ক্ষমতা যদি অপরিণত বুদ্ধি, অপরিপক্ষ মানুষ আর অদূরদর্শীদের হাতে পড়ে তখন মননশীল লেখকদের অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় অধিকতর বিপজ্জনক। এসব ক্ষমতাসীনদের সভ্যতা আর সংস্কৃতি সম্বন্ধে থাকে না কিছুমাত্র স্বচ্ছ ধারণা। সভ্য সমাজজীবন গড়ে তুলতে কী কী বুনিয়াদি উপাদান অত্যাবশ্যক তা জানার আগ্রহ থেকেও এরা বঞ্চিত। ফলে মননশীলতার সব দরজা-জানালা খুলে দিয়ে তাতে দক্ষিণা বায়ু প্রবেশের পথ করে দেওয়ার বদলে এরা বরং উল্টো দরজা জানালায় আগে যেটুকু ফাঁক ছিল তাও ঠেসে বন্ধ করে অর্গল লাগিয়ে দেয়। মননশীল লেখকদের জন্য এ এক শ্বাসরুদ্ধ দশা। বর্তমানে আমাদের দেশের লেখকরা কেমন অবস্থায় বাস করছেন? আমাদের পদক্ষেপ এখন কোন্দিকে? আমরা কি এখন নিজেদের সম্পূর্ণ স্বাধীন বোধ করতে পারছি?
ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে কী দেখতে পাই? আমার বিশ্বাস, লেখকদের পক্ষে এখন এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার সময় এসেছে। দীর্ঘকাল আমরা ইংরেজের অধীন ছিলাম। সে অধীনতার অবসান ঘটেছে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট। কিন্তু ইংরেজ আমলের যে অধীনতা বা বন্দিত্ব তা ছিল অনেকখানি বাহ্যিক বা দৈহিক–সে বন্দিত্ব আমাদের মন-মানসের ওপর তেমন কোনো প্রবল চাপ সৃষ্টি করে নি, রাজনীতির বাইরে তার শাসন ছিল অত্যন্ত শিথিল। ফলে বাংলা সাহিত্যে সব খ্যাতনামা লেখক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কারক আর হিন্দুসমাজে সীমিতভাবে হলেও যারা রেনেসাঁস এনেছিলেন। তাদের সবারই আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে সে যুগে। এমন কি আমাদের বিদ্রোহী কবিরও আবির্ভাব তখন। আর লেখকরা অনায়াসে বেপরোয়া হতে পারতেন। শরৎচন্দ্র এবং আরো অনেকে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বেপরোয়া হওয়া মানে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে স্বাধীন বোধ করা।
পাকিস্তান আমলে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এলো বটে কিন্তু তারপর থেকে শুরু হলো অন্যরকম বন্দিত্ব। এ বন্দিত্ব শুধু দৈহিক ছিল না, ছিল অনেকখানি মানসিকও। এ শেষোক্ত বন্দিতুই আমাদের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল সবচেয়ে মারাত্মক। মানুষের চিন্তা ভাবনার একমাত্র বাহন আর প্রকাশ-মাধ্যম তার মাতৃভাষা, আমাদের সে মাতৃভাষার ওপরই তখন যে শুধু হামলা শুরু হলো তা নয়, নানা রকম বিধিনিষেধের দড়াদড়ি দিয়ে আমাদের সামনে বিষয়বস্তুকেও করে দেওয়া হলো সংকীর্ণ–আমাদের কল্পনার পায়ে বেড়ি পরাবার চেষ্টা চললো অনবরত। তখন এ সংকীর্ণতার আবর্তে পড়ে মরা ছাড়া আমাদের আর কোন গতি রইল না। কল্পনায় অবাধ হতে না পারলে লেখক কিছুতেই লেখক হতে পারেন না। সেদিন আমরা লেখকরা কেউই সত্যিকার অর্থে বেঁচে ছিলাম। আমাদের চিন্তা ভাবনাই আমাদের প্রাণ, আমাদের জীবন–সে চিন্তাভাবনাকে আমাদের পদে পদে গলা টিপে হত্যা করতে হয়েছে। যে কথাটা বোরিস পাস্তেরনাক তার ডক্টর জিভাগো উপন্যাসে বলেছেন, ‘… There is only one thing they really want: you should hate what you like and love what you abhor!’ gay ভালোবাস তাকে ঘৃণা করো আর যা তোমার কাছে ঘৃণ্য তাকেই কিনা তোমাকে বাসতে হবে ভালো। পাকিস্তানের চব্বিশ বছর আমাদেরও তাই করতে হয়েছে। যে শাসক আর শাসনকে আমরা মনে প্রাণে ঘৃণা করতাম অনবরত তারই জিন্দাবাদ দিতে হয়েছে আমাদের লেখকদেরও। আর যে ভাষা যে দেশ আর জাতীয়তাকে আমরা অন্তর দিয়ে ভালোবাসতাম প্রচার করতে হয়েছে অনবরত তারই নিন্দা। এমন অবস্থা দীর্ঘকাল চললে যে-কোনো জাতির মানসিক পঙ্গুত্ব অনিবার্য। সুখের বিষয়, মাত্র চব্বিশ বছরে আমরা এ দুঃসহ শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছি।
এখন আমাদের আর একটি নতুন যুগের শুরু, এখন পা বাড়িয়েছি আমরা নতুন ইতিহাসের দিকে। বলা যায় এখন আমরা পুরোপুরি স্বাধীন–সব রকম বৈদেশিক ও বিজাতীয় প্রভাবমুক্ত। আমরা যা চেয়েছিলাম তা পেয়েছি, যে রাজনৈতিক দলকে আমরা লেখকরাও সর্বান্তঃকরণে সমর্থন জানিয়েছিলাম, পরিণামে সে রাজনৈতিক দল বিজয়ী হয়েছে, যে সরকার আমরা মনেপ্রাণে কামনা করেছিলাম সে সরকারও আমাদের হয়েছে। তবুও আমরা লেখকরা কি পুরোপুরি নিজেদের স্বাধীন বোধ করতে পারছি? আমাদের মনের কথা কি পারছি মনের মতো করে প্রকাশ করতে? লেখা মানে প্রকাশ করা, প্রকাশ ছাড়া লেখার এক কানাকড়ি মূল্যও নেই। লেখা প্রকাশের সব অন্তরায় কি বাংলাদেশের লেখকদের সামনে থেকে দূর হয়েছে এখন? এ প্রশ্নের ‘হাঁ’ উত্তর দিতে পারলে সব চেয়ে খুশি হতাম আমি নিজে। কারণ আমিও তো কায়মনোবাক্যে এ সরকারকেই চেয়েছিলাম। কথাটা আর একটু খোলাসা করা যাক। আজকের দিনে লেখকদের স্বাধীনতার সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। লেখকের চিন্তা-ভাবনা আর বক্তব্যকে বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সর্ব প্রধান বাহন দেশের পত্র-পত্রিকা। স্বাধীনতার পর অবস্থার নানা হেরফেরে জাতীয় পত্রিকার বৃহত্তর অংশের ওপর একভাবে না একভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারি কর্তৃত্ব। বড় বড় সব পত্রিকার প্রশাসক, পরিচালক, সম্পাদক ইত্যাদি সব গুরুত্বপূর্ণ পদে সরকার মনোনীতরাই হয়েছে নিযুক্ত। ইতোপূর্বে এমন কাণ্ড কখনো ঘটে নি।
এভাবে বিভিন্ন পদে যারা নিযুক্ত হয়েছেন বা রয়েছেন ব্যক্তিগতভাবে তারা সবাই হয়তো সজ্জন, যোগ্য এবং দেশপ্রেমিকও কিন্তু যে পদের সঙ্গে নিজের আর পরিবার পরিজনের জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে, সে পদ আঁকড়ে থেকে তারা তো কোনো রকম ঝুঁকি নিতে পারেন না, ইচ্ছা থাকলেও পারেন না। তেমন আশা করাও হয়তো অন্যায়। যে দেশে বুদ্ধিজীবীর জীবিকার ক্ষেত্র অত্যন্ত সংকীর্ণ সেখানে অবস্থা এ না হয়ে যায় না। জীবিকা হারাবার ভয়ে সব সময় তাদের থাকতে হয় সন্ত্রস্ত। ফলে সরকারের মুখের দিকে চেয়েই তাদের লিখতে হয় এবং লেখা ছাপতে হয়। সরকার তো একজন নন–প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়েই তো কোনো সরকার নয়। এঁরা ছাড়া সরকারের বহু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে–যেমন, মন্ত্রীমণ্ডলী, মন্ত্রণালয়ের সচিব, গণপরিষদ সদস্য, যে পার্টি ক্ষমতায় রয়েছে তার বিভিন্ন স্তরের নেতা-উপনেতারা রয়েছেন, সে সঙ্গে সংগঠন কর্তারাও আছেন–কোন লেখায় এদের কার কখন বিরাগভাজন হতে হয়, সাংবাদিকদের এখন অহরহ সে ভেবেই থাকতে হয় তটস্থ। লেখা প্রকাশের বেলায় তাদের সামনে সে বিবেচনাটাই বড় হয়ে দেখা দেয়। লেখার গুণাগুণ নয়, লেখকের বক্তব্য সরকারি মহলে কী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে সুর্ভাবনাই হয়ে দাঁড়ায় এখন তাদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। ফলে ভয়ের চোটে বহু নিরীহ লেখাও তারা ছাপতে পারেন না, ছাপেন না। আমি ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা নিয়েই একথা বলছি।
