হাজার বছরে আর কোনো মানুষকে এতটা কাছে আসতে দেয়া হয়নি।
২৫. ছাইচাপা আগুন
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এটা পানির রাজ্য। নিচে পানি, উপরে শূন্যতা, মাঝখানে শক্ত বরফের প্রাচীর। বেশিরভাগ জায়গায় বরফের আস্তরণটা কিলোমিটারের চেয়ে বেশি পুরু। কয়েক কিলোমিটার পুরু। কোথাও কোথাও ভাঙা অঞ্চল ছিল, বরফের বিশাল ফাটল উন্মুক্ত করে দিত পানি আর শূন্যতার মাঝের বরফকে। সৌরজগতের আর কোথাও দু বিপরীত অস্তিত্ব একত্রিত হয়নি এখানকার মতো। এ যুদ্ধে সব সময় দু পক্ষই জিতে যেত। বাপীভূত হত কিছুটা পানি, বাকিটা জমে গিয়ে পার্থক্য রচনা করত।
বৃহস্পতির টান না থাকলে পুরো ইউরোপার অনেক আগেই জমে বরফ হয়ে যাবার কথা। এহরাজের টান সব সময় হোট এ ভুবনের মধ্যবিন্দুতে টালমাটাল করে রাখে। আইওকে অগ্নিকুন্ড করে ফেলা শক্তি এখানেও কাজ করে, অনেক কম বল নিয়ে। গভীরে, সর্বত্র এ মহাগ্রহ-উপগ্রহ টানাপোড়েনের চিহ্ন। মাটির নিচে ভয়ানক সব ভূমিকম্প চলছে। এসবের গুরুগুরু আওয়াজ উঠে আসে উপরে। ভিতর থেকে উথলে ওঠে গ্যাসের প্রবাহ। ইউরোপার সমুদ্রের সাথে তুলনা করলে পৃথিবীর জীবন সঙ্গীত গাওয়া সমুদ্রগুলোও বোবা।
এখানে সেখানে, সাগরের তলায়, জন্ম নেয় মরুদ্যানেরা। যে কোনো পার্থিব জীববিদকে টানবে এ জগৎ। নিচ থেকে উঠে আসা তাপ আর মিনারেলে ভরা চিমনি ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে। কখনো কখনো দুর্গের মতো গড়ন গড়ে ওঠে আপনা-আপনি। সেখান থেকে দমকে দমকে বের হয় কালো স্রোত। ধীর, কালো স্রোত। যেন কোনো শক্তিমানের হৃদয় স্পন্দিত হচ্ছে। রক্তের মতো সেগুলোই জীবনের বার্তাবাহী তরল।
উপর থেকে আসছে শিতলতা, পানি তাই একেবারে ঠান্ডা। নিচ থেকে আসছে উত্তাপ, উঠে আসা তরল তাই ফুটন্ত। ফলে এসব জায়গায়, সাগরতলে, তাপমাত্রার বিচিত্র ভারসাম্য থাকে।
নিচ থেকে উঠে আসছে তির প্রাণ-রসায়নের সমস্ত উপাদান। এমন সব উর্বর মরুদ্যানে খাবার আর উত্তাপের কোনো অভাব নেই। বিংশ শতাব্দির অভিযাত্রীরা পৃথিবীর সমুদ্রের বুকেও এমন সব পানির তলার দ্বীপের সন্ধান পেয়েছিল। এখানে এগুলোর আকার অনেক বেশি বড়, বৈচিত্রও বেশি।
গাছের মতো গড়ন নিয়ে, মাকড়শার মতো গড়ন নিয়ে উদ্ভিদ জাতীয় জীবেরা জন্ম নেয় জ্বালামুখের কাছাকাছি। এমন ছোট ছোট বন দাপড়ে বেড়ায় আরো বিচিত্র পোকামাকড়। কোনো কোনোটা গাছ থেকে খাদ্য নিচ্ছে, কোনো কোনোটা নিচ্ছে সরাসরি খনিজ দ্রব্য থেকে। আরো একটু দূরে বসত করে কাকড়ার মতো প্রাণিরা।
একটা ছোট মরুদ্যান দেখতে দেখতে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে জীববিজ্ঞানীর বাহিনী। পোলিওজোয়িক পার্থিব সমুদ্রের মতো এখানকার মরুদ্যানগুলো সুস্থির ও চিরস্থায়ী নয়। বিবর্তন এখানে বিদ্যুৎ গতিতে বয়ে চলে। অকল্পনীয় সব গড়ন জন্ম নেয়। তারপর, তারা সবাই, আজ অথবা কাল, হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল তলে, কারণ মাতা ইউরোপা তার ইচ্ছামত উদগিরণের পথ সরিয়ে আনে, স্তিমিত করে ফেলে প্রাণ-তরলের উৎসগুলোকে। থিতিয়ে পড়ে ফোয়ার, স্তিমিত হয়ে যায় প্রাণের খেলা। ইউরোপার সাগরতলে, সর্বত্র এ নিদর্শন দেখা যায়। গোলাকার এলাকা ছড়িয়ে আছে যত্রতত্র, ছড়িয়ে আছে মৃত ঝর্ণা, ছড়িয়ে আছে বিচিত্র সব প্রাণি আর উদ্ভিদের কঙ্কাল, বিবর্তনবিদ্যার এক একটা মূল্যবান অধ্যায় একেবারে অপঠিত থেকে যায়, হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। কোথাও পড়ে আছে মানুষের চেয়েও বড় আকৃতির অস্থিময় গড়ন, বাইভালভ এমনকি ট্রাইভালভও চোখে পড়ে চোখে পড়ে কয়েক মিটার লম্বা সর্পিল পাথুরে গঠন যারা ক্রিটেশিয়াস যুগে পৃথিবীর বুক থেকে আচমকা বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল।
ইউরোপান জগতের আরেক বিস্ময় আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসা লাভার নদী। সাগরের এত নিচে প্রচন্ড চাপের কারণে লাভার স্পর্শ পাবার সাথে সাথে পানিগুলো বাষ্পে পরিণত হতে পারে না। দুইটা বিপরীত অস্তিত্ব বয়ে চলে পাশাপাশি।
সেখানে, অন্য এক পৃথিবীতে মিশরের মতো কাহিনী রচিত, অভিনীত হয় ভিনগ্রহী অভিনেতাদের দ্বারা মানুষের জন্মের অনেক আগেই। সরু নীলনদ যেমন উষর মরুর বুকে জীবনের জয়গান নিয়ে আসে, তেমনি ইউরোপার গহীনে এ নদীগুলো কাজ করে চলে অবিরত। নদীর দু পাড়ে, মাত্র কয়েক কিলোমিটার পুরুত্ব নিয়ে, প্রাণের বীজতলা গড়ে ওঠে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নানা রকম প্রাণি জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে, উন্নয়ন ঘটায়, তারপর থিতিয়ে পড়ে নদীর প্রাণ যাবার সাথে সাথে। কেউ কেউ রেখে যায় স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ- তাদেরই অস্থি দিয়ে।
কেউ কেউ এমন স্থাপত্য রাখে যা দেখলে বুদ্ধিমত্তার কথা মনে পড়তে পারে।
এ সরু সরু নদীর দু পাড়ে, লম্বা এলাকা জুড়ে কত সমাজ আর সভ্যতার বীজ বুনে দেয়া হয়েছিল, কতগুলোর চারা গজিয়েছে, কত সাম্রাজ্যের উত্থান পতন হয়েছে তা এখন আর জানা যাবে না। হয়ত ইউরোপান ট্যামারলেন আর নেপোলিয়ানরা দাপটের সাথে মার্চ করিয়েছে- সাঁতার কাটিয়েছে সেনাবাহিনীকে। নদীর দু পাড়ের এলাকা বাদ দিলে পুরো বনের বাকিরা সেসবের কোনো সন্ধান পায় না। কারণ এখানে উষ্ণতা আছে শুধু আশপাশের এলাকায়। মরুদ্যান বা নদীর বাইরে চলে গেলে শীতলতা জীবনকে গ্রাস করে নিবে। এক একটা পানির তলার দ্বীপ যেন ভিন্ন। ভিন্ন গ্রহ, ভিন্ন দুনিয়া। তাদের ইতিহাসবেত্তা বা দার্শনিক থেকে থাকতে পারে, তারা হয়ত মনে করেছে সৃষ্টি জগতে আর কেউ নেই।
