যে পাঁচটি কাগজের পাঁচজন সম্পাদক আমার লেখাটি ছাপাতে অস্বীকার করেছেন, তারা কেউই গোঁড়া বা দক্ষিণ-পন্থী নন এবং তাঁরা সাহিত্য-শিল্পে প্রগতি ও চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। অন্তত তাঁদের কাগজ পড়লে তাই মনে হয়। পাঁচটি কাগজের চারটি জীবিত বলে তাই নাম উল্লেখ থেকে বিরত রইলাম। আমার সেই ‘প্রত্যাখ্যাত’ কমবক্ত লেখাটির নাম হচ্ছে : ‘ঈশ্বর : শয়তান ও মানব সভ্যতার রূপান্তর’। লেখাটিতে যে রাজনীতির কোনো রকম গন্ধ নেই, তা নামেই প্রকাশ। প্রবন্ধটিতে পাকিস্তান বা ইসলাম সম্বন্ধেও কোন উল্লেখ নেই। শুনেছিলাম রাজনীতি, পাকিস্তান আর ইসলাম–এই তিনটি এড়িয়ে যেতে পারলেই যাই লেখা হোক আর যাই বলা হোক ইবলিশেরও সাধ্য নেই গায়ে হাত দেয়। আমি আমার উক্ত রচনায় ঐ তিনটি বিষয়ে কোনো উল্লেখই করি নি। তবে হ্যাঁ, ইবলিশ বা শয়তান আমার ঐ রচনার অনেক অংশ যে জুড়ে আছে তা সত্য। রচনাটার সূচনাও শয়তানকে নিয়ে। লেবাননের আরবি লেখক খলিল জিব্রানের ‘শয়তান’ নামে একটি লেখা আছে। ঐ লেখাটির সংক্ষিপ্তসার নিয়েই আমি আমার লেখাটি শুরু করেছিলাম। লেখাতে মোটামুটি আমি বলতে চেয়েছিলাম, শয়তান না থাকলে ঈশ্বরও থাকবে না; ঈশ্বর না থাকলে শয়তানের থাকারও কোন মানে হয় না। এরা একে অপরের পরিপূরক। এই দুই না থাকলে মানব সভ্যতার বদল অনিবার্য। আমার সমস্ত রচনাটির এ হচ্ছে প্রদিপাদ্য ও মূল কথা। পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এ শুধু একটুখানি চিন্তার খেলা। খানিকটা free thinking-এর চর্চা, তার বেশি কিছু নয়। কারো পাকা ধানে মই দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত লেখাটিতে নেই। ঈশ্বর আছেন, শয়তান আছে অতি উত্তম, অতি ভালো কথা। এরা নেই, এরা না থাকলে পৃথিবীর বা। সমাজের চেহারাটা কেমন হতে পারে এ সম্বন্ধে আমি শিল্পী, আমি সাহিত্যিক, আমি কবি, একটু কল্পনা করতে পারব না কেন? দেখি না আমার কল্পনা আমাকে কোথায় নিয়ে যায়! এ দুঃসাহসটুকুও কি নিষিদ্ধ? আমার কল্পনা ভুল হতে পারে, হতে পারে ভ্রান্ত। কিন্তু তাই বলে আমি কি কল্পনা করতেও সাহস করব না? চিন্তা করতেও ভুলে যাব? শিল্পী-সাহিত্যিকের চিন্তা তো শুধু বাধা সড়ক ধরে চলে না? চললে খাঁটি শিল্পও কি নীরস ধর্ম কাহিনী হয়ে উঠবে না?
চোখের সামনে সূর্যটাকে দেখতে পাচ্ছি–এ এক অনিবার্য সত্য, কিন্তু সূর্য নেই, না থাকলে পৃথিবীর চেহারাটা কেমন হতে পারে এই দুঃসাহসিক কল্পনাটুকু আমি করতে পারব না কেন? অনভ্যস্ত পথে, নিষিদ্ধ সড়কে কল্পনা রথের সারথি হওয়ার যে আনন্দ শিল্পী তার লোভ তো ছাড়তে পারে না। শয়তান বা ঈশ্বর সম্বন্ধে রাষ্ট্র তো কখনো এ কথা বলে নি–Thus far, no further। তবুও পাঁচ পাঁচটা বিজ্ঞ সম্পাদক আমার আলোচ্য রচনাটা ছাপাতে অস্বীকার করেছেন! এ কি বনের বাঘের ভয়ে না মনের বাঘের ভয়ে? রচনাটা কোনো রাষ্ট্রীয় বিধির আওতায় পড়ে বলে তো মনে হয় না।
আমি তো শুধু আমার ঐ রচনায় আমার মনের ভেতর একটুখানি free হতে চেয়েছি মাত্র এবং প্রচলিত সংস্কারের বন্ধন ছিঁড়ে তাকে ভাষায় রূপ দিতে চেয়েছি শুধু।
আমি স্বাধীন চিন্তায় বিশ্বাসী। চিন্তা ভুল হতে পারে; কিন্তু আন্তরিক চিন্তা কখনো মূল্যহীন হতে পারে না। সব রকম স্বাধীন চিন্তাই লেখক ও পাঠক উভয়ের মনের দিগন্ত খুলে দেয়। মনের বন্ধনের চেয়ে বড় বন্ধন আর নেই। সে বন্ধন কাটার প্রধান হাতিয়ার। চিন্তা। এ বিষয়ে রোমা রোলার বিখ্যাত মন্তব্য স্মরণীয়—’Every honest idea, even when it is mistaken, is sacred and divine.’
সব রকম চিন্তা চর্চারই তো ফসল ভাব, আইডিয়া, আদর্শ। আইডিয়া তথা ভাব সম্বন্ধে জর্জ ক্লিমেন্সের মন্তব্য—’The thing that gives people courage is idea.’
লেখকরা যদি স্বাধীন চিন্তায় বাধা পান, যে সব রচনায় স্বাধীন চিন্তার কিছু গন্ধ। রয়েছে, সম্পাদকেরা যদি বনের বাঘের কি মনের বাঘের ভয়ে তা ছাপতে অস্বীকার করেন, তা হলে অচিরে লেখকরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতেই ভুলে যাবেন। লেখকরা ভুলে যাওয়া মানে জাতি ভুলে যাওয়া। যে জাতির মনে আইডিয়ার অর্থাৎ নব নব ভাবের অগ্নিস্পর্শ ঘটে না, তার ভীরু ও নিবীর্য হয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে না।
[‘বনের বাঘ বনাম মনের বাঘ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৫-র সালে দৈনিক সংবাদে। প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবন গ্রন্থে।]
বুদ্ধির মুক্তি
ইংরেজি ১৯২৬ সাল। তখন ঢাকায় একটি ঢেউ উঠেছিল। চিন্তার ক্ষেত্রে, ভাবের ক্ষেত্রে, আদর্শের ক্ষেত্রে এই ঢেউ বেশ নাড়া দিয়েছিল তখনকার মুসলিম তরুণদের মনে। জিজ্ঞাসু ও কিছুটা সচেতন প্রবীণরাও এই ঢেউয়ের ধাক্কা এড়াতে পারেন নি। দেশ, ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্য সম্বন্ধে গতানুগতিক চিন্তাধারা বাদ দিয়ে একটু নতুন করে, পরীক্ষা ও বিচারের দৃষ্টি দিয়ে দেখার প্রেরণাই ছিল এই ঢেউয়ের লক্ষ্য। এই ঢেউ নাম নিয়েছিল–‘ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। বলা বাহুল্য, ‘ঢাকা’ বা ‘মুসলিম’ বিশেষণ দুটির বিশেষ সার্থকতা ছিল না। কর্মক্ষেত্রের একটা স্থানীয় পরিচয় দরকার বলেই এর নামের পূর্বে ঢাকা না লিখে উপায় ছিল না। না হয় এই ঢেউয়ের প্রভাব ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এর বিভিন্ন অধিবেশনে ঢাকার বাইরের বহু সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল সুধীও যোগ দিয়েছেন। একাধিক অধিবেশনের উদ্বোধন সঙ্গীত গেয়েছেন নজরুল ইসলাম। তাঁর সুবিখ্যাত ‘ভোরের সানাই’ গানটি বিশেষভাবে এই সমাজের এক বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষেই রচিত। কলকাতা থেকে ঢাকার পথে রেলে ও জাহাজে বসে লেখা। খাতা দেখেই সেদিন গানটি তিনি তার স্বাভাবিক উদাত্ত কণ্ঠে গেয়েছিলেন মনে পড়ে। প্রাচীন মুসলিম হলের কোথাও তিল ধারণের স্থান নেই–কবি কণ্ঠের এই গান সেদিন যে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উল্লাসের সঞ্চার করেছিল তার তুলনা বিরল। মুসলিম সমাজ ও তার নানা সমস্যাই এই সমাজের প্রধান আলোচ্য ছিল বটে কিন্তু বহু সুধী অমুসলিমও এই সমাজের প্রত্যেক অধিবেশনে যোগ দিতেন, প্রবন্ধ পড়তেন, আলোচনায় অংশ গ্রহণ করতেন।
