আনওয়ারুল কাদীর সাহেব আজ পরলোকে। সাহিত্য সমাজের সূচনায় তিনি ঢাকা কলেজে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। পরে শেষ পর্যন্ত বিভাগীয় স্কুল পরিদর্শক হয়েছিলেন। প্রায় কুড়ি একুশ বছর আগে তিনি আমাদের দুঃখ নাম দিয়ে একটি বই প্রকাশ করেন। সেই বইয়ের বিভিন্ন প্রবন্ধে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, দেশ ও সমাজ সম্বন্ধে তার উদার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। এই প্রবন্ধগুলি মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রভাব ও আবহাওয়ায় রচিত–কাজেই মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা বুদ্ধির মুক্তিবাদীরা যেসব কথা সেদিন বলতে চেয়েছিলেন তার কিছু কিছু তার প্রবন্ধগুলিতে তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় বলা হয়েছে। অবশ্য আবুল হোসেন ও কাজী আবদুল ওদুদের মতো ভাষার জোর ও চিন্তার ব্যাপকতা তার ছিল না।
কোনো চিন্তাই ব্যর্থ নয়। বিশেষ করে যে সব চিন্তায় রয়েছে সত্যানুভূতি ও সত্যকে বলবার নির্ভিকতা। আনওয়ারুল কাদীর সাহেবের বইটি এখন দুষ্প্রাপ্য–এই বই কখনো দ্বিতীয়বার ছাপা হবে কিনা জানি না। তাই তা থেকে কিছু কিছু রচনা এখানে উদ্ধৃত করে পাঠকদের খেদমতে পেশ করতে চাই। এতে তার চিন্তাধারার যেমন পরিচয় মিলবে তেমনি পাওয়া যাবে মুসলিম সাহিত্য সমাজের ভাবাদর্শেরও কিঞ্চিৎ আভাস।
জাতিভেদ প্রথা, হিন্দু মুসলমানের ভেদাভেদ ইত্যাদির ফলে দেশের বৃহত্তর কল্যাণ যেভাবে ব্যাহত হচ্ছে তার আলোচনা করে ওই প্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ আমাদের দুঃখ এই বলে তিনি শেষ করেছেন : ‘এ ছাড়া ধর্মান্ধতা মুসলমানদের মধ্যে এত বেশি যে কোনরূপ স্বাধীন চিন্তার দরজা একেবারে বন্ধ। মুসলমানদের মধ্যে যারা একটু ঘরানা বা উচ্চবংশের বলে দাবি করতে চায়, তারা চাচ্ছে যে, তারা যা বুঝেছে সবাইকে তাই বুঝতে ও মানতে হবে। তা না মানলেই তারা একদম কাফের। আর সব মুসলমান এক ছাঁচে গড়া হবে। খোদা এক, রসুল এক, সব মুসলমানও তাই ঠিক এক ভাবাপন্ন হবে। জগতে দেখতে পাই ফুল ফল গাছ পাতা সব ভিন্ন ভিন্ন রকমের। একই জাতের গোলাপ ফুল তার মধ্যে কত রকমারি। আবার একই গাছের দুটি গোলাপ ফুল এক রকম নয়। দুটি জীবন্ত চলন্ত চেতনাযুক্ত মানুষ এক রকম পাওয়া দায়। আর সমগ্র মুসলমান সমাজের লোকগুলি সব একই রকম হওয়া চাই। হচ্ছে না তবু হওয়াতেই হবে–এই যে দুরাশা এতে খেয়ে সেরেছে মুসলমানকে। লাঠির আঘাতে সব হিন্দু যদি মুসলমান হয়েও যায় তার পরক্ষণেই দেখতে পাওয়া যাবে আবার হিন্দুর বীজ গজিয়ে উঠেছে। আবার সেই দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয়েছে। কী হবে হিন্দুকে মুসলমান করে? মানুষ-মানুষ। দেশের লোক না খেয়ে মরছে; পেটে অন্ন নাই, পরিধানে বস্ত্র নাই। ‘স্ফীতকায় অপমান অক্ষমের বক্ষ হতে রক্ত শুষি করিতেছে পান লক্ষ মুখ দিয়া’–এমন দুর্দশার দিনেও দেশের নেতাদের এইরূপ মনের ভাব। এ ভাব কি চিরস্থায়ী হবে?
স্যার পি.সি. রায় একবার হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা আলোচনা করতে গিয়ে বহু হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে পর হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তার উত্তরে আনওয়ারুল কাদীর সাহেব নেতাদের কথা নামে এক নাতিদীর্ঘ আলোচনা লেখেন। তার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন : ‘স্যার পি. সি. রায় তার এই প্রবন্ধে হিন্দু সমাজের মঙ্গলকে দেশের মঙ্গল বলতে চান। এ সম্বন্ধে ভারতবাসীকে নতুন করে ভাবতে হবে। দেশের মঙ্গল অর্থে দশের মঙ্গল বুঝতে হবে। দশ মানে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সব।’ অন্যত্র : ‘স্যার পি. সি. রায় সম্বন্ধেই এখানে যে কথাটা বলতে চেয়েছি সেটা আমাদের দেশের সব নেতাদের সম্বন্ধে খাটে। দেশের সব নেতাই ‘হিন্দু মুসলমান’ ইত্যাদি কথা এতই ব্যবহার করেন যে, তারা দেশের মঙ্গল চান এ কথা স্বীকার করা যায় না। এঁরা কেউ হিন্দুর মঙ্গল, কেউ মুসলমানের মঙ্গল চান। সাহিত্যে বা বক্তৃতায় হিন্দুর মঙ্গল বা মুসলমানের মঙ্গলের জন্য যখন কোন নেতা বিশেষ আগ্রহ দেখাতে যান বা তার নেতৃত্বের দাবি সপ্রমাণ করতে চান তখন যে বিদ্বেষের বহ্নি জ্বলে ওঠে তাতে পুড়ে মরে উভয়েই। যারা দেশের প্রকৃত নেতা হতে চান তাদের ‘হিন্দু মুসলমান’ এসব কথা বাদ দিয়ে কথা বলতে হবে। সম্প্রদায় বিশেষের নেতা হওয়া এক, আর দেশের সেবা করা অন্য কথা। এ কথা আমাদের বুঝতে ও শিখতে হবে। ‘হিন্দু মুসলমান’ এসব কথার হয়তো নতুন ব্যাখ্যারও দরকার হতে পারে। দেশসেবার পন্থা সম্বন্ধে গতানুগতিকতার অনুসরণ করলে চলবে না। এ সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে হবে।’
এই প্রবন্ধের নিম্নলিখিত মন্তব্যও বেশ অর্থপূর্ণ ও স্মরণীয় :
‘সর্ব বিষয়ে এমন কি ধর্মের বেলায়ও ভারতবাসীকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। আধ্যাত্মিক আহার যোগানই ধর্মের প্রধান কাজ। যে যেভাবে পারে ‘শুদ্ধ’ হয়েই হক বা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেই হ’ক যাতে তার আধ্যাত্মিক ক্ষুধা মিটবে তাই তাকে গ্রহণ করার মতো স্বাধীনতা দিতে হবে। তাতে কারো মনে ব্যথা লাগলে চলবে না, বৈচিত্র্য জগতের নিয়ম। বৈচিত্র্যকে মেনে নিতে হবে।’
‘সামাজিক গলদ’ প্রবন্ধে লেখক বহু কথাই বলেছেন। কথাগুলি অবশ্য অপ্রিয় সত্য। কালের দীর্ঘ ব্যবধানেও তার কথাগুলির অর্থ বা তাৎপর্য কিছুমাত্র কমে নি। তিনি এই প্রবন্ধে লিখেছেন : ‘আমাদের যোগ্য হওয়ার কতগুলি অন্তরায় আজকাল দেখতে পাওয়া যায়। প্রধান অন্তরায় হচ্ছে আমাদের শিক্ষা সম্বন্ধে উদাসীনতা। বাংলার মুসলমান সমাজের বয়স নিতান্ত কম নয়। কিন্তু এই দীর্ঘকালের মধ্যে আমাদের মধ্যে একজন রুশো, একজন পেট্সালট্জী, একজন হারবার্ট স্পেনসার জন্মান নাই। আমাদের সমাজ একজন রাজা রামমোহন, একজন বিদ্যাসাগর, একজন বঙ্কিমচন্দ্র, একজন পিয়ারীচরণ, একজন রামতনু লাহিড়ী, একজন রাজনারায়ণ বসু কি একজন স্যার আশুতোষ তৈরি করতে পারে নি। এর একমাত্র কারণ, আমরা শিক্ষা চাই না, আমরা বিদ্যা চাই না, জ্ঞানের মর্যাদা বুঝি না, সাহিত্যিক, দার্শনিক, ঐতিহাসিক নাই। আমরা দান ভালবাসি তাই আমাদের মধ্যে দাতা আছে এবং দাতা আছে বলেই ভিক্ষুকের অভাব নাই। সেইরূপ আমরা যদি শিক্ষা ভালবাসতাম তবে শিক্ষাদাতা, শিক্ষিতজন ও শিক্ষান্বেষী কোনটির অভাব হত না।’
