এই প্রবন্ধের অন্যত্র লেখক ধর্ম সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে লিখেছেন : ‘বুদ্ধির মুক্তি না হলে ধর্ম শিক্ষা হতে পারে না। ধর্মের আদেশ ও নিষেধ পালন করার জন্য বুদ্ধির দরকার। বুদ্ধির অভাবে আজকাল আমাদের ভিতর প্রকৃত ধর্মভাব লোপ পেয়েছে। এখন গোঁড়ামিই আমাদের ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। … আমাদের এই গোঁড়ামির প্রধান কারণ এই যে, আমরা ধর্মের সব বিধি-নিষেধের কতগুলো সহজ অর্থ করে নিয়েছি।… সহজ অর্থ করার দরুণ আমাদের ধর্মের সার কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই রসুলুল্লাহর নামে দরুদ পড়া, রাসুলুল্লাহর না’আত, মিলাদ শরীফ, ঈদ, বকর ঈদের সময় কিছু ঘটা, আর বক্তৃতায় নামাজ রোজা হজ্ব জাকাত ফেতরা–এগুলির প্রশংসা করা। এগুলির পেছনে যে আরো কিছু থাকতে পারে সে দিকে দৃষ্টি দেবার কোন দরকার সমাজ অনুভব করতে চান না। আমাদের মানুষ হতে হবে–বলবান, জ্ঞানবান, বুদ্ধিবান মানুষ হতে হবে এ কথা আমাদের মনেও হয় না। নামাজ রোজা যদি অর্থশূন্য হয় তবে সে নামাজ রোজায় কতটুকু ক্ষতি বৃদ্ধি? নামাজের এই রূপ সহজ অর্থে গোঁড়া মুসলমান সন্তুষ্ট হতে পারে কিন্তু জগৎ সেই মুসলমানকে শ্রদ্ধার চক্ষে দেখবে না। ফলেও দাঁড়িয়েছে তাই, বর্তমান জগৎ মুসলমানকে কাঁটা মনে করছে। এদিকে এই সহজ অর্থের ফলে মুসলমান নিজেও ধর্মের কোন স্বাদ পাচ্ছে না।’
একদিন মুসলমান সমাজ সর্বত্র করুণা ভিক্ষা করতো—চাইতো সর্বত্র রক্ষা কবচ। সমাজের সেই মনোভাবকে আনওয়ারুল কাদীর সাহেব এইভাবে দিয়েছেন ধিক্কার : ‘এখন আমাদের একমাত্র ভরসা–concession বা সরকারের দান বা অনুগ্রহের উপর। পরের দয়ার দানে প্রকৃত শক্তি অর্জন সম্ভবপর হবে না। পুর কতটুকু দিতে পারে। আর তাতে কি পেট ভরে? আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে চান যে অবস্থা অনুসারে কিছু Special treatment বা বিশেষ ব্যবস্থা দরকার; না হলে চলে না। এমন চলা আমার মতে না চলা অপেক্ষা লজ্জাকর। বহুকাল ধরেই আমরা concession, conces-sion করছি। পেয়েছিও তা কিছু কিছু; কিন্তু অগ্রসর হয়েছি কতটুকু? সরকারের দয়ার (concession) আশায় প্রকৃত মানুষ হওয়ার চেষ্টা আমাদের মধ্যে একদম নাই; থাকতে পারে না। যাদের কনসেশনের দিকে দৃষ্টি তাদের আত্মসম্মান জ্ঞান জন্মাতে পারে না। যাদের আত্মসম্মান জ্ঞান নাই তারা পরপ্রত্যাশী হতে বাধ্য। পর প্রত্যাশীর অন্য নাম ভিক্ষুক। ভিক্ষুক সমাজের লজ্জা, সমাজের বোঝা, উন্নতির কাঁটা। ধনী আত্মীয়ের উপর উদরান্নের জন্য নির্ভর করা যেমন ভিক্ষাবৃত্তিরই নামান্তর, সরকারের দিকে কনসেশনের (দয়ার) জন্য তাকিয়ে থাকাও সেইরূপ ভিক্ষুকতা। আমাদের বিদ্যা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমশীলতা কোনরূপ যোগ্যতা নাই বরং এ সমস্ত বিষয়ে অন্যের চাইতে কম, অথচ সরকারের দয়ার উপর নির্ভর করে শতকরা ৮০ জনের চাকরি চাই–এ ভাবটা যত শীগগির আমাদের মধ্য থেকে দূর করা যায় ততই আমাদের মঙ্গল, প্রতিবেশীর মঙ্গল, জগতের মঙ্গল। নচেৎ আমরা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থাকব। জগৎ অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলছে ও বলবে–ঐ যে সব ভিক্ষুকের দল।’
‘শিক্ষিতা নারীর বিবাহ’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক কথা প্রসঙ্গে লিখেছেন :
‘অনেক নাটক-নভেল-ভক্ত শিক্ষিতা নারীরা অত্যধিক তীব্র সতীত্বের উপাসক হয়ে পড়েন। কবে কোনো একদিন কোনো যুবক একটু স্নেহ দেখিয়ে মনকে আকৃষ্ট করেছিল, সেই স্মৃতিকে মনোমন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে আজীবন কুমারীব্রত অবলম্বন করে সতীত্বের আদর্শ রচনা করবার জন্য নিজেকে কল্পনায় উৎসর্গ করে ফেলেন। এই উৎকট সতীত্ব যে একটা খেয়াল এ সম্বন্ধে শিক্ষিতা নারীদের সচেতন হওয়া দরকার। সংসারে যে যার পথে চলে যায়। এদের উৎকট সতীত্বের মূল্য এঁদের কাছে বেশি, অন্যের কাছে তা না হতেও পারে। প্রত্যেক নারীর নারীত্ব তখনই সার্থক হয়, যখন তিনি বধূরূপে, মাতারূপে প্রীতি বিলিয়ে গৃহে বিরাজ করেন। সতীত্বের উচ্চ আদর্শকে আমি সম্মান করি, তাই বলে মোহকে, খেয়ালকে সম্মান করতে নারাজ।’
আজকের দিনের মত সেদিনও মুসলমান সমাজে উর্দু বাংলার তর্ক ছিল। ‘উর্দু বাংলা তর্ক’ নামক প্রবন্ধে আনওয়ারুল কাদীর সাহেব লিখেছেন : ‘যে সব মুসলমান বাংলা বর্জন করেছেন, উর্দু যাদের মাতৃভাষা, কৃষ্টির দিক দিয়ে তাদেরও বিশেষ কিছু পরিচয় পাওয়া যায় না। অবশ্য উর্দুতে কথা বলতে পারাই একটি কৃষ্টি যদি বলা হয়, তবে স্বতন্ত্র কথা। তা না হলে ভাব (idea) হিসাবে এঁরাও যে এমন কিছু সম্পদশালী তা নিশ্চয় করে বলা চলে না। উর্দু সাহিত্যে এদের কারো কোনো বিশেষ দানের কথা শোনা যায় না। অন্য কোনো ললিতকলায় এঁদের কোনো এমন কিছু উল্লেখযোগ্য দানের নিদর্শন দেখা যায় না।’
এই প্রবন্ধের উপসংহার করেছেন লেখক এই ভাবে : অদৃষ্টের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! এই হতভাগ্য বাঙালি মুসলমানই সবচেয়ে কম খেয়ে, কম পরে সকলের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করে এবং সকলের অসম্মান মাথায় নিয়ে দেশের সকলেরই অন্ন যোগাচ্ছে। তাদেরই মাথা গুণতির ওপর নির্ভর করে মুসলমান জজ ম্যাজিস্ট্রেট হচ্ছেন। কিন্তু এরা যে কী অন্ন খায়, কী জলে তাদের পিপাসা মেটে, কী সুগভীর এদের অশিক্ষা, তা খোঁজ করবার কেউ নেই। গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্র, শ্রাবণের অবিরাম ধারা, মাঘের প্রচণ্ড শীত, সবই এদের গায়ের উপর দিয়ে বয়ে যায়। এদের তণঅশ্রু এদের গণ্ড বেয়ে আপনিই ঝরে পড়ে, মোছাবার কেউ নেই। সুযোগ ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত এরা। তার উপর এই উর্দু ও বাংলা দিয়ে তাদের ভাষাটুকু পর্যন্ত কেড়ে নেবার বন্দোবস্ত, আর তাতে করে এই শ্রেণী বিভাগ। এমনি করে এই সর্বহারাদের সর্বনাশ করা হচ্ছে।’
