কালের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র, সমাজ আর সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো ইত্যাদি সব কিছুই দ্রুত বদলে যাচ্ছে, বদলে গেছে। বহু দেশ থেকে রাজা-বাদশাহ, নবাব-আমির, জমিদার-ভূস্বামী এখন নিশ্চিহ্ন। পাকিস্তানও তার ব্যতিক্রম নয়। এখন রাজ-রাজড়া কিংবা ধনী ও বিত্তশালীদের স্থান দিয়েছে শিল্প আর পুঁজিপতিরাই, ইতিহাসের এ এক স্বাভাবিক ধারা। এ ধারা অনুসরণ না করলে সাহিত্য-পুরস্কার সম্বন্ধেও বিভ্রান্তি ঘটার সম্ভাবনা। সম্প্রতি আমাদের কোনো কোনো সহকর্মী তেমন বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন বলেই এ লেখার সূত্রপাত। আমাদের সমাজ যে পুরোপুরি পুঁজিবাদী তাতে বোধ করি দ্বিমত নেই। পুঁজিবাদের একটা স্বাভাবিক অনুষঙ্গ, পুঁজি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় পুঁজিপতিরাও কিছু কিছু সৎ কর্ম ও জনহিতকর কাজ করতে বাধ্য হন। অনেক সময় অবস্থা এ করতে তাদের বাধ্য করে। যেমন, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা, বিভিন্ন বিষয়ে চাদা আর বৃত্তি দেওয়া ইত্যাদি। সাহিত্য-পুরস্কারও এ কর্মসূচির অন্তর্গত। পৃথিবীর তাবৎ পুঁজিবাদী দেশে এর বিস্তর নজির–যার থেকে আমাদের দেশের অনেক গবেষক শিক্ষার্থী, জ্ঞানী-গুণীও উপকৃত হয়েছেন। তার ফলে কেউই ফোর্ড কোম্পানি বা ফোর্ড পরিবারের ‘চরণাশ্রিত হয়েছেন কিংবা ‘আত্মবিক্রয় করেছেন তেমন কথা শোনা যায় নি। দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা সাহিত্য-পুরস্কার বোধ করি ‘নোবেল প্রাইজ’। এ কি কোন নিঃস্ব বা পুঁজিহীনের দান? আলফ্রেড নোবেলের পরিচয় প্রসঙ্গে, হাতের কাছে যে বিশ্বকোষটা আছে তাতে লেখা হয়েছে–The inventor of dynamite was a Swedish engineer and chemist who amassed a large fortune from the manufacture of explosives (Pears Encyclopaedia) অর্থাৎ সর্বধ্বংসী ডিনামাইট থেকে নানা বিস্ফোরণ তৈরি করে পৃথিবীর বড় বড় যুদ্ধবাজ দেশগুলোর কাছে তা চড়া দামে বিক্রি করে নোবেল প্রভূত ধনের মালিক হয়েছিলেন। সে সঞ্চিত অর্থের একটা মাত্র অংশ থেকেই সব কটা নোবেল প্রাইজের জন্ম। ডিনামাইটের ভূমিকা কারো অজানা নয়। তার থেকে প্রস্তত বিস্ফোরক দু দুটো প্রলয়ঙ্করী মহাযুদ্ধে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা বোধ করি বলার প্রয়োজন নেই। ডিনামাইট থেকে তৈরি নানা বিস্ফোরণ এখনো কি ভিয়েৎনাম আর মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে না? আর তার ধ্বংসের চিত্র প্রতিনিয়তই তো প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদপত্রে। তবুও চিরযুদ্ধ-বিরোধী রোমা রোলা, রাসেল, টমাস মান, রবীন্দ্রনাথ এমন কি শান্তির শহিদ মার্টিন কিং পর্যন্ত ঐ প্রাইজ গ্রহণকে অপমানজনক মনে করেন নি। কিংবা ঐ প্রাইজ থেকে নোবেলের নামের চিহ্ন মুছে ফেলার অদ্ভুত দাবিও জানান নি। পুঁজিবাদের পরম শত্রু আর শ্রেণীহীন সমাজতন্ত্র যে দেশে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত, সে দেশের সাহিত্যিক আর বৈজ্ঞানিকরাও নোবেল প্রাইজ নিতে অস্বীকার করেন নি। বরিস পাস্তেরনাকও নিতে রাজি ছিলেন, এমন কি নোবেল প্রাইজ কমিটিকে তিনি ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন। পরে যে নিতে পরেন নি সে তো তার দেশের সরকারের আপত্তির জন্যই। আর সবাই জানেন, সে আপত্তি ছিল রাজনৈতিক। আলফ্রেড নোবেলের ‘নাম-চিহ্নিত’ বলে মোটেও নয়। যারা ঐ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন তারাও করেছেন ভিন্নতর কারণে–নোবেলের ‘নাম-চিহ্ন’ অজুহাতে নয়। সাহিত্য আর পুরস্কার সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। যারা বিভিন্ন সাহিত্যে পুরস্কার পেয়েছেন, দুনিয়ার কোনো রকম সাহিত্য-পুরস্কার না থাকলেও তারা সাহিত্য করতেন–পুরস্কার পাওয়ার পরেও সাহিত্য করেছেন ও করে চলেছেন নিজেদের বিবেক আর সত্যকে বজায় রেখে। পুরস্কার পাওয়ার পর কারো মতাদর্শের রাতারাতি রদবদল ঘটেছে তেমন ঘটনা আমার জানা নেই। গোড়াতেই বলেছি, সাহিত্য মানে সত্য ও বিবেকের চর্চা–কোন সাহিত্য-পুরস্কারই খাঁটি সাহিত্যিককে সাহিত্যের চিরকালীন ভূমিকা থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। অতীতে যারা রাজা-বাদশাহ কিংবা জমিদার ভূস্বামীদের আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতায় থেকে সাহিত্য করেছেন তাদের বেলায় যেমন এ কথা সত্য, এ যুগের সাহিত্যিকদের বেলায়ও এ বিন্দুমাত্র মিথ্যে নয়। সীমিত অর্থে আমাদের দেশের খাঁটি কবি আর সাহিত্যিকরাও এ পূর্বসূরীদেরই উত্তর-সাধক।
যত ভয় মেকিদের আর মেকিদের নিয়েই। তাঁরাই রজ্জুকে সর্প মনে করে আঁতকে ওঠেন!
॥ ২ ॥
অতীতকালে যা ছিল আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বা মাশোয়ারা, বলা বাহুল্য, এখন তা নাম নিয়েছে সাহিত্য-পুরস্কার, সাহিত্য-ভাতা, সাহিত্য-বৃত্তি ইত্যাদি। সে যুগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যদাতার প্রশস্তি গাইতে হতো, (এমন কি দিওয়ানে গালিবেও তার নিদর্শনের অভাব নেই) এখন একটা সালাম ঠোকারও প্রয়োজন হয় না, পুরস্কারের অর্থ-দাতাদের মন যুগিয়ে চলা বা কথা বলা তো দূরের কথা। ক্রমবর্ধমান গণতান্ত্রিক চেতনা আর সমাজ বিবর্তনেরই যে এ অনিবার্য পরিণতি তাতে বোধ করি সন্দেহ নেই। আমাদের দেশে যে কটা পুঁজিপতি নামাঙ্কিত সাহিত্য-পুরস্কার চালু হয়েছে, প্রশংসার কথা, তাতেও কোন শর্ত আরোপিত হয় নি। এসব পুরস্কার গ্রহণে যাদের আপত্তি তারা কী রকম সমাজ বা সমাজ ব্যবস্থা চান জানি না, পুঁজিবাদহীন সমাজতন্ত্র যে তারা চান তার অস্পষ্ট চেহারাও তাদের রচনায় দুর্নিরীক্ষ। তবে তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতি আর পত্র-পত্রিকায় চিঠিপত্র থেকে জানা যায় যে, তারা পুঁজিপতিদের ওপর খাপ্পা! বিস্ময়ের বিষয় এটুকু যে, খাপ্পা হলেও প্রয়োজনের সময় পুঁজিপতিদের কাছ থেকে এটা-ওটার অজুহাতে টাকা নিতে বা তাদের অধীনে নৌকরি করতে এঁদের বিবেকে মোটেও বাধে না। কিছুদিন আগে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে চট্টগ্রামে যে সাহিত্য-সভা হয়েছিল, শুনেছি তার জন্য টাকা তোলা হয়েছে পুঁজিপতি আর ব্যাঙ্ক ইত্যাদি পুঁজিপতি চালিত সংস্থা থেকেই। যিনি সর্বপ্রথম পুঁজিপতি নামাঙ্কিত সাহিত্য-পুরস্কারের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছেন, শুনলাম তারই স্বাক্ষরিত আবেদনপত্র নিয়েই তাঁর প্রতিনিধিরা পুঁজিপতি আর ব্যাঙ্ক ম্যানেজারদের কাছে অর্থের জন্য হাত পেতেছিলেন। বিজ্ঞাপনের জন্য পুঁজিপতিদের কাছে ধর্না দিতে হয়, বিজ্ঞাপনে পুঁজিপতিদের কলকারখানা বা ব্যাঙ্কের গুণপনা (সত্য-মিথ্যা যাই হোক) প্রচার করতে হয়। কিন্তু সাহিত্য-পুরস্কারের বেলায় তেমন কোনো বালাই নেই। এমন কি পুরস্কারের অর্থদাতা কিংবা তার ম্যানেজারের মুখ দেখারও হয় না প্রয়োজন। কোনো রকম প্রচারণা তো দূরের কথা। বরং এ যাবৎ যে সব বই পুঁজিপতি নাম-চিহ্নিত পুরস্কার পেয়েছে তার কোনো কোনোটায় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে অনেক কথাই বলা হয়েছে, আঁকা হয়েছে বিরুদ্ধ চিত্রও। বলা বাহুল্য, ব্যাঙ্ক কিংবা পুঁজিপতিদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন নেওয়া অথবা চাদা কি সাহায্য গ্রহণের আমি বিরোধী নই। আমি শুধু যারা বিজ্ঞাপনের সাহায্যে পুঁজিপতিদের প্রচারণা করে টাকা নেওয়াকে হালাল আর এঁদের দেয়া সাহিত্য-পুরস্কার গ্রহণ করাকে হারাম মনে করেন তাদের স্ববিরোধিতার প্রতিই পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, পুরস্কারের জন্য বই দাখিল করা মোটেও বাধ্যতামূলক নয়। বই দাখিল করা না করা সম্পূর্ণভাবে লেখকের ইচ্ছাধীন। যারা এসব পুরস্কার নেওয়াকে অপমানজনক মনে করেন তাঁরা বই দাখিল না করলেই তো পারেন। তা না করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের রয়েছে। যদিও বা কারো অজ্ঞাতে তার বই গায়ে পড়ে কোন হিতৈষী সাবমিট করে বসেন, সে খবর দীর্ঘকাল লেখকের অজানা থাকার কথা নয়। কারণ সাবমিট করা সব বইয়ের তালিকা ‘বই’ পত্রিকায় নিয়মিতই প্রকাশিত হয়ে থাকে। তার ওপর প্রকাশকের সঙ্গে লেখকের যোগাযোগ থাকে হরহামেশাই। আর পুরস্কার ঘোষিত হয় বই সামিটের অন্তত ছ মাস পরে। কাজেই প্রাইজের জন্য সাবৃমিট করা বইয়ের তালিকা থেকে নিজের বই তুলে নেওয়া তথা উইথড্র করার যথেষ্ট সময় লেখক পেয়ে থাকেন। সে সময়ের সদ্ব্যবহার যদি তিনি নাও করে থাকেন অন্তত পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের সময় লেখক সে কথাটা স্বচ্ছন্দে উল্লেখ করতে পারেন এবং সেটা করাই অধিকতর শোভন ও যুক্তিসঙ্গত।
