যে ধর্ম ইহকালে মানুষকে রক্ষা করতে পারে নি, পারছে না –সে ধর্ম পরকালে মানুষকে রক্ষা করবে এমন অলৌকিক বিশ্বাসে কেউ যদি স্বস্তিবোধ করেন তাতে আপত্তি করার কোনো কারণ নেই; কিন্তু আমার আপত্তি হচ্ছে অলৌকিককে লৌকিক ব্যাপারে টেনে আনায়। বলা বাহুল্য, দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র –এ সবই লৌকিক ব্যাপার।
আর পরলোকে যদি কোনো ‘প্রবেশিকা’ পরীক্ষা হয় তা হলে মানুষের জন্য মনুষ্যত্বের পরীক্ষা না হয়ে ধর্মের তথা ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের পরীক্ষা হবে, তেমন বিশ্বাস মানববুদ্ধির অপমান। ঈশ্বরের অপমান আরও বেশি–কারণ তখন তাকে খাটো করে টেনে এনে বসানো হয় সুপরিচিত গুরুমশায়ের আসনে।
পাকিস্তান-হিন্দুস্থানের আয় দায় অর্থাৎ assets and liabilities ভাগ-বাটোয়ারার সময় আল্লাহ নাকি পাকিস্তানের ভাগেই পড়েছেন। তবে তখন তা আয় না দায় ভালো করে বোঝা যায় নি। এখন বুঝতে পারা যাচ্ছে, পাকিস্তানের এ এক মস্ত বড়ো দায়। দোহাই– কথাটি আমার নয়, আমি মরহুম জাস্টিস কায়ানীর ভাষণ থেকেই চুরি করেছি। প্রমাণ হিসাবে এ প্রসঙ্গে তার শেষ মন্তব্যটাও উদ্ধৃত করছি :
Undoubtedly the Lord God is an asset when the nation is going to run, but in the name of the Lord God, the Beneficent, the Merciful, some of us are apt to develop a narrow pseudo-reli-gious outlook as though the Lord God belonged 10 us only and were not the Lord of the Universe, which is the true meaning of Rabbul Alamin. And that is how He is made a liability.
-Vide : Not the Whole Truth, p.186.
বলা বাহুল্য, এ বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন স্বয়ং পাকিস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। শুধু ভূমিকা নয়–কায়ানীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তিনি। এ liability বা দায় আমাদের শাসনতন্ত্রে শুধু নয়, সমাজের প্রতিত্তরেও অনুপ্রবেশ করে কী রকম আত্মপ্রবঞ্চনা ও বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠেছে, আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তার একটিমাত্র দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি: মাত্র কয়েক বছর আগেকার ঘটনা। পাকিস্তান কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির বার্ষিক সভা। ওই প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সভাপতি চট্টগ্রামের প্রাক্তন কমিশনার মি. এন. এম. খান আই. সি. এস। কী কারণে সেবার তিনি উপস্থিত থাকতে পারেন নি। সভাপতিত্ব করছে সহসভাপতি পূর্ব পাকিস্তানের জনৈক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। সভার কাজ যথারীতি শুরু হয়েছে কিছুদূর এগিয়ে গেছে। হঠাৎ একজন মুসল্লি মোত্তকি সদস্য বলে উঠলেন: স্যার, কোরান তেলাওয়াত হয় নি, কোরান তেলাওয়াতের পর সভার কাজ শুরু হওয়া উচিত।
সভাপতি বেকায়দায় পড়ে ইতস্তত করতে লাগলেন। সভার কাজ শুরু হয়ে গেছে, এখন হাঁ করা মানে কেঁচে গণ্ডূষ করা, না করা তো এক রকম অসম্ভব। কায়ানী সাহেব যে দায়ের কথা বলেছেন সে দায় রক্ষা না করে উপায় নেই। অগত্যা সভাপতি আমতা আমতা করে বললেন : আচ্ছা তেলাওয়াত করুন, আপনিই করুন। কয়েক মিনিটের জন্য কর্মসূচি মূলতবি রেখে তাই করা হল।
পরের বৎসর আবার সে একই প্রতিষ্ঠানের একই বার্ষিক সভা– একই স্থানে উপস্থিত সদস্য — শ্রোতারাও, একই মুসল্লি মোত্তকি সদস্যরাও সদলবলে হাজির। কিন্তু ঘটনাচক্রে এবার স্থায়ী সভাপতি স্বয়ং এন. এম. খান উপস্থিত –তিনিই সভাপতিত্ব করছেন। এন. এম. খান দুর্দান্ত অফিসার— এ খবর সবারই জানা। পরিচিতদের সঙ্গে কুশল জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে তিনি সভার কাজ শুরু করে দিলেন বিনা তেলাওয়াতে, বিনা ভূমিকায়। কেউ টু শব্দটিও করলেন না। সে মুসল্লি মোত্তকি সদস্যটিও কোরান তেলাওয়াতের কথা এবার ভুলে রইলেন বেমালুম। নাচ গানে ভরপুর বিচিত্রানুষ্ঠানও কোরান তেলাওয়াত করে শুরু হতে দেখেছি। অকারণে ধর্মকে কোথায় টেনে আনা হচ্ছে এসব তারই দৃষ্টান্ত।
পাকিস্তানের অন্যতম চিন্তাবিদ মি. এ. কে. ব্রোহী তাঁর ‘Religion and Freedom’ প্রবন্ধটি শেষ করেছেন রবীন্দ্রনাথের এ বিখ্যাত উক্তি দিয়ে : ‘I love God, because he has given me freedom to deny him.’ যে ঈশ্বর বা আল্লাহ গুরুমশায়ের প্রতীক সে ঈশ্বর থেকে এ ঈশ্বরের ধারণা ও উপলব্ধি কি অনেক বড়ো ও মহত্তর নয়? আল্লাহর এ মহত্ত্বের সাক্ষাৎ দৃষ্টান্ত কম্যুনিস্ট দেশগুলি। ওরা তো ঈশ্বর, আল্লাহ, গড কিছুই মানে না। তবুও আল্লাহ তাদের ক্রমোন্নতি আর সুখ সমৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করেছেন অথবা ওই সব দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের দেশ থেকে বেশি তেমন কথা এ যাবত শোনা যায় নি। যদি বলেন ওরা মজাটা টের পাবে পরকালে গিয়ে তাহলে অবশ্যই নিরুত্তর থাকতে হয়।
সব রকম অলৌকিকতার অস্তিত্ব মানুষের ধারণা ও উপলব্ধির ওপর নির্ভরশীল–ঈশ্বর এবং পরকালও। যা কিছু মানুষের ধারণা ও উপলব্ধির বাইরে তা শুধু অস্তিত্বহীন তা নয়, মানুষের জীবনে তার কোনো দামও নেই। যে-ঈশ্বর তাকে সুদ্ধ না মানবার স্বাধীনতা মানুষকে দিয়েছেন, সে ঈশ্বরের conception বা উপলব্ধি মানুষের প্রত্যয় ও আত্মমর্যাদার দিগন্তরেখা যে শুধু অবারিত করে দেয় তা নয়, মানুষকে নবতর চেনা আর জিজ্ঞাসায়ও করে তোলে উদ্বুদ্ধ। এভাবে নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে এলেই মানুষের পক্ষে মনুষ্যত্বের শাসন তথা মানবতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে সহজ। ধর্মের ওপর জোর দিতে গেলেই ঈশ্বরের আবির্ভাব অনিবার্য। আর ঈশ্বর মানে সাম্প্রদায়িক ঈশ্বর–পশ্চিমের বেলায় জাতীয় ঈশ্বর। লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য এক হলেও আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের মতো আল্লাহ, ঈশ্বর এবং গড নিয়েও কারও সঙ্গে কারও মিল নেই, মিল হবেও না। মুসলমানের আল্লাহ আর হিন্দুর ঈশ্বর এক নয়, তেমনি হিন্দুর ঈশ্বর আর খ্রিষ্টানের গডও এক নয়– বুদ্ধ মানুষ হয়েও কোটি কোটি মানুষের আরাধ্য। এভাবে যেখানে মূলের পার্থক্য, সেখানে ব্যাখ্যা আর উপলব্ধিতে তারতম্য ঘটবেই। ফলে আচার-অনুষ্ঠানেও শুধু তারতম্য নয় –বিরোধও অনিবার্য। আর দেখা গেছে, অতি সহজে এ বিরোধ হয়ে ওঠে বারুদ। নীতিহীন, মনুষ্যত্বহীন রাজনীতি এ বারুদে অগ্নিসংযোগ করতে এক মুহূর্তও ইতস্তত করে না। ধর্মীয় তথা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের এটাই তো পটভূমি। কিন্তু মনুষ্যত্বের ব্যাপারে এ বিরোধ ও উপলব্ধির দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্য নেই বলে সহজে ওটাকে মানুষের স্থির মিলনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ করে তোলার দায়িত্ব আমাদের দু’দেশের ও নয়– পৃথিবীর তাবৎ বুদ্ধিজীবীদের বলেই আমার বিশ্বাস।
