স্টোর।
ট্রান্সমিট।
.
পোলের শতাব্দিতে মানুষের নামের সাথে তার বাহ্যিক গড়নের একটা মিল খুঁজে পাওয়া যেত। এখন সে উপায় নেই। যে কোনো এলাকার, যদি ধর্ম থাকে তো ধর্মের মানুষের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের সাথে নামের মিল নাও পাওয়া যেতে পারে। ডক্টর খান দেখতে মোটেও মধ্য এশিয়ার মানুষের মতো নয়, বরং খাঁটি নরডিক ব্লন্ড। দেখে মনে হয় ভাইকিং। লম্বায় দেড়শ সেন্টিমিটারের চেয়েও কম। একটু মানসিক বিশ্লেষণ না করে পারে না সে, ছোটখাট গড়নের মানুষগুলো বিখ্যাতদের সাথে একটু চরমপন্থি মনোভাব নিয়ে চলে। এমন বাস্তবতা ঘেরা এলাকায় চলতে হলে খানকে সার্টিফিকেট পেতে হবে।
আনুবিস সিটিতে ইউনিভার্সিটি গড়ার মতো জায়গা নেই। অনেকে মনে করে টেলিকমিউনিকেশনের বিপ্লব এসব সমস্যাকে দূর করে দিবে। ইন্দ্রা যে তামাশার সুরে বলেছিল দর্শন বিভাগে ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া আর কিছু দরকার নেই, সেটা একেবারেই বাস্তব নয়।
‘সাতজনকে ধরে রাখার জন্য বানানো হয়েছে এটা,’ খুব বেশি আরামদায়ক যেন না হয় এভাবে বানানো চেয়ারে বসতে বসতে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল ডক্টর খান, ‘কারণ এর চেয়ে বেশি মানুষের সাথে ভালভাবে ইন্টার্যাক্ট করা সম্ভব নয় একজন মানুষের পক্ষে। যদি আপনি সক্রেটিসের ভূতের সন্ধান পান, সেও সাতজনের কথাই বলবে।‘
‘ও, গ্রাজুয়েশনের ঠিক আগে আগে আমি একটা ক্র্যাশ কোর্স নিয়েছিলাম ফিলোসফিতে সিলেবাস নিঙের সময় কেউ ঠিক করেছিল আমাদের মতো অসামাজিক ইঞ্জিনিয়ার-জীবদের সংস্কৃতির সামান্য নিদর্শন দেখানো উচিৎ।’
‘ভালতো। এভাবে সবকিছু সহজ হয়ে যায়। জানেন, এখনো আমার ভাগ্যের ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনার দেখা পাবার জন্য পৃথিবীতে যাব ঠিক করেছিলাম। সেই আপনিই কিনা সশরীরে হাজির হলেন! একেই বলে মিরাকল, অলৌকিক ঘটনা। প্রিয় ইন্দ্রা কি আমার- আহ- ভালবাসার কথা বলেছে?
‘না, সামান্য মিথ্যা মিশিয়ে জবাব দিল পোল।
ডক্টর খানের চোখমুখে আনন্দের আভা। নতুন শ্রোতা পেয়ে সে যার পর নাই খুশি।
‘আপনি হয়ত শুনে থাকবেন আমি একজন আস্তিক, কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আস্তিকতাকে প্রমাণ করা যায় না, তাই একই সাথে এটা খুব বেশি ইন্টারেস্টিংও নয়। যাই হোক, আমরা কখনো নিশ্চিত হতে পারব না যে ঈশ্বর কখনো ছিলেন এবং বর্তমানে তাকে ঠেলে অনেক দূরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে- এমন কোথাও যেখানে তাকে কেউ খুঁজে পাবে না… গৌতম বুদ্ধের মতো আমিও কোনো পক্ষ নিচ্ছি না। আমার আগ্রহের বিষয় ধর্ম নামের সাইকোপ্যাথলজিটা।
‘সাইকোপ্যাথলজি মনোবিকনের বিজ্ঞান? বিচিত্র সিদ্ধান্ড, বলতেই হয়।
ইতিহাসের রসে জারিত। ধরে নিন, আপনি একজন এ্যালিয়েন, সত্যের আপেক্ষিকতার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। আপনি এমন এক প্রজাতির সম্মুখীন হলেন যারা এর মধ্যেই হাজার হাজার গোত্র ও উপজাতিতে বিভক্ত, তাদের সবাই এ বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি ও বিজ্ঞান সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা পোষণ করে। ধরা যাক, তাদের বেশিরভাগ, নিরানব্বইভাগ বিশ্বাসই এক, শুধু একভাগ ভিন্ন, এটুকুর জন্য কত রক্তারক্তি হবে তার ইয়ত্তা নেই।
কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়? সুক্রেটিস এর ভিত্তিমূলে আঘাত হানলেন। তিনি বললেন, ধর্ম আসলে জন্ম নিয়েছে ভয় থেকে। রহস্যময়, বিরূপ প্রকৃতির বাইপ্রোডাক্ট। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই এ ছিল এক প্রয়োজনীয় অকল্যাণ- কিন্তু কেন সেটা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অকল্যাণকর হয়ে গেল আর কেন তখনো টিকে থাকল যখন এর কোনো দরকারই নেই?
‘আমি বলেছি অকল্যাণ- মিন করছি সেটাই, কারণ ভয়ই সব প্রাণিকে নিষ্ঠুরতার দিকে ঠেলে দেয়। এসব সম্পর্কে যার বিন্দুমাত্র ধারণা আছে সে নিজেকে মানবজাতির সদস্য বলে মানতেও লজ্জা পাবে… মানবেতিহাসের সবচে খারাপ বইগুলোর একটা হল হ্যাঁমার অব উইচেস, স্যাডিস্টিক মনোভাবের দুজন মানুষ লিখেছিল। চার্চে অনুমতি দিয়েছে উৎসাহ দিয়েছে- নিরীহ হাজার হাজার বৃদ্ধার উপর অত্যাচার চালানোর জন্য, যেন স্বীকার করে তারা। তারপর পুড়িয়ে মারার নিয়ম ছিল। খোদ পোপ নিজ হাতে এর অনুমতিপত্র দেখে!
দু একটা সম্মানযোগ্য ধর্ম ছাড়া বাকি প্রায় সবগুলোই খ্রিস্ট ধর্মের মতো নিষ্ঠুর… এমনকি আপনার শতাব্দিতেও ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেদের ধরে ধরে লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হত যে পর্যন্ত পিউস গিবেরিশ মুখস্ত করতে না পারে সে পর্যন্ত। একটা বাচ্চার কাছ থেকে তার বাল্যকাল কেড়ে নেয়ার মতো নিষ্ঠুর কাজ আর কী হতে পারে। তারপর যাজক হয়ে জলাঞ্জলি দিতে হত যৌবনকে…
সম্ভবত আরো বিচিত্র ব্যাপার হল, শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে পাগল লোকগুলো দাবি করে আসে সে, শুধু সে-ই পেয়েছে ঐশী গ্রন্থ। আর অন্য মানুষের সাথে তাদের ধর্মবিশ্বাসের মাইক্রোস্কোপিক পার্থক্যের কারণে লড়াই করে করে প্রাণপাত করেছে নির্বিধায়।
পোল ভাবে এখন দু একটা কথা নিজ থেকে বলা ভাল।
‘আপনার কথায় আমার বাল্যকালের ছবি ভেসে ওঠে। ঘটনাটা আমাদের শহরের। একজন হলি ম্যান দাবি করে বসে সে মিরাকল ঘটাতে পারে। তারপর মানুষ জুটে যেতে লাগল আশপাশে। এমনকি শিক্ষিত, দামি পরিবারের লোকগুলোও প্রতি রবিবারে তার টেম্পলের বাইরে গাড়ির লাইন লাগিয়ে দিত।
