[‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন গ্রন্থে। তখন এর নাম ছিল ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা।]
সাহিত্য ও সাহিত্য-পুরস্কার
॥ ১ ॥
সত্য ও বিবেকের সাধনা আর অকুতোভয়ে তার উপলব্ধিকে ভাষাদান–মোটামুটি সাহিত্যের এ স্বভাব ও ধর্ম। সৌন্দর্য এসব থেকে বহির্ভূত নয়। এ পথ অত্যন্ত দুরূহ আর এর হা এমন বিরাট যে এ ব্যক্তির সর্ব-সত্তাকে গ্রাস করে নেয়। কিন্তু ভাগ্যের অমোঘ বিধান, এ পথের পথিক আর সাধকরাও স্কুল তথা ব্যবহারিক জীবনের শর্তাধীন। অমরতার সাধনায় আত্মনিমগ্ন থাকলেও এর জীবনের সব দাবির শেকলে তারাও আষ্টেপিষ্টে বাঁধা। চরম সত্যটি অতি প্রাচীনকাল থেকেই, পথের পথিকদের যেমন জানা ছিল তেমনি জানা ছিল দেশ, সমাজ আর রাষ্ট্র আর শাসকদেরও। শেষোক্তদের দেশ-কাল ভেদে নানা পরিচয়; যেমন, নবাব-আমির,রাজা-বাদশাহ, আমির-সালতান, জমিদার-ভূস্বামী ইত্যাদি। এরা ব্যক্তিগত আর বংশগত স্বার্থে কিংবা নিজেদের খেয়াল-খুশিতে নানা আমোদে-প্রমোদে বিচিত্র বিলাস-ব্যসনে প্রজার রক্তজল করা অজস্র অর্থ যে ব্যয় করতো না তা নয়। কিন্তু প্রশংসার কথা, এরাও সত্য ও বিবেকের চর্চার তথা সাহিত্য ও শিল্পের মূল্য দিতো। বিজ্ঞাপন যুগের বহু আগে, দূর অতীতেও এদের অনেকে এসবের কদর করেছে, দিয়েছে যথাযোগ্য মর্যাদা। অধিকন্তু এসবের অবিনশ্বর মূল্যবোধে তারা ন্যস্ত করেছে অসীম বিশ্বাস ও আস্থা। তাই এসব সাধকদের অর্থাৎ কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, গায়ক ও গুণীদের আশ্রয় দিতে, পৃষ্ঠপোষকতা করতে এদের অনেকে সাগ্রহে এসেছে এগিয়ে। সব দেশে, সব যুগে এ দেখা গেছে। ফলে প্রাত্যহিক জীবনেও আবিশ্যক দাবি-দাওয়ার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে এসব গুণী আর সাধক সর্ব-সত্তা দিয়ে নিজ নিজ প্রতিভার দায়-শোধ আর দায়িত্ব পালনে আত্মনিয়োগ করতে পেরেছেন। এবং অনেকটা ঐ কারণেই তেমন আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা তারা যে শুধু মেনে নিয়েছেন তা নয়, অনেক সময় যেচেও নিয়েছেন। আর তা যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে দেদার নজির সাহিত্য-শিল্পের ইতিহাসে ছড়িয়ে আছে। বিক্রমাদিত্যের ‘নবরত্ন’ আর আকবরের নওরতন সভার কথা সর্বজনবিদিত। আমার বিশ্বাস, তেমন পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে ‘মেঘদূত’ আর ‘শকুন্তলার’ মতো অমর কাব্য আদৌ রচিত হতো কি না সন্দেহ। সে কথা ‘শাহনামা’ সম্বন্ধেও বলা যায়। আমার বিশ্বাস, বহুনিন্দিত সোলতান মাহমুদের নির্দেশ আর পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ‘শাহনামা’র মতো অত বড় মহাকাব্য আদৌ রচিত হতো এ কথা জোর করে বলা যায় না। পরে সোলতানের সঙ্গে কবির যে বিরোধ তথা ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রা প্রত্যাখ্যানের যে কাহিনী তার কারণ তো সোলতানের সত্যভঙ্গ। এ সত্যভঙ্গ কথাটি সাহিত্য শিল্পের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর মূল্যবান। সত্য আর বিবেকের সাধক যারা তারা সবকিছু সহ্য করতে রাজি কিন্তু সত্যভঙ্গ বরদাস্ত করতে রাজি নন কিছুতেই। এমন কি বিরাট অঙ্কের অর্থ আর পৃষ্ঠপোষকতার বিনিময়েও না।
য়ুরোপের বিবেক নামে অভিহিত মহাকবি গ্যেটে ভাইমার সামন্তরাজের অনুগ্রহভাজন ছিলেন। জীবনের শেষ কাল পর্যন্ত মন্ত্রীত্ব করেছেন ঐ সামন্তের অধীনে। কিন্তু বিবেক বিক্রয় করেন নি বরং আজো বিশ্বের বুদ্ধজীবীদের সামনে বিবেকের এক অনির্বাণ দীপশিখা হয়েই বিরাজ করছেন তিনি। নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্রও ছিলেন এক সামন্তরাজ, তার সভাকবি ভারতচন্দ্রের কাব্যসাধনায় তা কোনো বাধার সৃষ্টি করেছিল বলে জানা যায়। নি। আলাওলের সুবিখ্যাত ‘পদ্মাবতী’ও রচিত হয়েছে আরাকান-রাজের অমাত্যের আশ্রয়ে ও পৃষ্ঠপোষকতায়। বলা বাহুল্য, আরাকান রাজসভার সব কবিই ছিলেন ‘আশ্রিত’ ও ‘পোষিত’। বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ড. দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ যে ত্রিপুরার মহারাজার অর্থানুকূল্যেই প্রকাশিত হয়েছিল সে কথা তো দীনেশ চন্দ্র নিজে বলে গেছেন। ঐ গ্রন্থের জন্যই লর্ড কার্জনের মতো ভারত বিরোধী জাদরেল বড়লাটও দীনেশচন্দ্র সেনের কথা সকৃতজ্ঞ চিত্তে উল্লেখ করেছেন তাঁর উক্ত গ্রন্থের ভূমিকায়। তাঁর রায়বাহাদুর খেতাবও তার সাহিত্য সাধনারই পুরস্কার। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ত্রিপুরার মহারাজার কাছ থেকে নানা উপলক্ষে একাধিকবার অর্থ সাহায্য নিয়েছেন। এমন কি ইংরেজের বশংবদ আর সে যুগের সেরা সামন্ত হায়দ্রাবাদের নিজামের কাছ থেকেও টাকা নিতে দ্বিধা করেন নি এ মহাকবি। বলা বাহুল্য, সে টাকার পরিমাণ বেশ মোটা। রবীন্দ্র-জীবনীর পাঠকদের কাছে এ সব অজানা নয়। লালগোলার মহারাজ ও অন্যান্য বহু ধনাট্যের অর্থেই গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ–যে সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহু মূল্যবান গ্রন্থ শুধু প্রকাশিত হয় নি, সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার সুযোগও দিয়েছে অনেক গবেষককে। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি বহু নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্য কর্মরি কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। এমন কী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আনুকূল্য ছাড়া আমাদের সাহিত্যবিশারদ আবদুল করিমের ‘গোরক্ষ বিজয়’, প্রাচীন পুঁথির বিবরণ’ প্রভৃতি মূল্যবান গ্রন্থও প্রকাশিত হতো কি না সন্দেহ। মাত্র সেদিন মহাকবি গালিবের মৃত্যুবার্ষিকী পাকিস্তানেও পালিত হয়েছে–গালিব শুধু যে শেষ মোগল সম্রাট আর রামপুরের নবাবের কাছ থেকে বৃত্তি পেতেন ও নিতেন তা নয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছেও পৈত্রিক জায়গির আর নিজের জন্য একটা পেনশনের দাবি জানিয়ে তিনি আর্জি পেশ করেছিলেন একাধিকবার। দুঃখের বিষয় তার আর্জি মঞ্জুর হয় নি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকবি মধুসূদন, পাইকপাড়ার জমিদারের থেকে অর্থ নিয়ে নাটক লিখে দিয়েছেন–মধুসূদনের জীবনী আর বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে এ সব তথ্য অজানা থাকার কথা নয়। মোট কথা, সাহিত্য-পুরস্কার সাহিত্য-বৃত্তি বা কবি-সাহিত্যকদের সাহায্য দেওয়া নেওয়া সব সভ্য সমাজে এক পুরোনো রেওয়াজ, নতুন কিছু নয় মোটেও। লেখকদের জন্য সবচেয়ে বড় কথা বিবেক ও মনের স্বাধীনতা। এ দুই বজায় রেখে মহাপ্রতিভারাও বিত্তশালীদের কাছ থেকে সাহায্য নিতে কখনো দ্বিধা করেন নি।
