নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক কর্মী আর স্বাধীন সংবাদপত্র ছাড়া সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ কিছুতেই গড়ে উঠতে পারে না। পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা আজ প্রায়। এক বছর ধরে বন্ধ। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর না করে সংবাদপত্র শিল্পের টিকে থাকা এক রকম অসম্ভব বললেই চলে। এখন বিজ্ঞাপন যেভাবে ও যে-শর্তে বিতরিত হয় তাতে কোন স্বাধীন সংবাদপত্রের পক্ষেই অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয় আদৌ। ‘সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী আর সে সম্বন্ধে পুরোপুরি সচেতন’–বিভিন্ন সময় সরকারি মুখপাত্ররা এ ধরনের কথা যে বলে থাকেন তার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার এতটুকু সম্পর্কও নেই। তারা যদি কিছুমাত্র আন্তরিক হতেন তাহলে একটা প্রেস বাজেয়াপ্ত করে এক সঙ্গে তিন তিনটা কাগজ বন্ধ করে দিতেন না আর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন নির্দেশ জারি করে আইনের। হুকুমকে নস্যাৎ করে দিতে বোধ করতেন সংকোচ।
আইন তো জড়বস্তু–তার কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নির্ভর করে প্রয়োগকর্তার ওপর। তার যদি আইনের প্রতি আনুগত্য না থাকে তাহলে ইচ্ছামতো তিনি আইনকে দোমড়াতে মোচড়াতে পারেন, এমন কি করে দিতে পারেন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। অবাধ ক্ষমতার এও এক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ফলে আইনের শাসন বলতে যা বোঝায় তা আজ এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এ বিপর্যয় যে কোথায় পৌঁছেছে তার নজির সন্ধানের জন্য দূরে যেতে হয় না। আমাদের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয় বছরে যেসব ঘটনা ঘটেছে আইন সেখানে যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে, ছাত্র আর অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে মামলা করে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় যত অর্থ ব্যয় করেছে যার কোন তুলনা নেই, কারো কারো মতে ওটা নাকি world record! এসব দেখে শুনে রীতিমতো শঙ্কিত হতে হয় দেশের ভবিষ্যৎ ভেবে।
সভ্য মানুষ আর সভ্য সমাজের একমাত্র আশ্রয় তো দেশের আইন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে একজন যোগ্য ও সম্মানিত অধ্যাপক কীভাবে নাজেহাল হয়েছেন সে করুণ ও দুঃসহ সংবাদ অনেকেরই জানা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্রাবাস আর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বার বারে আক্রান্ত হয়েছে। দুঃখের বিষয়, দেশের আইন এসব ব্যাপারে নিজের অস্তিত্বের পরিচয় দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বরং শোনা যায়, আক্রমণকারীদের পরিবর্তে আক্রান্তদের বিরুদ্ধেই নাকি হয়েছে আইনের প্রয়োগ। আইন যদি এভাবে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাবার কৌশলে পরিণত হয় তাহলে সমাজ কোথায় দাঁড়াবে, মজলুম প্রতিকারের আশায় কার মুখের দিকে চাইবে?
সেদিন মনস্তত্ত্ব সম্মেলনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী জিজ্ঞাসা করেছেন, দেশের তরুণরা এমন সিনিক হয়ে পড়েছে কেন?’ সমাজের সার্বিক অবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখলে তিনি তার এ প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতেন। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে, শিক্ষায়তন আর বিচারালয়গুলিতে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে মূল্যবোধের যে চরম অবনতি ও দুরবস্থা। তরুণরা, বিশেষ করে সচেতন ছাত্র সমাজ, প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছে তাতে সিনিক না হয়ে উপায় কী? এসবের প্রভাব তারা এড়াবে কী করে? সমাজের কোথাও সততা, আন্তরিকতা, মহৎ চিন্তা-ভাবনা বা ন্যায়বিচারের ক্ষীণ রেখাও তারা দেখতে পাচ্ছে কি যা দেখে ছাত্র-সমাজ প্রেরণা পাবে, উৎসাহ বোধ করবে কিংবা আশান্বিত হয়ে উঠবে? Amiel Slug 261694, ‘Society rests upon conscience not upon science. Civilization is first and foremost a moral thing’. (Amiel’s Journal, p. 177) বিবেকের চর্চা আর অনুশীলন কি সমাজে কোথাও আছে এখন, না তার কোন মূল্য দিয়ে থাকে সমাজ ও রাষ্ট্র? বিবেকী মানুষের আজ কোনো স্থান নেই সমাজে আর তেমন। মানুষকে রাষ্ট্র মনে করে তার শত্রু। সরকার চায় Yesman, হা-হুজুর, অথবা ভয়ে কাবু হয়ে থাকা নিবীর্য মানুষ। বিবেকের সাথে আইনের শাসন চালাতে গিয়ে কোনো কোনো সুদক্ষ বিচারপতিকে যে সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়েছে, এমন কি পরিণামে পদত্যাগ করতে হয়েছে সে খবরও কারো অজানা নয়।
গ্রিসকে বলা হয় আধুনিক সভ্যতার সূতিকা গৃহ–সে গ্রিসের অধিবাসীদের সম্বন্ধে হেরোডোটাসের মন্তব্য হচ্ছে, ‘They obey only the law.’ শুধু গ্রিসের নয়, সব সভ্যতারই বুনিয়াদ আইন। আর আইনের প্রতি শাসক আর শাসিতের সার্বিক আনুগত্য। সে আইনের লাঞ্ছনা এখন প্রতিনিয়তই ঘটছে আমাদের দেশে। সভ্য জীবনের প্রথম কারিগর শিক্ষক আর শিক্ষাবিদের যেমন আজ কোন সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা নেই, তেমনি সম্মান আর মর্যাদা নেই বিচারক আর বিচারপতিদেরও। শুনেছি মুসলিম শাসনের আমলে বাদশাহের পাশেই থাকতো কাজীউল-কুজ্জাতের আসন। আমাদের বর্তমান। রাষ্ট্রকে ইসলামি তথা মুসলিম রাষ্ট্র বলা হয় তবু এ ইসলামি ঐতিহ্য আজ এখানে। সর্বতোভাবে উপেক্ষিত। এ রাষ্ট্রে এক মহিলার রাজনৈতিক মতামতের জন্য তাঁর স্বামীকে চাকুরি থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে বলে এক খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল কিছুকাল আগে। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব, স্বতন্ত্র পেশা, বৃত্তি ও জীবনযাপন স্বীকৃত! শুধু রাজনৈতিক মতামত নয়, স্বামী-স্ত্রীর ভিন্নতর ধর্মমত পোষণেও ইসলামে আপত্তি নেই। ইসলামি বিয়ের শ্রেষ্ঠত্ব আর স্বাভাবিকতু হচ্ছে এ বিয়ে নর-নারীকে সমান। মানবিক মর্যাদা দিয়ে থাকে। এ বিয়ে স্বামীকে স্ত্রীর আর স্ত্রীকে স্বামীর দাস-দাসীতে পরিণত করে না। আমার বিশ্বাস, স্বামীর ধর্মীয় পাপের জন্য স্ত্রীকে আর স্ত্রীর ধর্মীয় পাপের জন্য স্বামীকে দোজখে পাঠাবার বিধান ইসলামে নেই। স্ত্রীর রাজনৈতিক মতামতের জন্যে স্বামীকেও দণ্ড দেওয়ার বিধান ইসলামি আইনে আছে কিনা সে কথা আমাদের ইসলামি উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরাই বলতে পারবেন ভালো।
