মরুদ্যানগুলোর মাঝের এলাকা একেবারে বিরান নয়। ইউরোপান সাগর আর পার্থিব সমুদ্রের মাছের মধ্যে অনেক পার্থক্য। তাদের কোনো ফুলকা নেই, কারণ অক্সিজেনের নাম-নিশানাও পাওয়া যাবে না বরফের নিচের এ সাগরে। পৃথিবীর জিওথার্মাল ভেন্টের মতো এরাও সালফার-যৌগ-নির্ভর প্রাণি।
সবার চোখ ছিল না। খুব কম দেখা যায়। এত গভীরে আলোর কোনো চিহ্ন নেই। তাই চোখেরও প্রশ্ন ওঠে না। শুধু উন্নত ধরনের জীবেরা সঙ্গী বা শিকারের খোঁজে মৃদু আলোর রেখা দেখায়।
ভিতরের উদ্গিরণ সব সময় থাকবে না, আস্তে আস্তে জোয়ারের টানও কমে আসছে। বুদ্ধিমত্তার উন্মেষ ঘটলেও তারা ফাঁদের বাইরে বেরুতে পারত না। জীবন আটকে পড়েছে বরফ আর আগুনের মাঝামাঝি।
কোন অলৌকিকের ছোঁয়া না পেলে টিকে থাকার উপায় নেই।
লুসিফার সেই অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে ছাড়ল।
২৬. জিয়াংভিল
শেষ মুহূর্তে সমুদ্রের উপর দিয়ে চলতে থাকে সে, মাত্র একশ কিলোমিটার গতিতে। তীরে এসে তরী ডুবে কিনা তাই নিয়ে চিন্তিত পোল। কিন্তু কিছুই হল না। এমনকি কালো, নিষিদ্ধ দেয়ালের উপর দিয়ে যাবার সময়ও কিছু হয় না।
স্বাভাবিকভাবে এর নাম দেয়া হয়েছিল ইউরোপান মনোলিথ। চাঁদ বা পৃথিবীর মনোলিধের মতো এটা দাঁড়িয়ে নেই। দেয়ালের মতো করে শোয়ানো। লম্বায় বিশ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি। টি এম এ-জিরো ও টি এম এ-ওয়ানের তুলনায় বিলিয়ন গুণ বড় হলেও অনুপাতে কোনো ভুল নেই। ১:৪:৯। হাজার বছর ধরে এ মৌলিক অনুপাত নিয়ে মানুষ প্রাণপাত করেছে।
মাটি থেকে উচ্চতায় প্রায় দশ কিলোমিটার হওয়ায় এটা জিয়াহুভ্যালিকে গ্যালিলি সাগরের দুর্দান্ত জলরাশির হাত থেকে রক্ষা করে। রক্ষা করে মাতাল বাতাসের হাত থেকে। এখন সাগর আর তেমন সর্বগ্রাসী নয়, কিন্তু লুসিফারের জন্মের পর পর, নতুন ইউরোপার আবহাওয়া অস্থির থাকার সময় বছরের পর বছর ধরে এ ভূমি সাগর থেকে উঠে আসা প্রাণের অনুকূলে ছিল না।
প্রায় সর্বজয়ী মহাকাশচারী ফ্যাৰু পোল স্বচক্ষে কখনো কোনো টি এম এ দেখেনি। যখন সে বৃহস্পতির পথে পা বাড়ায় তখনো চাঁদের বুকের টি এম এ ওয়ান ছিল টপ সিক্রেট, সেটার কথা জানত শুধু ডিসকভারিতে শীতস্তম্ভে ঘুমিয়ে থাকা অভিযাত্রীরা, সে বা ডেভ বোম্যান, যে দুজন জেগে ছিল, তারা জানত না। পরে যখন বোম্যান তখনকার বৃহস্পতির বাইরে পাক খেতে থাকা বৃহস্পতিয় টি এম এর দেখা পায়, (লিওনভের যাত্রিরা পরে, দু হাজার দশ সালে যার নাম দিয়েছিল বিগ ব্রাদার) ততদিনে পোল চলে গেছে ডিসকভারির বাইরে, মৃত অবস্থায় চলে যাচ্ছে শনির দিকে। কয়েক শতাব্দি পর, পৃথিবীর বুকে আবিস্কৃত হল টি এম এ জিরো। ফিরে এল পোল, কিন্তু হাজার বছর জমে থাকার কারণে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ সহ্য করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই পৃথিবীর এত কাছে থাকা সত্ত্বেও দেখতে পায়নি পৃথিবীর বিস্ময়কে। এই প্রথম, সে কোনো টি এম এ দেখছে। দেখছে অচিন মহাকাশচারীদের বানানো বিস্ময়-বস্তু।
টি এম এ নিয়ে কম পাগলাটে তত্ত্ব আসেনি। এক মতবাদ অনুসারে, সত্যিকার মনোলিথ আছে মাত্র একটা, বাকিগুলোর আকার আকৃতি যেমনি হোক না কেন, সেগুলো শুধু প্রথমটার ইমেজ প্রজেকশন। মহাপ্রাচীরের মসৃণ, দাগহীন, চিত্রহীন, মিষকালো আকৃতি দেখতে দেখতে স্থাণুর মতো হয়ে যায় সে। এত শতাব্দির ধকল পেরিয়ে এসে এখনো এটা চিরযুবা। যেন ইউন্ডোক্লিনারের বাহিনী সব সময় প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে ধুয়ে মুছে যত্ন করে পালিশ করে রেখেছে।
টি এম এ-ওয়ান আর জিরো দেখতে আসা সব মানুষের মতো তার মনেও একই অনুভূতি জন্মে। একবার ছুঁয়ে দেখতে হবে। কেউ কখনো পারেনি। তবু একবার দেখতে হবে। আঙুল, হিরার ছুরি, লেজার- সব ফস্কে ফস্কে যায় এখানে। কোনো চিহ্ন পড়ে না। অথবা, আরেক বিখ্যাত থিওরি মেনে নিতে হয়- এগুলো এ ব্রহ্মান্ডের বস্তু নয়। এক বিন্দুও ছুঁয়ে দেখা যাবে না।
একবার ধীর গতিতে সে পাক খায় গ্রেট ওয়ালের চারপাশে। এরপর, এখনো ম্যানুয়াল কন্ট্রোলে রেখে, জিয়াংভিলের প্রাক্তসীমায় নামানোর চেষ্টা করে শাটলটাকে। অটো কন্ট্রোল রাখতে সাহস হয় না। গ্যানিমিড যদি উদ্ধারের চেষ্টা করে তাহলে সব ভেস্তে যাবে।
সামনে, ফ্যালকনের ল, প্যানারমিক জানালা দিয়ে তাকায় সে। গ্যানিমিডে বসে বসে এ চিত্র অনেকবার দেখেছে। কখনো ভাবেনি সত্যি সত্যি এসে পড়বে। মনে হচ্ছে ইউরোপাদের নগরবিদ্যার কোনো ধারণা নেই। ধার ধারে না তারা সেসবের। ইগলুর মতো ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে শত শত। মোটামুটি এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়ানো। কোনো কোনোটা এত ছোট যে বাচ্চা ছেলেমেয়েরাও অস্বস্তি বোধ করবে। কোনো কোনোটা বড়সড় পরিবার ধরে রাখতে পারবে। উচ্চতা পাঁচ মিটারের বেশি নয়।
সবগুলো এক জিনিস দিয়েই তৈরি। দুই সূর্যের আলোয় সাত দিনে ভূতুড়ে সাদা দেখায় সেগুলোকে। মেরুদেশে এস্কিমোরা জমে যাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য জমাট জিনিসই বেছে নিয়েছিল, ইউরোপানরাও তাদের ইগলুর জন্য একই জিনিসের আশ্রয় নেয়। বরফ।
কোন পথ নেই, রাস্তা নেই। আছে খাল। এখানকার প্রাণিরা এখনো আংশিক উভচর। সম্ভবত ঘুমানোর জন্য পানিতে ফিরে যায়। হয়ত খাবার জন্য, একত্রিত হবার জন্য সেখানেই যেতে হয় তাদের। এর চেয়ে ভাল কোনো হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায়নি।
