জিয়াংভিলকে বরফঘেরা ভেনিস নামে ডাকে অনেকে। একটাই অমিল, আশপাশে কোনো ভেনেশিয়ানের চিহ্ন নেই। যেন এ নগরী প্রাণহীন অনেক বছর ধরে।
আরো এক রহস্য ধরা দেয় এখানে লুসিফার দূরের সূর্যের তুলনায় পঞ্চাশগুণ উজ্জ্বল হলেও, আকাশের এক কোণায় সব সময় প্রতাপ নিয়ে টিকে থাকলেও ইউরোপারা দিন আর রাতের চক্রকে অনেক মূল্য দেয়। আংশিক দিন-রাত হওয়ার এলাকায় সূর্যাস্তের সময় নেমে যায় সমুদ্রে, তারপর সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ফিরে আসে। অথচ আলোর উজ্জ্বলতা মাত্র কয়েক শতাংশ বাড়ে-কমে। পৃথিবীর অনেক প্রাণির মতোই তারা, সেখানেও অনেক প্রাণি চাঁদের উপর নির্ভ করে, তাদের দৈহিক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রিত হয় চাঁদ দ্বারা, দোর্দণ্ডপ্রতাপ সূর্য সেখানে সামান্য এক নিয়ামক।
এক ঘন্টার মধ্যে সূর্যোদয় হবে। ফিরে আসবে ইউরোপারা। আলসে ভঙ্গিতে দৈনন্দিন কাজে নেমে পড়বে। ইউরোপার সালফার ভিত্তিক জৈবরসায়ন পৃথিবীর বিশাল ক্ষেত্রে জন্ম নেয়া অক্সিজেন ভিত্তিক জীববিজ্ঞানের সাথে মিলবে না। এমনকি ধীর গতির একটা সুথও ইউনোপাদের ভড়কে দিতে পারবে, কারণ তাদের কাছে সেটাও ভয়ঙ্কর। খবরটা ভাল হলেও, খারাপ দিক আছে, যে কোনো যোগাযোগের চেষ্টা কষ্টকর হবে, সন্দেহ নেই।
সময় এসেছে, এবার গ্যানিমিডে রিপোর্ট করা যায়। তারা নিশ্চয়ই অকূল পাথারে পড়েছে- এখন ষড়যন্ত্রের আরেক মন্ত্রণাদাতা ক্যাপ্টেন চ্যান্ডলার কী করে সামলায় তা দেখতে হবে।
ফ্যালকন কলিং গ্যানিমিড। আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, আমি- মানে আমাকে টেনে আনা হয়েছে জিয়াংভিলের উপরে। কোনো সহিংসতার চিহ্ন নেই। এখনো এখানে সৌররাত। ইউরোপারা পানির নিচে। মাটিতে নামার সাথে সাথে কল করব।
দিম নিশ্চয়ই পোলকে নিয়ে গর্বিত হবে, কারণ সে ম্যানুয়াল কন্ট্রোলে থেকেও বরফের উপর আলতো করে নামতে পেরেছে। এখন ফ্যালকনকে রাখতে হবে এভাবে, যেন ওজনের কারণে বরফ ভেঙে পড়ে না যায়, আবার একটু উড্ডীন থাকার কারণে বাতাসে ভেসে না যায়। সে সমস্যাও মিটে গেল।
সে এখন ইউরোপার বুকে। হাজার বছরে প্রথম মানব। আর্মস্ট্রং আর অনি কি এমনি অনুভব করেছিল ঈগল চাঁদের বুকে নামার পর? সম্ভবত তারা তাদের যানের প্রাচীণ ও নির্বোধ অংশগুলো খতিয়ে দেখার কাজে বিডোর ছিল।
এসব কাজের ভার ফ্যালকনের উপর। ইঞ্জিনের প্রায় অক্ষত গুঞ্জন ছাড়া পুরো কেবিন স্তব্ধ। হঠাৎ চ্যান্ডলারের রেকর্ড করা কণ্ঠস্বর সচকিত করে দেয় তাকে।
‘তাহলে পারলে শেষ পর্যন্ত। কগ্রাচুলেশন্স! তুমিতো জান, আগামি সপ্তাহে আবার উড়ছি। সে পর্যন্ত সময় দেয়া যায়।
‘পাঁচদিন পর, ফ্যালকন জানে কী করতে হবে। সে বাসায় ফিরে আসবে, তোমাকে নিয়ে, অথবা তোমাকে ছাড়াই। গুডলাক।’
মিস প্রিঙ্গল
এ্যাক্টিভেট ক্রিপ্টো প্রোগ্রাম
স্টোর
হ্যালো, দিম- মেসেজের জন্য ধন্যবাদ। এ প্রোগ্রাম ব্যবহার করার জন্য একটু খারাপ লাগছে। আমার জন্মের আগে দারুণ জনপ্রিয় সব স্পাই থ্রিলারের গোপন মিশনে আমি যেন এক গুচর। এখনো আমি কিছু প্রাইভেসি রাখব, ব্যাপারটা খুব দরকার। আশা করি মিস প্রিন্সল ঠিকমত ডাউনলোড করেছে. অবশ্যই, মিস পি, আমি ঠাট্টা করছি।
বাই দ্য ওয়ে, সারা সৌরজগতের নিউজ মিডিয়ার কল্যাণে জেরবার হয়ে যাব একটু পরই। তাদের সবাইকে ডক্টর টেডের কাছে ডাইভার্ট করে দাও, সে বেশ উপভোগ করবে ব্যাপারটা….
গ্যানিমিড ক্যামেরায় সব দেখছে। কী হয় না হয় সেসব বলে আর দম নষ্ট করছি না। নাটকের আসল দৃশ্য অভিনয় হবে আর একটু পরই। ইউরোপারা উঠে আসবে। আমাকে এখানে শান্তিতে বসে থাকতে দেখবে। তারপর দেখা যাবে আমাদের অভিযানটা ভুল ছিল, নাকি সঠিক…
যাই ঘটুক, হাজার বছর আগে আসা ডক্টর চ্যাং আর তার কলিগদের মতো বিমূঢ় হয়ে যাব না মোটেও! গ্যানিমিড ছাড়ার আগ মুহূর্তে তার সেই বিখ্যাত মেসেটা আবার চালিয়েছিলাম। সত্যি বলতে কী, তখনি আমার মাথায় বোমা পড়েছিল, ভাবতে বসেছিলাম আবার তেমন কিছু দেখতে হয় কিনা… বেচারা চ্যাং যেভাবে নিজেকে অমর করেছিল সেভাবে আমার অমর হবার কোনো শখ নেই… ।
অবশ্যই, অঘটন ঘটতে নিলে আমি পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলব… দারুণ একটা চিন্তা এইমাত্র মাথায় এল… কে জানে, ইউরোপাদের কোনো ইতিহাস আছে কিনা যে কোনো ধরনের রেকর্ড হতে পারে… এখান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার নিচে হাজার বছর আগে কী হচ্ছিল তার কোনো স্মৃতি থাকলে ব্যাপারটা দারুণ হয়, তাই না?
২৭. শূন্যতায় জমাট জল
‘…দিস ইজ ডক্টর চ্যাং কলিং ফ্রম ইউরোপা, আশা করি আপনারা আমাকে শুনতে পাচ্ছেন, বিশেষত ডক্টর ফ্লয়েড- আশা করি শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা… জানি আপনি লিওনভে… বেশি সময় নেই হয়ত… আমার স্যুট এন্টেনা দেখে মনে হয়…’
‘…প্লিজ এ তথ্য পৃথিবীতে রিলে করবেন। জিয়াং তিন ঘন্টা আগে ধ্বংস হয়ে গেছে। একমাত্র আমিই জীবিত। আমার স্যুট রেডিও ব্যবহার করছি জানি না এটার যথেষ্ট রেঞ্জ আছে কি না কিন্তু এটাই একমাত্র সুযোগ। প্লিজ, মনোযোগ দিয়ে নুন। ইউরোপায় জীবন আছে। আমি আবার বলি, ইউরোপার জীবনের অস্তিত্ব আছে…’
‘…স্থানীয় মধ্যরাতের ঠিক পরে। আমরা নিয়মিত পাম্প করছিলাম। প্রায় অর্ধেক ভরে গেছে ট্যাংকগুলো। ডক্টর লি আর আমি পাইপ ইনসুলেশন চেক করার জন্যে বাইরে গিয়েছিলাম। জিয়াং দাঁড়িয়ে আছে- দাঁড়িয়ে ছিল- এ্যান্ড ক্যানেলের সীমানার প্রায় ত্রিশ মিটার দূরে। পাইপগুলো সরাসরি এখান থেকে নেমে নিচের বরফের মধ্যে ঢোকে। বরফ আবার খুব পাতলা হাঁটার মতো নিরাপদ নয়। পাইপের পানি অবশ্য গরম…’।
