সুকবি ও সুগায়ক অধ্যক্ষ সুরেন মৈত্র এই সমাজের বহু অধিবেশনে গেয়েছেন বহু গান। সুবিখ্যাত সাহিত্যিক চারু বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডা. রমেশ মজুমদার যোগ দিয়েছেন এই সভার বহু আলোচনায়। এর এক বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন স্বয়ং শরৎচন্দ্র। তার অভিভাষণে এবার থেকে মুসলিম সমাজ নিয়ে তিনি উপন্যাস লিখবেন। এই সংকল্প জ্ঞাপন করেছিলেন। এর পর দীর্ঘদিন তিনি সুস্থ ছিলেন না। পরে তো মারাও গেলেন।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের’ বার্ষিক মুখপত্রের নাম ছিল শিখা। সাধারণত বার্ষিক সম্মেলনে পঠিত রচনাগুলি দিয়েই শিখার কলেবর ভর্তি করা হত। যতদূর মনে পড়ে শিখার মাত্র পাঁচটি কি ছয়টি সংখ্যাই বেরিয়েছিল। সম্পাদক হিসেবে যার নামই মুদ্রিত হোক না কেন আসল সম্পাদনা করতেন কর্মবীর আবুল হোসেন সাহেব। বেশির ভাগ খরচও বহন করতেন তিনি। শিখার টাইটেল পৃষ্ঠায় একটি ক্ষুদ্র রেখা চিত্র ছিল, শুনেছি তাও এঁকেছিলেন আবুল হোসেন সাহেব। একটি খোলা কোরান শরিফ–মানব বুদ্ধির আলোর স্পর্শে কোরানের বাণী প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে, এই ছিল রেখাচিত্রটির মর্ম। কিন্ত এর একটা কদৰ্থ বের করতে বিরুদ্ধবাদীদের বেগ পেতে হয় নি। তারা এর অর্থ রটালেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের সমর্থকরা কোরানকে পুড়িয়ে ফেলে শুধু মানব বুদ্ধিকেই দাঁড় করাতে চাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, গোড়া থেকেই গোঁড়ারা মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিরোধী ছিল। চিন্তার ক্ষেত্রে কায়েমি স্বার্থের বুনিয়াদ সবচেয়ে শক্ত। এর পর এঁরা রীতিমত বিরুদ্ধতা করতে লাগলেন সাহিত্য সমাজের। ছাত্রদেরও বড় দল সাহিত্য সমাজের বিপক্ষে চলে গেল। মুসলিম হলে মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিবেশন নিষিদ্ধ হল। বাধ্য হয়ে জগন্নাথ হল ও লিটন হলে সভা করতে হল। সমাজ নেতাদের কাছে আবুল হোসেন ও কাজী আবদুল ওদুদকে সাহিত্য সমাজের নেতা হিসেবে জবাবদিহি করতে হল। নবাব বাড়িতে সভা বসল। ইসলাম গেল, মুসলিম সমাজ ডুবল–এ ধরনের একটা মনোভাব বিরুদ্ধ শিবিরে ছড়িয়ে পড়ল। যুক্তি ও বুদ্ধির কাছে হেরে সেদিনকার সমাজনেতারা সাহিত্য সমাজের কোনো কোনো কর্মীর ওপর গায়ের জোর প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করে নি। এর ফলেও কিন্তু সাহিত্য সমাজে ভাঙন ধরে নি। ভাঙন ধরেছিল সাহিত্য সমাজের যারা স্তম্ভ তারা যখন নানা দিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লেন তখন। কাজী আবদুল ওদুদ কলকাতায় বদলি হয়ে গেলেন। আবুল হোসেন সাহেব বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে প্রথমে ঢাকা বারে, পরে কলকাতা হাইকোর্টে যোগ দিলেন। উৎসাহী ও কর্মী ছাত্ররা পাস করে বিশ্ববিদ্যালয় তথা ঢাকা ছেড়ে নানা কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়লেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে একমাত্র সবেধন নীলমণি কাজী মোতাহার হোসেন রইলেন ঢাকায়। মুসলিম সাহিত্য সমাজ উঠে গিয়েছে দীর্ঘকাল; শিখাও বন্ধ হয়ে গেছে তবুও ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের আদর্শ ও মনোভাব একা কাজী মোতাহার হোসেন সাহেবই বহন করে চলেছেন এ যাবৎ। শিখার শেষ সংখ্যার সম্পাদক হিসেবে আমার নাম ছাপা হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে শিখর শিরোদেশে মটো হিসেবে ছাপা হতো : জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের ঢেউ যাদের মনে নাড়া দিয়েছিল আর যারা এই প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের কারো মনে সাম্প্রদায়িক মনোভাব, গোঁড়ামি ও কোনো রকম সঙ্কীর্ণতা কিছুমাত্র রেখাপাত করতে পারে নি। তখনো যেমন পারে নি, পরে সংক্রামক ব্যাধির মত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প যখন সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল তখনো তারা ছিলেন এবং এখনো আছেন সমস্ত সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে। স্বাধীন চিন্তা ও মুক্ত বুদ্ধির চর্চা তারা এখনো অব্যাহত রেখেছেন।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের কর্মযোগী ছিলেন মরহুম আবুল হোসেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সূচনায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমার্সের অধ্যাপক ছিলেন। ভাবযোগী ছিলেন। কাজী আবদুল ওদুদ—’শাশ্বতবঙ্গ ও কবিগুরু গ্যেটে’ যার অমর কীর্তি এবং ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’র সম্পাদক হিসেবে যিনি সম্প্রতি উভয় বঙ্গের সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তখন তিনি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক।
যাঁরা জাত সাহিত্যিক নন এই ঢেউয়ের ধাক্কায় তারাও অনেকে সেদিন চিন্তা করতে শুরু করেছিলেন, লিখতে কলম তুলে নিয়েছিলেন হাতে। তাদের মধ্যে কাজী আনওয়ারুল কাদীর ও কাজী মোতাহার হোসেনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আগেই বলেছি, মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা বুদ্ধির মুক্তিবাদীদের ভাবাদর্শ ও ঐতিহ্য ঢাকায় এখনো মোতাহার হোসেন সাহেব একাই বহন করছেন। এখনো সেখানকার যতসব উদার ও প্রগতিশীলদের যে সব অনুষ্ঠান হয় তাতে অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবেই তাকে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি এ যাবৎ সঞ্চরণ নামে একটি মাত্র প্রবন্ধের বই বের করেছেন। পরে অবশ্য তাঁর বহু প্রবন্ধ, অভিভাষণ ও বক্তৃতা নানা সাময়িক কাগজে বেরিয়েছে। দুঃখের বিষয় সেই সব এখনো সংকলিত হয় নি। হলে তার চিন্তার পরিধি, ভাব ও ভাষার সারল্য ও প্রাঞ্জলতা, সর্বোপরি তার মুক্ত-বুদ্ধির পরিচয় লাভ সহজ হতো।
