সমালোচনাকে সাধারণত দু ভাগে ভাগ করা হয়–গঠনমূলক ও ধ্বংসাত্মক। বলা বাহুল্য, এও অনেকখানি মনগড়া বিভাগ। রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক আর নির্বিচার ব্যবহারের ফলে এ দুই শব্দের অর্থ আর প্রয়োগ নিয়েও যথেষ্ট বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। পারস্পরিক স্বার্থের দৃষ্টিতে দেখা হয় বলেই উদ্দেশ্যমূলক ব্যাখ্যা দেওয়া হয় এ দুই শব্দের। সাহিত্যে আমরা গুণগ্রাহিতাকেই মোটামুটি গঠনমূলক সমালোচনা বলতে পারি আর স্রেফ নির্জলা নিন্দামূলক সমালোচনাকে বলতে পারি ধ্বংসাত্মক। ধ্বংসাত্মক বা নিন্দামূলক সমালোচনাও একেবারে ব্যর্থ নয়–তারও কিছু সুফল রয়েছে। তাতে লেখক আরো সতর্ক, সচেতন ও তীক্ষ্ণ হন–লেখাকে আরো উন্নত করার একটা প্রেরণাও যে তিনি তখন বোধ না করেন তা নয়। এ সম্বন্ধে প্রখ্যাত সমালোচক রেমন্ড উইলিয়ামসের নিম্নলিখিত মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে : Yet there is an essential place, in development of literature, for criticism of the kind that is usually called destructive. The large body of destructive criticism of the last seventy years was fundamentally necessary to the reform of the drama.’(Drama from Ibsen to Elliot) কাজেই কোনো সমালোচনাই সম্পূর্ণ ব্যর্থ নয়। উপেক্ষাই সাহিত্যের জন্য মারাত্মক। আমাদের যেটুকু সাহিত্য হয়েছে ও হচ্ছে তার কোনো মূল্যায়ন ও বিচার-বিশ্লেষণ হচ্ছে না। তা প্রায় উপেক্ষিত হচ্ছে, হচ্ছে অবহেলিত। এটা আশঙ্কার কথা। এ কারণে সাহিত্যে প্রবীণ রুচির মানদণ্ড আমরা খুঁজে পাচ্ছি না–সমালোচক সে মানদণ্ড নির্মাতা।
[‘সমালোচনা’ প্রথম প্রকাশিত হয় সমকাল পত্রিকার কার্তিক-পৌষ ১৩৭৩ সংখ্যায়। পরে তা সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়।]
সাহিত্য ও শিল্পের উপেক্ষিত উপকরণ
সাহিত্য ও শিল্পের কাজ হলো মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করা–মনকে শুধু মুগ্ধ করা নয়, হৃদয়কে জাগিয়ে তোলাও।
যে সব শাশ্বত আদর্শ ও গভীর ভাবধারা কালের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়েছে, সে সব ভাব ও আদর্শ যদি সাহিত্য-শিল্পে রূপলাভ করে, তা যে শুধু সহজে মানব হৃদয়ে প্রবেশ করে তা নয়, হৃদয়ের পটে কায়েমি-ভাবে দাগ কাটতেও তা হয় সক্ষম এবং এভাবেই গড়ে ওঠে ব্যক্তি-চরিত্র ও মানস।
মানুষের আধ্যাত্মিক অনুভূতি ও ধ্যান-ধারণা ইতিহাসের সূচনায় এক একটা লৌকিক ধর্মাদর্শকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। বলাই বাহুল্য, দেশভেদে ও কালভেদেও ধর্মাদর্শের ও তার অনুষ্ঠানাদির রূপান্তর ঘটেছে নানাভাবে। আর ধর্মাদর্শকে ভিত্তি করে, ভিন্ন ভিন্ন। ভৌগোলিক পরিবেশে নানা সংস্কৃতি যে দানা বেঁধেছে এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই।
এ সব ধর্মাদর্শ ও সাংস্কৃতিক রূপায়ণ বিভিন্ন ব্যক্তি ও অনুষ্ঠানে যেভাবে রূপ পরিগ্রহ করছে–হয়তো তা নিছক কল্পনা, হয়তো তা চূড়ান্ত বিকৃতি, তবুও সামাজের বৃহত্তর অংশকে এ সবই প্রেরণা দিয়ে এসেছে, জুগিয়েছে জন-মনের খোরাক। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে রামায়ণ, মহাভারত, জাতক কাহিনীর কথা, পুঁথি ও সাহিত্যের বিচিত্র কাহিনী, কাসাসুল আম্বিয়া, তাজকেরাতুল আওলিয়া বা খ্রিস্টীয় সেন্টদের কথা।
সত্যের চেয়েও সত্যকে কেন্দ্র করে মানুষের অর্থাৎ শিল্পী-সাহিত্যিকের যে কল্পনার জগৎ গড়ে উঠেছে তার মূল্য ও আকর্ষণ অনেক বেশি, তার প্রভাব ও আবেদনও ব্যাপকতর। গীতা-উপনিষদের চেয়ে রামায়ণ-মহাভারতের প্রভাব যে অনেক বেশি কে তা অস্বীকার করতে পারে? রামায়ণ-মহাভারতে আমরা রক্তমাংসের মানুষকেই দেখতে পাই। তাদের পাপ-পুণ্য মানুষেরই পাপ-পুণ্য।
তাই সহজেই তারা মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ লাভ করে। এখানেই ধর্মগ্রন্থের ওপর সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব। ধার্মিকের চেয়ে সাহিত্য-রসিক যে মানুষ হিসেবে অনেক বড় এ বিষয়ে বোধ করি দ্বিমত নেই।
ইসলামের ধর্মীয় ও আধা ধর্মীয় ঘটনা ও কাহিনীগুলি এখনো যথাযথভাবে সাহিত্য শিল্পের উপরকণ হতে পারে নি। সামাজিক গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণুতাই তার বড় কারণ। ফলে সাহিত্য-শিল্পের এ দিকটা উপেক্ষিত ও দরিদ্রই রয়ে গেছে। ধর্মাদর্শ ও ভাবধারা সাহিত্য-শিল্পের মাধ্যমে রূপায়িত না হলে তা নেহাত কেতাবি ও মৌখিক বুলিতেই পর্যবসিত হয়ে থাকে। তাই আমাদের তথাকথিত ধার্মিকরাও মানুষ হিসেবে অত্যন্ত খণ্ডিত, ভারসাম্যহারা ও রসবোধহীন।
হিন্দু তার দেব-দেবীকে নতুন করে সৃষ্টি করতে পারে শিল্পে, ভাস্কর্যে, স্থাপত্যে, নাটকে, নভেলে। নিত্য নতুনভাবে রূপায়িত করে তাকে জীবনের সামগ্রী করে নিতে তার কোনো বাধা নেই। বৌদ্ধরাও তা করতে পারে–বুদ্ধ ও বুদ্ধ-জীবন নিয়ে কত অসংখ্য শিল্প-কলাই না দেশ বিদেশে গড়ে উঠেছে। খ্রিস্টানরাও তাই করে। খ্রিস্ট ও মেরির জীবন নিয়ে কত অসংখ্য শিল্প যে সৃষ্টি হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। যে কোনো শিল্প-বস্তুর যে প্রেরণা তার রস তথা আনন্দের সম্পর্ক রয়েছে–তাই সহজে তা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে ও নাড়া দেয়।
সৃষ্টির আনন্দের চেয়ে বড় আনন্দ আর নেই। ভক্ত ও ত্যাগীদের জীবন যুগে যুগে শিল্প-সৃষ্টির এক বড় উপাদান যুগিয়ে এসেছে। জনসাধারণ এভাবে শিল্পের মাধ্যমে, আনন্দ উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে মহৎ জীবনকে নিজস্ব করে নেওয়ার একটা সুযোগ লাভ করে এবং ধর্ম ও নীতিও এভাবে শিল্পের মাধ্যমে সার্থক হয়ে ওঠে। বলা বাহুল্য, শিল্প শুধু জীবনের রূপায়ণ নয়, মহৎ জীবনের প্রতিফলনও।
