রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন :
আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে,
আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।
অথবা নজরুল যখন বলেন :
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না–
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত।
তখন কি আমরা আদি কবির কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই না? যুগের পরিবর্তন হয়েছে, ফলে ভাষারও পরিবর্তন ঘটেছে। ছন্দ ও অলঙ্কার প্রকরণ বদলে গেছে, প্রকাশভঙ্গিও নিয়েছে অন্যরূপ–না হয় এই তিন কবির কণ্ঠে একই সুরই তো ধ্বনিত হয়েছে–এই ত্রয়ীর চরিত্রগত রূপও একই? তাই আমার ধারণা, মহৎ শিল্পীরা কখনো জীবনবিমুখ হতে পারে না। মহৎ কথাটার অর্থ কী? যিনি মহৎ তিনি কখনো নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন–যিনি নিজেকে যত বেশি ব্যাপ্ত করে দিতে পারেন তিনিই তো তত বেশি মহৎ। শিল্পী ও সংস্কৃতি সেবীরা যদি নিজেদের চারপাশে ছড়িয়ে দিতে না পারেন, তাদের চারপাশে যে জীবন, সে জীবনের সঙ্গে যদি নিজেদের মেশাতে না পারেন, সেই সব জীবনের সমস্যাকে যদি নিজেদের মানস কল্পনার ও প্রতিভার উপকরণ করে না নিতে পারেন তা হলে তাদের শিল্প ও সংস্কৃতি সাধনা কখনো সার্থক হবে না। শিল্প ও সংস্কৃতি সেবীদের মনে রাখতে হবে–তাঁরা মানুষ, তাই কোনো মানুষই তাদের অনাত্মীয় নয়, কোনো মানুষের কথাই তাঁদের পক্ষে পর-চর্চা নয়। শুধু পঞ্চ ইন্দ্রিয় নয়, মানুষের আছে অনুভূতি, আছে ভাব ও কল্পনা–এ সবের সাহায্যে মানুষ প্রবেশের ছাড়পত্র পায় শুধু চেনা-অচেনা, জানা-অজানা মানুষের অন্তরে অন্তরে নয়, চেতন ও অচেতন সব কিছুর রহস্যলোক সে আবিষ্কার করতে পারে, ফলে সেই সবও হতে পারে সাহিত্য শিল্পের অঙ্গ, তার সঙ্গীত ও নৃত্যের উপকরণ। চৈত্রমাসের ঝরা পাতা কি বহু কবিতা ও গানের উপকরণ হয় নি? আমার চতুর্দিকের যে জীবন ও প্রকৃতি তা চেতন হোক কি অচেতন হোক তার সঙ্গে আমি নিঃসম্পৰ্কীয় নই–সে সবকে বাদ দিয়ে যে জীবন সে জীবন বাতায়নহীন কবরের জীবন। কালিদাস যে কন্বমুনির আশ্রমের অমন ঘটা করে বর্ণনা দিয়েছেন সে কি তার জীবনবিমুখতা? না, বরং তা জীবনেরই স্বীকৃতি। কারণ আশ্রমবাসীদের জীবন আর সেই আশ্রম-প্রকৃতি প্রায় এক হয়ে গিয়েছিল। আশ্রম-প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে কালিদাস যদি শকুন্তলা-চরিত্র আঁকতে চেষ্টা করতেন তা হলে তা অত্যন্ত অবাস্তব হতো। তাই আমি মনে করি, তাঁর কাব্যে আশ্রমকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি বরং বাস্তবতা ও জীবন বোধেরই পরিচয় দিয়েছেন।
.
জীবনের প্রতি এই উদার দৃষ্টিভঙ্গি সাহিত্য-শিল্পীর জন্য অত্যাবশ্যক। আজকের দিনে খাওয়া-পরার সমস্যা যে এক নিদারুণ রূপ নিয়েছে এ কারো অবিদিত নয়। স্বভাবতই তা আজ সাহিত্য-শিল্পেও এক বড় স্থান অধিকার করেছে। আজকের সাহিত্য শিল্পের এও এক উপজীব্য তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দুঃসহ দুর্যোগ-দুর্ভাবনার শিকার হয়েও সাহিত্য-শিল্পীদের দিশেহারা হলে চলবে না। কারণ, সাহিত্য-শিল্পীর আদর্শ-জীবনের সামগ্রিক রূপেরই ধারণা–শত অভাব-অভিযোগ ও ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও যে জীবন সুন্দর ও মহৎ। কোনো একদিকের প্রতি, বিশেষ করে জীবনের অভাবাত্মক দিকের প্রতি মাত্রাধিক জোর দিলে সামগ্রিক রূপ-কল্পনা ও ধারণা ব্যাহত হতে বাধ্য। সাহিত্য-শিল্প ও সংস্কৃতি সাধনার একটি বড় অবদান হল জীবনে মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতি বোধ জাগিয়ে তোলা। স্বয়ং শিল্পীরাই যদি সেই মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতি বোধ হারিয়ে বসেন তা হলে তাঁদের রচনা যে ভারসাম্যহীন ও মাত্রাজ্ঞানহীন হয়ে পড়বে তাতে আর বিচিত্র কী? আমাদের তরুণ সাহিত্য-ব্রতীদের কারো কারো রচনায় এ মাত্রাবোধের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বলেই, কিছুটা অবান্তর হলেও কথাটা উল্লেখ করলাম। বলেছি, কোনো মানুষই সাহিত্য-শিল্পীর অনাত্মীয় নয়। এমনকি villainও তার অনাত্মীয় নয়। তিনি যখন villain-এর চরিত্র আঁকেন তখন villain-এর প্রতি ঘৃণা উদ্রেকে তার একটা উদ্দেশ্য থাকে বটে কিন্তু তার চেয়েও বড় উদ্দেশ্য থাকে villainও মানুষ, তার ভেতরও। যে মনুষ্যত্ব আছে তাকে আবিষ্কার করা, তাকে ফুটিয়ে তোলা। শেষোক্ত উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো শিল্প-ক্রিয়াই মহৎ শিল্পের মর্যাদা পেতে পারে না। সাহিত্যের সমৃদ্ধি শুধু লেখকের ওপর নির্ভর করে না–পাঠকের সহযোগিতাও অত্যাবশ্যক। সচেতন পাঠকের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সাহিত্যের প্রসার ও অগ্রগতি অসম্ভব। তবে এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, যা ছাপা হয় তাই সাহিত্য নয়। এমন কি অনেক লেখকও মনে করেন যা লেখা হয় তাই ছাপার উপযুক্ত আর যা ছাপা হয় তাই সাহিত্য। এর মতো ভুল ধারণা আর হতে পারে না। তাই পাঠকের ভূমিকাও বেশ মূল্যবান। পাঠক যদি একটু বাছ-বিচার করেন অর্থাৎ বাছ-বিচার করতে সক্ষম হন, তিনি যদি কোন রচনা সাহিত্য পদবাচ্য তা পরখ করে নিতে শেখেন তা হলে বহু অবাঞ্ছিত রচনা পাঠকের উপেক্ষা ও অবহেলায় যথাস্থানে নির্বাসিত হবে ও সত্যকার সাহিত্য প্রসার লাভ করবে এবং সাহিত্য-সেবীরাও তাহলে নিজেদের রচনা যাতে সাহিত্যের মানে গিয়ে পৌঁছে তার জন্য প্রয়োজনীয় সাধনা ও শ্রম স্বীকার করবেন আর প্রতীক্ষা করতে শিখবেন। বলা বাহুল্য, সব রকম সৃষ্টির জন্য প্রতীক্ষার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। এমন কি জননীও দশমাস প্রতীক্ষা করে থাকেন সন্তানের মুখ দেখার জন্য।
