দক্ষিণ জার্মানিতে খ্রিস্টের শেষ জীবন নিয়ে যে passion play হয়, তাতে খ্রিস্ট জীবনের চরম ত্যাগকে লোকচক্ষুর সামনে রূপ দেওয়া হয় নাটকের আকারে এবং প্রতি দশ বছর অন্তর তা অভিনীত হয়। এ দশ বছর ধরে চলে তার প্রস্তুতি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও অভিনয় দেখতে গিয়েছিলেন এবং দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ নাটকে যিনি খ্রিস্টের ভূমিকায় অভিনয় করবেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে খ্রিস্টের ভাবাদর্শে জীবন যাপন করতে চেষ্টা করেন এবং এভাবে দীর্ঘ সাধনায় নিজেকে সে ভূমিকার যোগ্য করে গড়ে তোলেন।
আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার লোক হজ্জ্ব করতে ও হযরতের। রওজা শরিফ জেয়ারত করতে মক্কা-মদিনা গিয়ে থাকেন। তাদের একজনও কি হযরতের ভাবাদর্শে জীবন যাপনের এক শতাংশ চেষ্টাও করে থাকেন? হযরতের জীবন ও ভাবাদর্শকে সাহিত্য-শিল্পের রস-রূপ করে দিয়ে, আনন্দের সামগ্রী করে তাদের সামনে কখনো পরিবেশন করা হয় নি ফলে তা হৃদয়ের সিংহদ্বার পর্যন্ত ও পৌঁছতে পারে না। তারা শুধু ধর্মের আদেশটুকুই পালন করে, তাকে হৃদয় মনের বস্তু করে নেয় না, নিতে পারে না।
শিল্প ও সাহিত্যের ভেতর দিয়ে অন্যান্য ধর্মের ভাবুকদের জীবন যেমন অনেকের মন-মানসের ও ধ্যানের বস্তু হয়ে উঠেছে, ইসলামের বেলায় তা হয় নি। ইসলামের মহাপুরুষদের জীবন নিয়ে ও ধর্মীয় কাহিনী অবলম্বনে চিত্রকলা ও ভাস্কর্য গড়ে ওঠে নি। গড়ে ওঠে নি নাটক-নভেল। ঐ সব জীবন ও কাহিনী রূপায়িত হয় নি যাত্রা ও অভিনয়ে। তাই হয় নি ঐ সব এখনো জন-চিত্তের খোরাক। কারবালার ঘটনার মতো এমন চমৎকার মহাকাব্য বা নাটকীয় উপাদানও ব্যবহার হতে পারে নি রঙ্গমঞ্চে বা ছায়াছবির পর্দায়।
একদা স্বয়ং মধুসূদন তার বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লিখেছিলেন, ‘ভারতের মুসলমানদের মধ্যে যদি কোনো বৃহৎ কবির উদ্ভব হইত, হাসান ও তাঁহার ভ্রাতার মৃত্যুকে অবলম্বন করিয়া কী বিরাট এপিক লেখাই না তাঁহার পক্ষে সম্ভব ছিল। সমস্ত জাতির অনুভূতিকে সে নিজের পক্ষে টানিতে পারি। আমাদের এমন কোনো বিষয় নাই।’
এপিক তথা মহাকাব্যের যুগ অতীত হয়েছে–এখন নাটক-নভেল ও ছায়াছবির যুগ। মহাকাব্যের জন্য যেমন মহা প্রতিভার দরকার, এ সবের জন্য তেমন প্রতিভা না হলেও চলে। কাজেই এ সব উপকরণকে এখন যুগোপযোগী আঙ্গিকেও রূপ দেওয়া যেতে পারে।
মুসলমানদের শিল্প-বোধ ও সৃষ্টি প্রতিভা অন্য কোনো রকমে মুক্তি না পেয়ে তা শুধু মসজিদ ও স্মৃতিসৌধেই চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। কিন্তু এ সবের পরিধি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং তা সাধারণ শিল্পীর সাধ্য ও আয়ত্বের অতীত। ব্যক্তিগত ও সাধারণ জীবনের পরিধিতে শিল্প যদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে রূপ-লাভ না করে, বৃহত্তর জীবনে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। বলা বাহুল্য, সাহিত্য-শিল্পের জন্য কোনো উপকরণই পুরোনো বা বাসি নয়–আঙ্গিক ও রূপ অর্থাৎ form নতুন হতে পারে। নতুন আঙ্গিকে ও নতুন রূপে বহু পুরোনো উপকরণকেই প্রতিভাবান সাহিত্যিক-শিল্পীরা যে অতি সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন, সাহিত্য-শিল্পের ইতিহাসে তার দৃষ্টান্তের কোনো অভাব নেই।
[‘সাহিত্য ও শিল্পের উপক্ষিত উপকরণ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫০-এর দশকে সাহিত্য সাপ্তাহিক মেঘনায়। প্রথম গ্রন্থাকারে সংকলিত হয় ১৯৬১-তে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনায়।]
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
দেশে দেশে যুগে যুগে মানুষের যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, যে ইতিহাস রচিত হচ্ছে সে ইতিহাস আমাদের চোখের সামনে এ সত্যটাই তুলে ধরে যে, বেঁচে থাকার অর্থ শুধু টিকে থাকা নয়। আমরা এও জানি, সংস্কৃতি সাধনাই এ চেতনাবোধ মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে। দেহের উর্ধ্বে মানুষের আরো দাবি আছে–সে দাবি মনের দাবি, আত্মার দাবি, প্রতিভার দাবি। এই দাবি পূরণের দায়িত্বভার কৃষ্টি ও সংস্কৃতি-সেবীদের ওপর। যে জাতি ও যে দেশ এ দাবি যত বেশি পূরণ করতে পেরেছে, সে জাতি বা দেশ তত বেশি মহত্ব অর্জন করেছে; মনুষ্যত্ব সাধনায় তত বেশি এগিয়ে গেছে। এ বিষয়ে। আমাদের দেশের ও জাতির দারিদ্র্য অসঙ্কোচে স্বীকার না করে উপায় নেই।
মাত্র কয়েকদিন আগে দেশ-বিদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্বন্ধে পরিচয় রাখেন এমন একজন উচ্চশিক্ষিত ভদ্রলোক কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলেছিলেন : ‘এই কয় বছরে আমার দেশ পূর্ব পাকিস্তানে যা জ্ঞান সাধনা হয়েছে তার সবটুকু কিনে নিতে আমার পঞ্চাশ টাকার বেশি ব্যয় করার দরকার পড়ে না। অন্যান্য দেশের তুলনায় এই তো আমাদের জ্ঞান সাধনার পরিমাণ। কথাটা আক্ষরিক অর্থে সত্য না হতে পারে কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই দেখা যাবে, এ কথায় আমাদের সংস্কৃতি সাধনার সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতার প্রতি যে ইঙ্গিত রয়েছে, তা অত্যন্ত রূঢ় ও নিষ্ঠুর হলেও অনেকখানি সত্য। সাংস্কৃতিক জীবনে আমাদের অবদান ও বাস্তব অবস্থার প্রতি এ যে এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
স্বীকার করি, এই শোচনীয় অবস্থার জন্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ অনেকখানি দায়ী। অর্থনেতিক অব্যবস্থায় সংস্কৃতিসেবীরা আজ বিপর্যস্ত। আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে সংস্কৃতি-সেবীদের অনেকেই বিভিন্ন কলা ও শিল্পচর্চার অনুকূল পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। আমাদের সামাজিক পরিবেশ এখনো মধ্যযুগীয়–সংস্কার বিমুক্ত যে সামাজিক আবহাওয়া ও পরিবেশ শিল্পসাধনা ও শিল্পসৃষ্টির জন্য অপরিহার্য তার ক্ষেত্র এখনো রচিত হয় নি। রাজনীতির ক্ষেত্রে অবস্থা আরো শোচনীয়। প্রাক স্বাধীনতা যুগে সংস্কৃতি-সেবীদের যেটুকু স্বাধীনতা ছিল, বলতে দ্বিধা নেই, এখন সেই স্বাধীনতাটুকুও অনেকখানি সঙ্কুচিত। যে কোনো কর্মের অগ্রদূত–ভাব, চিন্তা, কল্পনা। সেই ভাব, চিন্তা ও কল্পনার ক্ষেত্রে যারা একটু এগিয়ে যেতে চান, সেই প্রগতিশীলদের এখন আখ্যা দেওয়া হয়েছে leftist বা বামপন্থী বলে আর সেই বামপন্থীদের রীতিমত সন্দেহের চোখে দেখা যেন উঁচু নিচু ও মাঝারি সব রকম সরকারি পর্যায়ের একটা নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ উদ্ধত সন্দেহের নিচে দাঁড়িয়ে সার্থক সংস্কৃতি চর্চা কখনো চলতে পারে না। এ কথা মনে রাখা জাতীয় স্বার্থের জন্যই প্রয়োজন–এই বহুনিন্দিত প্রগতিশীলরাই দেশকে, জাতিকে সামনের দিক এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন এবং তাঁরাই নিয়ে যেতে পারবেন। বাংলা ভাষা যে আজ রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করেছে তাও এই প্রগতিশীলদের রক্তের বিনিময়ে, তাদের সক্রিয় ও সুসঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলনের ফলে। নব নব চিন্তার পথে, ভাবের পথে, কল্পনার পথে–এক কথায় সৃষ্টির পথে এঁরাই পা বাড়াতে সক্ষম। যারা Good old days এর জাবর কাটতে চান, পুরোনো ও মান্ধাতার আমলের ভাবাদর্শকেই চরম ও পরম লক্ষ্য। মনে করে চোখ বাঁধা কলুর বলদের মত শুধু ঘানির অচলায়তন প্রদক্ষিণ করে সংস্কৃতি চর্চার ভান করছেন তারা জাতির মানস-জীবনকে পেছনের দিকে, তার সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে বন্ধ্যাত্বের পথে ঠেলে দিচ্ছেন মাত্র। সংস্কৃতি স্থানু নয়–মানুষের জীবনের মতোই তা প্রগতিশীল। হাজার কি দু হাজার বছর আগে কৃষ্টি বা সংস্কৃতির যে রূপ ছিল মানুষের গতিধারার সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ ও ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে ও হচ্ছে। অতীতে সব কিছুর গতি ছিল মন্থর, আজ নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে সেই গতি হয়েছে দ্রুত। তাই এখন এবং ভবিষ্যতে সংস্কৃতির পরিবর্তন আরো দ্রুততর হতে বাধ্য। সংস্কৃতি সাধনায় এই গতি, প্রগতির ধারা যারা বুঝতে পারেন না, ধরতে পারেন না, উপলব্ধি করতে পারেন না সেই সব স্থবিরদের সংস্কৃতি সাধনা আজকের দিনে ব্যর্থ ও নিষ্ফল হতে বাধ্য। সংস্কৃতি সাধকদের এ কথা মনে রাখা দরকার–ঘড়ির কাঁটা কখনো পেছনের দিকে ফেরানো যাবে না। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক আজ আমরা যে ইতিহাসের অংশ হয়ে পড়েছি, সেই ইতিহাসের নির্দেশ হচ্ছে অগ্রগতি, পেছনের দিকে না ফেলে সামনের দিকে পা ফেলার। পৃষ্ঠপ্রদর্শন মানে সেই ইতিহাসের প্রতি বিশ্বাস-ঘাতকতা। সংস্কৃতি-সেবীদের এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন–ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, সে বড় নিষ্ঠুর ও নির্মম বিচারক। যে কোনো রকম ঐশী শক্তির দোহাই সেখানে অচল ও অকেজো।
