও লেখা “আমাদের কবি সাহিত্যিকগণ দরিদ্র হতে পারেন, কিন্তু ‘আদমজী’, ‘দাউদ’ পুরস্কারের অর্থে তারা জীবন ধারণ করবেন বা এই সমস্ত নামকে কবিদের নামের সঙ্গে যুক্ত করে গর্ববোধ করবেন, আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রের এরূপ করুণ ও ধিক্কারজনক অবস্থার যত শীঘ্র পরিসমাপ্তি ঘটে, ততই মঙ্গল।” নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মহৎ ও উচ্চাঙ্গের আবেগ। তবে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করা যায়, ‘আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রের এরূপ করুণ ও ধিক্কারজনক অবস্থা’ দেখে শুনে, মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেও এঁদের কেউ কেউ কেন সে ‘ধিকৃত’ অবস্থার শরিক হতে ঐ পুরস্কারের আশায় নিজেরা বই সাবমিট করেছিলেন? আমাদের পুরস্কার প্রাপ্ত কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে কেউ আদমজী, দাউদ পুরস্কারের অর্থে জীবন ধারণ করেন বা করছেন এ অপূর্ব তথ্য আমার জানা ছিল না, শুনি নি কোনোদিন–আর এ সম্ভব বলেও আমার বিশ্বাস নয়। এ যুগে পাঁচ হাজার টাকায় জীবন ধারণ করা সম্ভব–এ এক বা দুই বাতুল ছাড়া কেউ বোধ করি বিশ্বাস করবে না। প্রবীণ শওকত ওসমান থেকে তরুণ শামসুর রাহমান, হাসান আজিজুল হক পর্যন্ত সবাই কোনো না কোনো চাকরি করেই জীবিকা অর্জন করে থাকেন–এ তথ্য এ বিবৃতিকারদের জানা না থাকার কথা নয়। এ বিষয়ে প্রবীণ-নবীন সবাই সমান, অর্থাৎ সকলকেই লেখার বাইরে অন্য কিছু একটা করে নিজের ও পরিবারের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করতে হয়। নোবেল প্রাইজের পরিমাণ লক্ষাধিক টাকা। সে টাকা নিয়েও রবীন্দ্রনাথ জীবন ধারণ করতেন বা করেছেন তেমন কথা শোনা যায় নি। পাঁচ হাজার টাকায় কোনো চাওয়া পূরণ হতে পারে, জীবন ধারণে স্বপ্নাতীত।
সমাজের অন্য সব স্তরের মতো পুঁজিপতিদের মধ্যেও শ্রেণীভেদ আছে–বড় ছোট, মাঝারি, ক্ষুদ্র-বৃহৎ ইত্যাদি। সাধারণভাবে রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘ছোট টাকা’ আর ‘বড় টাকা’ বলে বিঘোষিত করেছেন। পুঁজির পরিমাণ আর শিল্প ও ব্যবসার আকার আয়তন অনুসারে কেউ হয়তো কয়েক হাজার, কেউ বা কয়েক শ লোক খাটান। কিন্তু উভয়ের চরিত্র একই–পুঁজিবাদের যা চরিত্র তা ছোট আর বড়তে তেমন তারতম্য সৃষ্টি করে না। তারতম্য সৃষ্টি করে স্রেফ মুনাফার বেলায়। পবিত্র কোরান-হাদিসের ব্যবসা যারা করেন তারাও মুনাফাটা কর্মচারী আর শ্রমিকদের মধ্যে বেঁটে দেন না। আমাদের দেশে এখনো লর্ড বিভারব্রুক (Beaverbrook) জন্মান নি সত্য কিন্তু ইতিমধ্যে তার ক্ষুদ্র সংস্করণ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বেশ কয়টা গড়ে উঠেছে, অর্থাৎ ব্যক্তিগত মালিকানায় যারা তিন-চারটা পত্রিকার মালিক হয়ে কয়েক শ লোককে খাটান, বহু প্রগতিশীল কবি সাহিত্যিক ঐসব প্রতিষ্ঠানে খেটে জীবিকা অর্জন করে থাকেন। কিন্তু বই লেখার খাটুনি, বিশেষ করে সৃষ্টিধর্মী লেখার শ্রম কি প্রুফ দেখা কি সাংবাদিকী লেখার চেয়ে কম? বলা বাহুল্য, খেটে জীবিকা অর্জন যেমন, তেমনি খেটে বই লিখে সাহিত্য-পুরস্কার গ্রহণও কিছুমাত্র অসম্মানের নয়। মাস মাইনের যে কোনো চাকরির চেয়ে মোটামুটি উচ্চমানের একটা বই লেখার খাটুনি অনেক অনেক বেশি। এ সত্য প্রতিটি লেখকেরই জানা।
