অথচ একদিন সাহিত্যিকই ছিলেন সমাজের বিবেক। সমাজের মানসিক ও নৈতিক স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্ব ছিল তাঁর। আজ তার সেই ভূমিকা নেই। জানি, ভারসাম্যহীন সমাজ-ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। স্বভাবধর্মের তাড়নায় আজ আমরা পদে পদেই সাহিত্যধর্মকে জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হচ্ছি। আজ সামাজিক পরিবেশ ও আবহাওয়া সাহিত্যধর্মের এতই প্রতিকূল যে সাহিত্যিকের পক্ষে আজ সাহিত্যিক হিসেবে বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ভাল সাহিত্য হচ্ছে না, কথাটা মিথ্যা নয়। এই সামাজিক পরিবেশ যেখানে জীবিকার কোনো নিরাপত্তা নেই, শুধু সাহিত্য করে যেখানে দেহ ও প্রাণ এক ঠাঁই রাখার কোনো সম্ভাবনা নেই, যেখানে চারদিকের পরিবেশ মন-মানস ও চরিত্র বিকাশের অনুকূল নয়, সেখানে ভাল সাহিত্য আশা করা যায় কি? বিশেষ করে জীবিকার নিরাপত্তা ছাড়া, সৎ সাহিত্য সৃষ্টির জন্যে যে সর্বাঙ্গীণ স্বাধীনতার দরকার তা কি আসতে পারে? তার অভাবে সাহিত্যিক কি পরিপূর্ণ মুক্তির সঙ্গে, নিজের খেয়াল-খুশিমতো লিখতে ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন? পারেন না বলেই আজ লেখনী আর অশনি নয়–pen is mightier than sword কথাটা আজ তাই নেহাত উপহাসের মতই শোনায়।
[‘সমাজ ও সাহিত্যিক’ ১৯৬১ সালে দুপাতা পত্রিকার প্রথম প্রকাশিত হয়। ঐ বছরই এটি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা গ্রন্থে সংকলিত হয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।]
সমালোচনা
আমাদের সাহিত্যের সমালোচনা শাখা অত্যন্ত দরিদ্র, দুর্বল আর অবৈজ্ঞানিক। সাহিত্য ক্ষেত্রে আমাদের অনেক দুর্বলতা–বিচারবিমুখীনতাও এ সামগ্রিক দুর্বলতারই হয়তো আনুষঙ্গিক। এর পেছনে সঙ্গত কারণ নিশ্চয় আছে। সমালোচনায় আমাদের দেশে শুধু যে বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা শত্রুতায়ও হয় পরিণত। লেখকদের পক্ষে শুক্র বাড়াতে না চাওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই সমালোচনার ক্ষেত্রে ‘সাপও মরুক লাঠিও না ভাঙুক’ এ নীতিই আমরা অনুসরণ করে থাকি। এতে সমালোচনার আসল উদ্দেশ্য যায় ব্যর্থ হয়ে।
সমালোচনা সাহিত্য-পত্রিকার এক বিশেষ অংশ হওয়া উচিত–দুঃখের বিষয় আমাদের কোনো পত্রিকাই সচেতন দায়িত্ববোধের সাথে এ কর্তব্য পুরোপুরি পালন করছে না। হয়তো ইচ্ছা থাকলেও পারছে না পালন করতে। পরিমিত ও গণা লেখকের ওপর নির্ভর করে যেখানে পত্রিকা চালু রাখতে হয় সেখানে স্বভাবতই সম্পাদকরা লেখক হারাতে চায় না। নিয়মিত সমালোচনা বিভাগ চালানোর পথে এও হয়তো এক অন্তরায়। দ্বিতীয়ত, উপযুক্ত সমালোচকের অভাব। প্রচার-প্রকাশের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নতুন নতুন লেখক তৈরি যেমন সম্পাদকের এক দায়িত্ব তেমনি সমালোচক তৈরির দায়িত্বও তার। দায়িতু কথাটা এখানে সাধারণ অর্থে অর্থাৎ সুযোগ-সুবিধা ও তাগাদা দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া অর্থেই ব্যবহার হলো। না হয় আমি জানি–অন্তরে সাহিত্যের অসীম প্রেরণা আর শিল্পের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ না থাকলে কারো পক্ষে সত্যিকার অর্থে লেখক বা সমালোচক হওয়া যায় না। বলা বাহুল্য, সমালোচনাও এক রকম সৃষ্টি। সৃষ্টি কথাটাও শুধু যে বিভ্রান্তিকর তা নয়, তার পরিধি-ব্যাপ্তিও অসীম। বহু নামকরা ও অসন্দিগ্ধ সাহিত্য-স্রষ্টাও যে দেদার সমালোচনা লিখেছেন তা নিরর্থক নয়। তাঁদের সৃষ্টি-প্রেরণাও মাঝে মাঝে সমালোচনায় খুঁজেছে মুক্তি। এমন খাঁটি স্রষ্টা খুব কমই আছেন যিনি সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনায়ও হাত দেন নি। এ যুগে রবীন্দ্রনাথ, টি.এস, ইলিয়ট তার সাক্ষাৎ নজির।
সৃষ্টি আর সমালোচনা হাত ধরাধরি করে না চললে সাহিত্য কিছুতেই সমৃদ্ধ হতে পারে না–এমন কি সৃষ্টি আর সমালোচনার গতি দ্বান্দ্বিক হলেও ক্ষতি নেই। দ্বন্দ্ব দিয়ে থাকে সৃষ্টির নতুন প্রেরণা। সমৃদ্ধ সাহিত্য মানে সমৃদ্ধ সমালোচনাও। এ ক্ষেত্রে ইংরেজি সাহিত্যের তুলনা নেই। পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্য আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে আর সমৃদ্ধতর–এ শুধু ওদের দীর্ঘ ঐতিহ্যের ফল নয়। ওদের সমালোচনা-সাহিত্যও আমাদের তুলনায় অনেক অগ্রসর। গদ্যে ওদের প্রথম স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র একাধারে সমালোচকও ছিলেন। সৎ ও নিষ্ঠাবান অনেক সমালোচক–তার মধ্যে অনেকে মৌলিক রচনায়ও যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, অহরহ ওখানকার সাহিত্যের বিচার ও মূল্যায়ন করছেন। ফলে ওখানে বেশ বলিষ্ঠ এক সমালোচনা সাহিত্যও গড়ে উঠেছে। এ সব সমালোচকের অধিকাংশই অধ্যাপক–এ কোনো ব্যতিক্রম নয়; সব দেশেই সাহিত্যের অধ্যাপকরা পঠন-পাঠনের সাথে সাথে সাহিত্য-সমালোচনার দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকেন। সাহিত্যের গঠন প্রকরণ ও শিল্পমূল্যায়ন তাদের পেশার অন্তর্গত বলে এ দায়িত্ব পালন তাদের পক্ষে, বিশেষ করে পরিশ্রমী অধ্যাপকদের পক্ষে কিছুটা সহজও হয়ে থাকে। শিক্ষা ও সাহিত্যের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যবোধ আমাদের পক্ষে নতুন–আশা করা যায়, কালক্রমে আমাদের অধ্যাপকরাও তাদের এ দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠবেন আর পেশার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের বিচার-বিশ্লেষণকেও অতিরিক্ত একটা নেশায় পরিণত করবেন তারা। অবশ্য সবার পক্ষে যে এ সম্ভব তা নয় কিন্তু যাদের পক্ষে সম্ভব ও যাদের প্রবণতা আর যোগ্যতা রয়েছে তারা এ দায়িত্ব পালনের শ্রম স্বীকার করবেন না কেন?
