কৃষ্টি বা সংস্কৃতির মূল কাণ্ড সাহিত্য। সাহিত্যকে অবলম্বন করেই সাধারণত সংস্কৃতির নানা শাখা-প্রশাখা দল মেলে–সংগীত বলুন, নাটক অভিনয় বলুন, চিত্র শিল্প বলুন; এমনি সংস্কৃতির আরো যত রকম রূপ আছে সব কিছুর মূল উৎস ও প্রেরণা সাহিত্য। মানুষের চেহারার মত প্রতিটি মানুষের মনের স্বরূপও স্বতন্ত্র। যে। কোনো মানুষের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রে প্রতিফলিত হয় মনের গতি-প্রকৃতি। নানা সংস্কৃতি সাধনার মধ্য দিয়েই ঋদ্ধ হয় মানুষের মন ও মনন। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র যখন বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তার প্রসার যখন হয় দেশব্যাপী, তখনই তা জাতীয় বা দেশগত রূপ লাভ করে। এইভাবে জাতির চরিত্র ও প্রতিভা ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হয় তার সাহিত্যে, সঙ্গীতে, নাটকে, চিত্র-শিল্পে ও তার নৃত্যকলায়। বলা বাহুল্য, আমাদের জাতীয় চরিত্র ও প্রতিভা এখনো সেভাবে আমাদের সাহিত্য-শিল্পের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় তেমন প্রতিফলিত হয় নি, ফুটে ওঠে নি। তাই আমাদের শিল্পী, সাহিত্যিক ও সব শ্রেণীর সংস্কৃতি-সেবীদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং আরো একনিষ্ঠভাবে কঠোর সাধনায় হতে হবে প্রবৃত্ত।
জাতীয় চরিত্র ও প্রতিভার সঙ্গে বিশ্বমানবধর্ম তথা মনুষ্যত্বের কোনো বিরোধ নেই। সাহিত্য-শিল্পী ও সংস্কৃতি-সেবী মাত্রেই মনুষ্যত্বের সাধক। মনুষ্যত্বের মহাসমুদ্রে অবগাহনই তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ব্যবধান মাত্র সাঁতরে পার হওয়া যায় এমন একটি খালের–তবুও উভয় দেশের সাহিত্য-শিল্পে ভিন্নতর জাতীয় চরিত্র ও প্রতিভা প্রতিফলিত হয়েছে। আরব, ইরান শুধু পাশাপাশি নয়, এক সময় একই শাসনাধীনেও ছিল, তবুও উভয় দেশের সাহিত্য কত আলাদা। ভাষার বিভিন্নতার কথা আমি বলছি না–মর্মগত অর্থাৎ চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কথাই বলছি। ইংরেজ আর আমেরিকানে নাকি খুড়োতুতো-মাসতুতো ভাই, উভয় দেশের ভাষাও এক–তা সত্ত্বেও উভয় দেশের সাহিত্যের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য কার না লক্ষগোচর? এমন কি, সাধারণ যে রান্নাবান্না তাতেও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতিতে কতই না পার্থক্য। ইংরেজি রান্না, ফরাসি রান্না, মোগলাই রান্না, পাকিস্তানি রান্না, চীনা রান্না, জাপানি রান্না এমনকি বাঙালি রান্না, ঘটি রান্নাও আছে, চট্টগ্রামি রান্না আর ঢাকাই রান্না তো আছেই। অথচ এত সব রকমারি রান্নার এক ও একমাত্র উদ্দেশ্যে হচ্ছে খাওয়া, খেয়ে দেহের পুষ্টিসাধন। সাহিত্য-শিল্পের যে বিভিন্নতা তাও এ ধরনের বিভিন্নতা। একই ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ জীবনের প্রতি যে একটা স্বতন্ত্র মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করে তা-ই সেখানকার সাহিত্য-শিল্পে এবং সংস্কৃতি সাধনায়ও প্রতিফলিত হয়। এ যেন বিভিন্ন নদী বিভিন্ন পথে প্রবাহিত হয় বটে কিন্তু সবের লক্ষ্য হচ্ছে মহাসমুদ্রে মিলিত হয়ে মুক্তিলাভ। তেমনি বিভিন্ন দেশের সাহিত্য-শিল্পে নানা বর্ণবৈচিত্র্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে বটে কিন্তু তারও লক্ষ্য এক–মনুষ্যত্বের সাধনা, মনুষ্যত্বরূপ মহাসমুদ্রে মুক্তিলাভ।
সংস্কৃতিসেবী মাত্রেই জানেন সাহিত্য-শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে জাতীয় চরিত্র ও জাতীয় বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয় তা কখনো দ্বন্দ্বমূলক নয় বরং মিলনমূলকই। আধুনিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় Unity in Diversity। এই Unity-র সাক্ষালাভ কখনো ঘটবে না। বৈচিত্র্যহীন যে ঐক্য তা গোরস্থান বা শ্মশানেরই ঐক্য–তা সমাজেরও নয়, জীবনেরও নয়। বলাই বাহুল্য, জীবনবোধ ছাড়া সবরকম সংস্কৃতি সাধনাই ব্যর্থ। কারণ, সংস্কৃতি সাধকরাও সমাজ-জীবনেরই অঙ্গ। সমাজের প্রতি তাদের যে দায়িত্ব তাদের সংস্কৃতি সাধনা যেন সেই দায়িত্ব পালন ও তার পরিপূরক হয়। জীবন-বিমুখ অর্থাৎ পলাতক সাহিত্য-শিল্পীর আজ আর কোনো মূল্য নেই। কোনোদিন যে মূল্য ছিল তাও আমার মনে হয় না। এই কথা বলতে গিয়ে আমাকে আবার সেই পুরাতন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে–শিল্পের জন্য শিল্প না জীবনের জন্য শিল্প? আজকের দিনের যে সমস্যা অতীতে হয়ত সেসব সমস্যা আদৌ ছিল না। তখনকার সমস্যার রূপ ছিল। ভিন্নতর এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ যে একটি অনবদ্য শিল্প সৃষ্টি সেই সম্বন্ধে দ্বিমত নেই। কিন্তু যক্ষ, যক্ষপত্নী, মেঘ–ধরতে গেলে এ সবই তো রূপক, এই রূপকের আড়ালে কবি কি মানব মনের চিরন্তন বিরহ বেদনাকেই রূপ দেন নি? মানুষের মনের এই এক চিরন্তন সমস্যাকে তিনি রূপ দিয়েছেন বলেই তো ‘মেঘদূত’ পুরোনো হয়েও পুরোনো নয়। মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন হলে এই কাব্য কি যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে আবেদন করতে পারত? কালিদাসের যুগে অন্নবস্ত্রের কোনো সমস্যা ছিল না, ছিল না রেশন প্রথা বা কালোবাজার–কাজেই ওইসব তার বাক্যে স্থান পাওয়ার কথা নয়। আদি কবি বাল্মীকির প্রথম শ্লোকটাই স্মরণ করুন না, যাকে প্রথম কবি উক্তি বলে অভিহিত করা হয়। সে কি জীবন বিচ্ছিন্ন? এক ব্যাধ নিরপরাধ এক ক্রৌঞ্চকে বধ করে ক্রৌঞ্চ বধূর সমস্ত সুখ হরণ করেছে। সেই নিষ্ঠুরতার প্রতি ধিক্কার ধ্বনিই তো তার মুখনিঃসৃত প্রথম শ্লোক। এও তো এক রূপক। অন্যায়, অবিচার, অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাল্মীকির মুখ দিয়ে সমস্ত মানব হৃদয়েরই ধিক্কার ধ্বনি কি উচ্চারিত হয় নি? ইতিহাসের শুরু থেকেই তো চিরকাল ধরে চলেছে এভাবে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার। তার বিরুদ্ধেই তো আদি কবির বজ্রকণ্ঠের প্রতিবাদ। এভাবে যুগে যুগে সৎ-শিল্পীরা জীবনবোধের পরিচয় দিয়ে এসেছেন এবং আজকের দিনের শিল্পী সাহিত্যিকরাও সে ঐতিহ্যই বহন করে চলেছেন।
