রাষ্ট্র : সমাজ আর ছাত্র
রাষ্ট্র, সমাজ আর ছাত্র–এদের কোনটাই বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্ক-রহিত নয়। মানুষের সমস্ত জীবনটাই এখন এত জটিলসূত্রে জড়িয়ে গেছে যে, ছাত্র-অছাত্র কারো অব্যাহতি নেই তার হাত থেকে। বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোন কিছুকেই বিচ্ছিন্ন করে দেখা বা সে সম্বন্ধে নির্লিপ্ত থাকা আজ কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
কালের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুই বদলে যাচ্ছে, জীবন আর জীবনের সমস্যারও রূপ বদল ঘটছে প্রতি মুহূর্তে। এ কালস্রোতকে উপলব্ধির ওপরই নির্ভর করে জীবন আর জীবনের সমস্যারও সমাধান। যখন তপোবন কিংবা তপস্বী মানুষের স্মৃতিতেও অনুপস্থিত তখন অধ্যয়নং তপঃ কথাটা স্রেফ আত্মপ্রবঞ্চনারই নামান্তর। ছাত্ররাও সমাজের অঙ্গ, সমাজের উৎপন্ন; সমাজের সার্বিক অবস্থা আর পরিবেশ এড়িয়ে যাওয়া অন্যের মতো তাদেরও সাধ্যাতীত। যেমন সাধ্যাতীত গা না ভিজিয়ে সাঁতার কাটা। কেউ ইচ্ছে করে উটপাখি সাজতে চাইলেও সাজা সম্ভব নয় আজ কিছুতেই।
এখন সমাজের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি হয়েছে ক্ষমতা আর দাপটের দৃষ্টিভঙ্গি। ক্ষমতার দর্শনই আজ জাতির সামনে একমাত্র দর্শন–শাসকরা এ দর্শনের এক একজন পির মুরশিদ! ছাত্র-জীবনে তারা কেউই অধ্যয়নকে তপস্যা করে নিয়েছিলেন তার কোন প্রমাণ নেই বরং বিপরীতটাই শোনা যায়। তারা কেউই আমাদের এ পবিত্রভূমিতে আসমান থেকে নাজেল হন নি বা আসেন নি কোন অজ্ঞাত দেশ থেকে। তাদের অতীত ইতিহাস আমাদের অনেকেরই দেখা ও জানা আছে, তবে বলার সাহস নেই। তাদের সম্বন্ধে ভক্তি-ভালোবাসা না থাকলেও ভয়টা সবারই পুরোপুরি আছে। নিজের মাথাটার নিরাপত্তা রক্ষা করে চলাও এক রকম জীব-ধর্ম। তাই অন্যায়-অবিচারের সামনেও আমরা ভয়ে চুপ করে থাকি–এভাবে দিন দিনই আমরা হারিয়ে ফেলছি সত্য বলার সাহস!
এ অবস্থা যদি কোন শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে গৌরবের হয়, আমাদের বর্তমান শাসকেরা নিঃসন্দেহে এ গৌরব দাবি করতে পারে।
তবে এ কথাও সত্য যে, ভয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত শাসন একদিন নিজের মৃত্যু নিজেই ডেকে আনে। দেখা গেছে, ভয় আর আতঙ্ক সব সময় এমন একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়ে থাকে যে, তা কখনো শাসক আর শাসিতের পক্ষে শুভ হয় না। এ প্রসঙ্গে একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কথা স্মরণ করা যেতে পারে : ‘A state founded upon interest and cemented by fear is an ignoble and unsafe construction.’ (Amiel’s Journal, p. 178)
Amiel যে-স্বার্থের কথা বলছেন তার পরিচয় পাওয়া যেত ক্ষমতাসীন আর তাঁদের সন্তানসন্ততিরা, ক্ষমতায় আসার আগে কতখানি সম্পত্তির অধিকারী ছিলেন আর এখন তাঁদের ধনসম্পদের পরিমাণ কত তার একটা তুলনামূলক পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে। কিন্তু তা পাওয়ার উপায় নেই। কেউ পেতে চাইলে, সূত্র জানতে চাওয়ার অপরাধে তার কপালে জুটবে বহু দুর্ভোগ! স্রেফ স্বার্থ আর ভয়ের দ্বারা তালি-দেওয়া রাষ্ট্রের অবস্থা যে তালি-দেওয়া জামা কাপড়ের চেয়ে কিছুমাত্র মজবুত নয়, অবাধ ক্ষমতার মাথায় এ সহজ সত্যটা কিছুতেই ঢুকছে না। শোনা ছিল, যুদ্ধের সময় সর্বাগ্রে সত্যই শহীদ হয়ে থাকে, এখন দেখছি আমাদের রাষ্ট্রে পুরোপুরি শান্তির সময় সত্য প্রতিদিন অত্যন্ত নির্মমভাবে কতল হচ্ছে।
আমাদের ছাত্র-সমাজ প্রতিনিয়ত এ দৃশ্য চোখের সামনে দেখছে আর এর মধ্যেই কাটছে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাল। এর অশুভ প্রভাব তারা এড়াবে কী করে? কোনো কোনো ছাত্র প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-রাজনীতির দিকে তাকালে এর সত্যতা সহজেই বুঝতে পারা যায়।
ক্ষমতার নিজস্ব একটা দুর্বলতা আছে, তাই ক্ষমতাসীনদের যেমন জনগণ কিছুটা ভয়ের চোখে দেখে তেমনি জনগণ সম্পর্কেও তাদের মনে বেশ বড় রকমের আতঙ্ক রয়েছে। এ কারণে অনেক সময় তারা তাদের কথা আর আচরণে ভারসাম্য হারিয়ে বসেন। ক্ষমতার কাছে ক্ষমতা হারানোর চেয়ে বড় আতঙ্ক আর কিছু হতে পারে না–এ আতঙ্কটাই তাদের মুখে বিরোধী দলের প্রতি নির্বিচার নিন্দা আর ভর্ৎসনা হয়ে প্রকাশ পায়। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, ক্ষমতা স্রেফ তাদের জন্যেই হালাল, সুপথ্য আর স্বাস্থ্যপ্রদ; আর বিরোধী দলের জন্য তা বিলকুল হারাম, কুপৃথ্য আর অস্বাস্থ্যকর!
অতীতে সৎ লোকেরা অন্যকে চিনি খেতে বারণ করার আগে নিজেরা চিনি খাওয়া ছেড়ে দিতেন। আমাদের বুজর্গদের ব্যবহার কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য রকম। তারা নিজেরা মুঠোয় মুঠোয় চিনি দেশশুদ্ধ ছেলে-বুড়ো সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাচ্ছেন আর উপদেশ দেওয়ার বেলায় বলছেন–তোমরা চিনির লোভ করো না, চিনি খেয়ো না, খেলে ক্রিমি হয়, অসুখ করে, তখন দেশটাই গোল্লায় যাবে ইত্যাদি! তাঁরা নিজেরা গাছের মগ ডালে চড়ে পাকা পাকা ফল ডান হাতে বাঁ হাতে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছেন–যে-গাছ রোপণে তাঁদের অনেকেরই কোনো হাত ছিল না। আর আজ তারা অন্যদের ধমকাচ্ছেন–খবরদার গাছে চড়ো না, চড়লে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে আর তখন দেশটাই হয়ে যাবে খণ্ড খণ্ড। ক্ষমতার যুক্তি এমনি অদ্ভুত, গল্পের নেকড়ে বাঘের যুক্তিকেও তা হার মানায়।
আমি অন্য এক প্রবন্ধে বলেছি গণতন্ত্র দুই-পা-বিশিষ্ট জীব–এর এক পা সরকার অন্য পা বিরোধী দল। এর এক পা খোঁড়া বা পঙ্গু হলে বা রাখা হলে পঙ্গু করে, তখন সমস্ত রাষ্ট্র-জীবনটাই খোঁড়া না হয়ে পারে না। এখন দেশে সত্য অর্থে কোনো রাজনৈতিক জীবন নেই, সুস্থ স্বাধীন ও সহিষ্ণু রাজনীতি থাকলে, এখনকার ছাত্রদের মধ্য থেকেই সার্থক ও যোগ্য রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক নেতার আবির্ভাব সম্ভব হতো। এখন রাজনীতি একদিকে খোশামোদ-তোষামোদ অন্যদিকে ভয়-ভীতি আর দমনের বস্তু হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় সুস্থ আর স্বাধীন রাজনীতি আশা করা যায় না। বিরোধী দল ছাড়া গণতান্ত্রিক রাজনীতি চলে না, চলতে পারে না, অথচ আমাদের সরকারি মুখপাত্রদের কাছে বিরোধী দল যেন ষাড়ের সামনে লাল শালু। আধুনিক গণতন্ত্রের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে সরকারকে যেমন বলা হয় হিজ বা হার ম্যাজেস্টিস গভর্নমেন্ট তেমনি বিরোধী দলকেও বলা হয় হিজ বা হার ম্যাজেস্টিস অপজিশন। বিরোধী দলের প্রতি এ সসম্মান স্বীকৃতির উপর গণতন্ত্র আর গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করে। এ গণতান্ত্রিক চেতনার অভাবের ফলেই আমাদের দেশে রাজনীতিতে গালাগালি, ধমকানি, হুঁশিয়ারি ইত্যাদির আমদানি আর সেই সঙ্গে বিরোধী দলের মুখপত্র বন্ধ করে দেওয়া আর তার কর্মীদের বিনা বিচারে আটক রাখা।
