চোখ কান মন খোলা রেখে চারদিকে তাকিয়ে দেখলে এমন উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাবার বহু দৃষ্টান্তই দেখতে পাওয়া যাবে। আমাদের কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিভাগীয় অধ্যক্ষের পদ খালি হয়েছিল। পরবর্তী নিম্নতর পদের অধিকারী হিসেবে যিনি ঐ শূন্যপদে কাজ করার হকদার তার সঙ্গে কী ব্যাপারে যেন কর্তৃপক্ষের মন কষাকষি ছিল। তাই স্রেফ তাকে জব্দ করার মতলবে অন্য বিভাগের এক অধ্যক্ষকে এনে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ বিভাগেরও ভার তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে কর্তৃপক্ষের প্রতিহিংসা-বৃত্তি চরিতার্থ হলো বটে কিন্তু মানুষের সাধারণ বুদ্ধি বলে, এ ব্যবস্থায় দুই বিভাগের কোন বিভাগই পুরোপুরি যোগ্যতার সাথে পরিচালিত হতে পারে না। কথায় বলে–রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে উলুখড় প্রাণে মরে। এ দুই বিভাগের ছাত্ররাই সেই উলুখড়। প্রতিদিন ক্ষতি যা হওয়ার তাদেরই হচ্ছে বা হয়েছে। অবাধ ক্ষমতা অনেক সময় এ ভাবে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করতে পেছপাও হয় না। ছাত্ররা আমাদের সমাজের সবচেয়ে সচেতন অংশ। এসব ঘটনা আর দৃশ্য তাদের মনের ওপর কোনো প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করে না–একথা ভাবতে হলে মানব-বুদ্ধিকে অস্বীকার করতে হয়।
যে ভয় ও আতঙ্কের কথা সূচনায় উল্লেখ করেছি তা শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, তার অশুভ থাবা প্রদেশের শিক্ষায়তনগুলিতেও হয়েছে সম্প্রসারিত। Academic freedom তথা জ্ঞানগত স্বাধীনতা বলতে যা বোঝায় তা আজ সর্বত্র অনুপস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরাও এখন আর স্বাধীনভাবে চিন্তার চর্চা করেন না, করলেও প্রকাশ করতে সাহস পান না। এ অবস্থায় দেশে চিন্তাবিদের আর সত্যিকার সংস্কৃতিসেবীর আবির্ভাব সুদূর কল্পনার বাইরে। আমরা প্রায় চল্লিশ বছর আগে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বুদ্ধির মুক্তি নামে একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, আর তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় আর চারপাশের কলেজ আর স্কুলের অধ্যাপক আর শিক্ষকবৃন্দ। আজ কি তেমন কথা ভাবা যায়? নবতর চিন্তার ক্ষেত্রে, যে চিন্তার সঙ্গে ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ইত্যাদির সম্পর্ক রয়েছে তাতে অংশগ্রহণ কিংবা নেতৃত্বদানের কথা বললে অধিকাংশ অধ্যাপক এখন রীতিমতো আঁতকে ওঠেন। অথচ স্বাধীন চিন্তা আর স্বাধীন চিন্তার প্রকাশ ছাড়া কোনো সমাজ, কোনো রাষ্ট্র এবং কোনো সভ্যতাই সামনের দিকে এগুতে পারে না। গ্রিক, রোম আর আরব-সভ্যতার যুগে যাদেরকে ‘স্বাধীন নাগরিক’ বলা হতো, এ অবস্থা আরো কিছুকাল চললে, তেমন স্বাধীন নাগরিক আমাদের দেশে দুর্লভ হয়ে পড়বে। গ্রিক কবি ইউরিপিডিস গোলাম বা দাসের সংজ্ঞা দিয়েছেন এই বলে, ‘A slave is he who cannot speak his thougt.’
আমার আশঙ্কা, দোতলা, চৌতলা কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ি, গাড়ি বা টেলিভিশন ইত্যাদি যাবতীয় আধুনিক সুখ-সম্পদের মালিক হয়েও আমরা দিন দিন মনের দিক দিয়ে দাসে পরিণত হচ্ছি। বলা বাহুল্য, স্বাধীন মনই সব সভ্যতার বাহন আর সবরকম সাংস্কৃতিক উপকরণের নির্মাতা। সে স্বাধীন মনের অধিকার হারানো মানে মনের দিক দিয়ে গোলাম হয়ে যাওয়া। এ দেশে সংস্কৃতিসেবীরা আজ এ দুর্দিনের সম্মুখীন। আরবিতে একটি প্রবাদ আছে, মাছ যখন পচতে আরম্ভ করে পচনটা শুরু হয় মাথা থেকেই। দেশের শাসক-প্রশাসক, উচ্চতম শিক্ষায়তনগুলির কর্মকর্তা, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, আইনজীবী, ডাক্তার, সমাজনেতা, আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ইত্যাদিকে নিয়েই তো সমাজের মাথা–এ মাথা যদি সুস্থ না থাকে, এখানে যদি পচন শুরু হয়, তাহলে মাছের মতো এ পচনও কি সমাজের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে না? এ পচনের মুখে নৈতিক চেতনা, সব রকম মূল্যবোধ ও সুরুচি, যা নিয়ে সভ্যতার ভিত রচিত হয় তা আজ দেশ-ছাড়া হওয়ার উপক্রম। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ছাত্র আর তরুণদের কি আশাবাদী হওয়া সম্ভব?
[‘রাষ্ট্র : সমাজ আর ছাত্র’ প্রবন্ধটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭০-এ সমকালীন চিন্তা গ্রন্থে।]
লেখকের স্বাধীনতা
লেখকের স্বাধীনতা কথাটা এক হিসেবে স্ববিরোধী এবং আমাদের কাছে আজো কিছুটা বিপজ্জনক। স্ববিরোধী এ কারণে যে, আসলে লেখে তো মন, আর মনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ারই তো এক নাম চিন্তা, যা সব লেখার উৎস। সে চিন্তা অত্যন্ত ব্যক্তিক এবং সর্বতোভাবে নিজস্ব। তার ওপর কোনো রকম কর্তৃত্ব অচল। এ এক অতি প্রাচীন আর স্বীকৃত সত্য। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে একজন গ্রিক জ্ঞানী এ সত্যের প্রতি স্বীকৃতি জানিয়ে গেছেন এভাবে: ‘মানুষের নিজস্ব বলতে একমাত্র জিনিস হচ্ছে মনের স্বাধীন চিন্তা। কাজেই আমি মানুষ থাকবো আর স্বাধীন চিন্তাও বিসর্জন দেব এক সঙ্গে তা হয় না। যেমন হয় না সাঁতারও কাটবো অথচ গা ভেজাবো না। এ স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে জীবনের বিকাশ আর মনুষ্যত্বের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। কাজেই যে লেখকের মনুষ্যত্বে বিশ্বাস রয়েছে সে কিছুতেই, কোনো অবস্থাতেই চিন্তার স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে পারে না। দেওয়া মানে লেখক হিসেবে আত্মহত্যা করা।
বিপজ্জনক বলেছি এ কারণে যে, আমরা লেখকরাও কোনো না কোনো দেশের অধিবাসী, কোনো না কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক। রাষ্ট্রশক্তির একটি সাধারণ দুর্বলতা সন্দেহ প্রবণতা, বিশেষ করে মননশীল মানুষকে, সাধারণ অর্থে যাদের বুদ্ধিজীবী বলা হয় তাদের সন্দেহের চোখে দেখা ক্ষমতার একটি স্বভাব। অর্থাৎ যারা লিখে থাকে, নিজের চিন্তাভাবনাকে যারা প্রকাশ করে ভাষায় তাদের প্রতি কিছুটা অবিশ্বাসের চোখে তাকানো। ক্ষমতার যেন এ এক সহজাত প্রবণতা। ক্ষমতার আর একটি দুর্বলতা সুযোগ পেলেই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া। দেখা গেছে, অতি বড় সজ্জনও যখন ক্ষমতার আসনে বসেন তখন মুহূর্তে তিনি হারিয়ে ফেলেন সব রকম পরিমিতিবোধ, তখন সীমা লঙ্ঘন হয়ে দাঁড়ায় তার স্বভাব। এ কারণে জ্ঞানীরা সব সময় ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন এবং কেউ কেউ ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করেছেন। এও দেখা যায়, ক্ষমতা সব সময় ছাপার অক্ষরকেও যেন কিছুটা ভয় করে থাকে। ক্ষমতার এ মনোভাব প্রায়শ সরাসরিভাবে লেখকদের আঘাত হেনে বসে। নীরব কবির মতো নীরব লেখক কথাটাও অর্থহীন–যে নিজের চিন্তাভাবনাকে ভাষায় রূপ দেয় না, আর তা প্রকাশ করে না সে আর যাই হোক লেখক নয়। বোবার যেমন শত্রু নেই, তেমনি এমন তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরও নেই কোনো শত্রু। রাষ্ট্র এদের মনে করে অত্যন্ত ভালো মানুষ, অতি বংশব্দ সৎ নাগরিক। এদের নিয়ে রাষ্ট্র নিশ্চিন্ত। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারীরা চান সারা দেশটা সমতার মরুভূমিতে পরিণত হোক তাদের কাম্য E.M. Forster-এর ভাষায় Desert of uniformity; সবুজের বৈচিত্র্য বা ‘শতপুষ্পে’ তাঁরা আতঙ্কিত।
