‘আস্তে আস্তে বড় হলাম। বুঝতে শিখলাম স্পেসশিপগুলো একেবারে বিদঘুঁটে। সাধারণত রকেট চালিত ছিল স্পেসশিপ, কি প্রোপ্যাল্যান্ট ট্যাঙ্কের নাম গন্ধও নেই। কোন কোনটায় আগাগোড়া জানালার সারি, সাগরের বড় বড় জাহাজের মতো। একটা বেশ ভাল লাগত আমার। বিশাল কাঁচের গম্বুজ ছিল ওটায়। মহাকাশে পাড়ি দেয়া কনজার্ভেটরি…।
কিন্তু শেষ হাসিটা মনে হয় সেই বিদঘুঁটে আর অযৌক্তিক চিত্রগুলোর আঁকিয়েরাই হাসল। এখন সত্যি সত্যি গোলিয়াথে কোনো প্রোপ্যাল্যান্ট ট্যাঙ্ক নেই, নেই সীমিত গতি। শুধু এগিয়ে চলা। মাঝে মাঝে মনে হয় আমিই স্বপ্ন দেখছি।
হাসল চ্যাভলার, বাইরে আঙুল নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করল, এটাকে কি স্বপ্ন বলে মনে হয়?
স্টার সিটিতে আসার পর এই প্রথমবারের মতো পোল তাকায় সত্যিকার উপরে, যতটা আশা করেছিল তত দূরে নয়। হাজার হলেও, সে এমন এক চক্রের বাইরের রিমে বসে আছে যার ব্যাস পৃথিবীর চেয়ে সাতগুণ বড়। এ কৃত্রিম স্বচ্ছ ছাদের উপরে দৃষ্টি চলে যাবে অন্তত কয়েকশ কিলোমিটার দূরে…
মনে মনে অঙ্ক কষে ফেলার কাজে তার সময়েই জিনিয়াস ছিল পোল, এখনকার দিনে তো এমন পাওয়া যাবে না। উপরের দূরত্ব মেপে নেয়ার সূত্র খুব সরল।
হিসাব করে ফেলল পোল, পঁচিশ কিলোমিটার… হম! পঁচিশ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা স্পেসপোর্টের
বুকেও ভাবা প্রায় অসম্ভব। এখানে, ছত্রিশ হাজার কিলোমিটার দূরের জিওস্টেশনারি অর্বিটে ওজন টের পাওয়া যায়। বাইরে ভেসে ভেসে কাজ করছে বেশ কয়েকটা রোবট আর স্পেসস্যট পর মানুষ। কিন্তু ভিতরে, গোলিয়াথে মঙ্গলের মাপে ওজন।
মন বদলে নিতে চাও না তো, ফ্র্যাঙ্ক ঠাট্টার সুরে জিজ্ঞেস করে ক্যাপ্টেন চ্যান্ডলার, এখনো পাক্কা দশটা মিনিট বাকি আছে।
বদলে ফেললে আর জনপ্রিয়তা থাকবে না, কী বল? আগের দিনে কী বলত জান? প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছি। প্রস্তুত থাকি আর না থাকি, আসছি চলে।
সব মিলিয়ে মাত্র সাতজন ক্রু। কুরা বেশ শ্রদ্ধা করে তাকে। হাজার বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ছে সে পৃথিবী ছেড়ে। এবারো লক্ষ্য অজানা।
বৃহস্পতি- লুসিফার সূর্যের অন্য প্রান্তে, গোলিয়াথ যাবার সময় শুক্রের খুব কাছ দিয়ে যাবে।
কয়েক হাজার কিলোমিটার উপর থেকে স্টারসিটিকে পৃথিবীর বিষুবরেখার উপর দানবীয় ধাতব ব্যান্ডের মতো দেখায়। গ্যান্ট্রি, প্রেসার ডোম, আধা তৈরি হওয়া বিশাল বিশাল সব মহাকাশতী দেখায় বিন্দুর মতো। দ্রুত সরে যাচ্ছে দৃশ্য। দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে তারা সূর্যের কাছাকাছি এলাকায়। পৃথিবী ঘিরে থাকা এ বলয় এখনো সম্পূর্ণ নয়, শুধু ধাতব কঙ্কাল আছে বিশাল এলাকা জুড়ে। কখনো কি সেগুলো পুরোপুরি শেষ করা যাবে।
আমেরিকান আর এশিয়ান টাওয়ার দেখা যায়। দেখা যায় প্রকৃতির নীলাভ বর্ণ। বিন মহাকাশ থেকে সূর্যের দিকে ধেয়ে আসা যে কোনো ধূমকেতুর চেয়ে বেশি গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতি পল-অনুপলে গতিবৃদ্ধি করা গোলিয়াথ। এখনো দৃষ্টিসীমা জুড়ে আছে পৃথিবী। নীল পৃথিবী। দেখা যাচ্ছে আফ্রিকা টাওয়ারের পুরোটা। এটাই দ্বিতীয় জীবনে তার বসতবাড়ি। কে জানে, বাকি জীবনটাও হয়ত এখানেই কাটিয়ে দিতে হবে।
পঞ্চাশ হাজার কিলোমিটার দুরে যাবার পর স্টারসিটির পুরোটা চোখে পড়ে। যেন পৃথিবী ঘিরে থাকা ক্ষীণ নতুন চাঁদ। শেষ প্রান্তগুলো তারার রাজ্যে হারানো যেন, এক চিলতে, চুলের রেখার মতো, রূপালি। ভাবতে বিবশ লাগে, মানবজাতি স্বর্গের দেশে কৃত্রিম সর্গ তৈরি করে ফেলেছে।
শনির বলয়ের কথা মনে পড়ে যায় পোলের, আরো বেশি পরিপূর্ণ, আরো মহিমাময়। এ্যাস্ট্রোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে প্রকৃতির অর্জনের সাথে পাল্প দিতে হলে।
প্রকৃতি, নাকি… শব্দটা যেন কী? ডিউস।
১৫. শুক্রের পথে
‘পরদিন সকাল। শুক্রের সাম্রাজ্যে চলে এসেছে তারা। মেঘে ঢাকা চিকণ চাঁদের মতো গ্রহটাই শুধু আগ্রহের বস্তু নয়, গোলিয়াথ ভেসে আছে এক বিশাল সিলভার ফয়েলে মোড়া আকৃতির উপর। উড়ে যাচ্ছে গোলিয়াথ এবড়োথেবড়ো গড়নটার উপর দিয়ে, প্রতি মুহূর্তে সূর্যের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে।
পোলের মনে পড়ে যায় যে তার সময়েই এমন এক শিল্পী ছিল, পুরো বিল্ডিংকে প্লাস্টিক শিট দিয়ে মুড়ে দেয়া ছিল তার শখ। একটা ঝকমকে খামের ভিতরে ভরে রাখা মিলিয়ন মিলিয়ন টন বরফ দেখে তার কীরকম অনুভূতি হত। শুধু এ পদ্ধতিতেই সূর্যের পথে বছরের পর বছর ধরে আসতে থাকা ধূমকেতুর শরীরটাকে রক্ষা করা যায়। রক্ষা করা যায় বাষ্প হয়ে যাবার হাত থেকে।
‘তোমার কপাল ভাল, ফ্র্যাঙ্ক, এমন দৃশ্য আমিও কখনো দেখিনি। এক ঘন্টার মধ্যে ইম্প্যাক্ট হবে। আমরা একে মৃদু একটা ধাক্কা দিতে যাচ্ছি যেন সময় মতো নেমে যায়। কাউকে আহত করতে চাই না।’
অবিশ্বাস ভরা চোখে তাকায় পোল।
ইউ মিন শুক্রের বুকে এমন প্রলয়ঙ্করী মহুর্তেও মানুষ আছে?
‘জনা পঞ্চাশেক আধ পাগলা বিজ্ঞানী। দক্ষিণ মেরুর কাছে। অবশ্যই, খুঁড়ে কেটে ভিতরে ঢোকানো হয়েছে তাদের, কিন্তু আমরা তাদের একটু কাঁপিয়ে দিব, যদিও গ্রাউন্ড জিরো গ্রহের অন্য প্রান্তে। হয়ত বলা ভাল ‘এ্যাটমোস্ফিয়ার জিরো’। কারণ মাটির নিচে শকওয়েভ ছাড়া আর কিছু যেতে কয়েকদিন সময় লেগে যাবে।
