আমাদের অধ্যাপকদের কেউ কেউ সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করেছেন–নিঃসন্দেহে এসব মূল্যবান অবদান। সমালোচনার জন্যও সাহিত্যের ইতিহাসের প্রয়োজন নিঃসন্দেহ। উপকরণ ছাড়া সমালোচনা বা মূল্যায়ন সম্ভব নয়। অন্তত অতীত উপকরণের জন্য আমরা আমাদের এসব ঐতিহাসিকদের কাছে ঋণী। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাস যেমন আছে তেমনি সাহিত্যের ভূগোলও আছে। এ ভূগোল রচনার দায়িত্ব সমালোচকদের। দেশের বিভিন্ন এলাকা আর নদনদীর নাম যেমন ভূগোল নয়, তেমনি নাম ফিরিস্তি বা ঘটনার ধারা বর্ণনাও সমালোচনা নয়। এখন ভূগোল একটা বিজ্ঞানে পরিণত, সমালোচনাও সাহিত্যের বিজ্ঞান। তবে সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি বৈজ্ঞানিকের বটে কিন্তু তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-রসিক তথা শিল্প-বোদ্ধাও হতে হয়। সমালোচকের জন্য দুটি শর্ত অপরিহার্য–এক, তাঁকে শিল্পী বা শিল্প-সমজদার হতে হয়, দ্বিতীয়ত, তাকে হতে হয় চিন্তাশীল, ইংরেজিতে যাকে বলে–thinker। এ দুই গুণ ছাড়া ভাল সমালোচক হওয়া সম্ভব নয় বলেই আমার বিশ্বাস। শিল্প সমালোচককে শিল্প-সমজদার হতে হবে এ প্রায় স্বতঃসিদ্ধ কথা কিন্তু চিন্তাশীল কেন হতে হবে এ নিয়ে কিছু খটকা থাকা হয়তো সম্ভব। সব শিল্পকর্মই শিল্পীর সৌন্দর্য-চেতনা তথা aesthetic experience এরই ফল–এ চেতনা বা অভিজ্ঞতার পেছনে চিন্তা সব সময় সক্রিয়। চিন্তার সাহায্যেই অভিজ্ঞতা শিল্পে রূপান্তরিত হয়। জীবন থেকে বা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যেমন শিল্পের উৎপত্তি তেমনি শিল্পের লক্ষ্যও জীবন অর্থাৎ জীবনের জন্যই শিল্প। সমালোচকের চারদিকে আবর্তিত বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে রচিত শিল্পের সাযুজ্য কতখানি, তার মূল্যও বা কতটুকু, এসবের মাপকাঠি একমাত্র চিন্তাবিদদেরই হাতে। আর চিন্তাই দিয়ে থাকে অনুভূতি আর চেতনাকে তীক্ষ্ণতা–কালের গতিধারা আর ভবিষ্যৎ রূপকল্প একমাত্র চিন্তাবিদের ধারণায় দিতে পারে ধরা। মূল্যবোধও স্থাণু নয়–কালের সঙ্গে সঙ্গে তারও রদবদল অনিবার্য। জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে চিন্তার কষ্টিপাথরেই এ সবের যাচাই সম্ভব। তাই শিল্পকর্মে মূল্যবোধের প্রতিফলন কতটুকু হয়েছে না হয়েছে, জীবনের সঙ্গে তার মৈত্রী বা বৈরিতা বিচারের জন্য শিল্পবোধের সঙ্গে চিন্তাশীলতাও অত্যাবশ্যক। কোনো শিল্পই অসীম, বেপরোয়া বা উদ্ধত কি উদ্ভট নয়–চিন্তাই শিল্প রচনা আর শিল্পবিচারে দিয়ে থাকে পরিমিতিবোধ। সমালোচককেও তাই একাধারে শিল্পী আর চিন্তাশীল হতে হয়। শিল্পবোধ সমালোচককে পদ্মবনে মত্ত হাতি হতে বাধা দেয় আর চিন্তা শিল্পের দিগন্ত উপলব্ধিতে করে সহায়তা।
সৌন্দর্য-চেতনাকে জাগানোই শুধু শিল্পের কাজ নয়, আত্মানুসন্ধান তার প্রধানতম দায়িত্ব। মানুষের আত্মাকে উন্মোচন করে মানুষকে তার মুখোমুখী দাঁড় করানোই শিল্পের কাজ। এ সম্পর্কে বার্নাড শ’র মন্তব্য : ‘…art is the magic mirror you make to reflect your invisible dreams in visible pictures. You use a glass-mirror to see your face : you use works of art to see your soul.’ (Back to Methuselah)
সমালোচক নিজে শিল্পী হলেই শিল্পের এ বৃহত্তর ভূমিকা তিনি উপলব্ধি আর ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। শিল্পের শিল্পগত গুণে সমালোচক নিজে সাড়া দিতে পারলেই সেদিকে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করা তাঁর পক্ষে সহজ হয়। বলা বাহুল্য, সমালোচকের এটিই বড় দায়িত্ব। রচনার শৈল্পিক গুণ বা সাফল্যের দিকে অনেক সময় সাধারণ পাঠকের নজর পড়ে না। সমালোচকের নিজের অনুভব-অনুভূতি ও বিচার-বিশ্লেষণ শক্তি যদি সযত্নে অনুশীলিত হয় তা হলেই আলোচনা আর উদ্ধৃতির সাহায্যে তিনি অবহেলিত ও অস্বীকৃত শিল্পকর্মকে পাঠকদের কাছে পরিচিত করে তুলতে পারেন। রচনা-বিশেষ কেন ভালো তার ব্যাখ্যা আর ভাষ্যে তিনি না এগুলেও ক্ষতি নেই–ভালো দিকটা আবিষ্কার করে সেদিকে পাঠককে সজাগ করে তুলতে পারলেই তার কর্তব্য সমাধা হয়। টি. এস, ইলিয়টের মতেও সমালোচকের কাজ হচ্ছে সাহিত্য বা শিল্পবোধ তথা understanding-কে জাগ্রত করা, ভালো-মন্দের রায় দিয়ে গ্রহণ বা বাতিল করা তার দায়িত্ব নয়। মনে হয় ক্লাসিক্স-এর সাথে পরিচয় আর অন্তরঙ্গতা থাকলে সৎ সাহিত্যের আবেদনে সাড়া দেওয়া সমালোচকের পক্ষে হয় সহজ। সমালোচকের জন্য সাড়া দিতে পারাটাই বড় কথা–তিনি নিজে সাড়া দিতে পারলেই না তবে পাঠকের মনেও তিনি সাড়া জাগাতে পারবেন।
অবশ্য শিল্প আর মানুষ দুয়েরই রয়েছে সীমা–সে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার মানুষ নিজের মতামতের সীমায়ও আবদ্ধ। নৈর্ব্যক্তিক হওয়া যতই প্রশংসনীয় হোক–পুরোপুরি নৈর্ব্যক্তিক কেউ হতে পারে না। সাহিত্য-শিল্পে রচিয়তার মতামত aforato 2631 ‘It is impossible to be an impersonal artist in literature, if you are an artist at all.’(M. Murray) কাজেই সমালোচনার ক্ষেত্রেও ব্যক্তি-মনের সীমাবদ্ধতার প্রতি স্বীকৃতি জানিয়েই আমরা নিরপেক্ষতার দাবি জানাবো। তিনি বস্তুনিরপেক্ষ হতে পারেন, আত্মনিরপেক্ষ হবেন কী করে?
সাহিত্যে যাকে critical record বলা হয় আমাদের সাহিত্যের তেমন সমালোচনামূলক ইতিবৃত্ত আজো গড়ে ওঠে নি। এখন অন্তত তার সূচনা হওয়া উচিত। তা না হলে আমাদের সাহিত্যের সঠিক কোনো খতিয়ান পাওয়া যাবে না–ফলে আমাদের সাহিত্যে থেকে যাবে বিভ্রান্তি, এমন কি লেখকেরাও নিজেদের শিল্প-মূল্য সম্বন্ধে থেকে যাবেন অজ্ঞ। খাঁটি সমালোচনায় লেখকেরাও নিজেকে খুঁজে পান–অনেক সময় তেমন রচনায় নিজেকে আবিষ্কার করে বিস্মিতও কম হন না তিনি। সমালোচনা লেখকের জন্যও অত্যাবশ্যক। লেখককে খুঁজে বার করেন, আত্মপ্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন সমালোচক।
