এখন আবার কোন মহাভারত অশুদ্ধ করলাম আমরা? প্রশ্ন করে পোল নিজেকেই। আধঘন্টা পর, একটা ভিডিও ডিসপ্লেতে ঘরের অন্য কোণায় ইন্দ্রা একেবারে ডুবে যাবার পর, তৃতীয় সন্ত্রাব্দের ব্যাপারে আরো একটু অগ্রসর হল পোলের জ্ঞান।
মৃতদেহের খাদ্য এমনকি তোমার সময়েই শেষ হয়ে যাচ্ছিল।’ ব্যাখ্যা করে এ্যান্ডারসন, জীবজ জন্ম দিয়ে- উহ- পাবার জন্য জীবজ জন্ম দেয়ানো অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। জানি না একটা গরুকে খাবার দেয়ার জন্য কত একর জমি নষ্ট করতে হত কিন্তু এটুকু জানি ঐ জায়গায় জন্মাতে পারত এমন গাছের উপর অন্তত দশজন মানুষ জীবন চালাতে পারে। আর হাইড্রোপোনিক টেকনিক অবলম্বন করলে নির্বিঘ্নে শ খানেক মানুষ চলে যেতে পারত।
কিন্তু অর্থনীতি নয়, এ ব্যবসাটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল রোগ। ভাইরাসটা প্রথমে চারপেয়ে প্রাণিগুলোর মধ্যে ছড়ায়, তারপর অন্যান্য জম্ভর মধ্যে। ভীষণ এক ভাইরাস। খুব খারাপভাবে মরতে হত মানুষকে। তারপর চিকিৎসা বেরোয়, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা উল্টে দেয়ার কোনো উপায় ছিল না। তদিনে সিনথেটিক খাবারের জয়জয়কার। খুব সস্তাও। কোনো জীবাণু থাকার প্রশ্ন ওঠে না। পেতে পার যে কোনো তোরে।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলা তুষ্ট করার মতো কি মোটামুটি বিস্বাদ খাবারের কথা মনে পড়ে যায় পোলের। ভেবে পায় না সে, এখনো কি মনে স্টেক আর কাবাবের লোভ জেগে আছে।
অন্যান্য স্বপ্ন আরো সমস্যা সৃষ্টি করে। বুঝতে পারে সে, খুব বেশি দেরি নেই, এ্যান্ডারসনের কাছে মেডিক্যাল হেল্প চাইতে হবে। অস্বস্তি বাড়ছে, অস্বস্তি বাড়ছে এই বিচিত্র, জটিল, পরিবর্তিত পৃথিবীর সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করার সাথে সাথে। স্বপ্নে মাঝে মাঝে সে আগের পৃথিবীতে চলে যায়। চলে যায় তার আসল বনে। তারপর যখন বাস্তবটী ফিরে আসে, ফিরে আসে চরম অতৃপ্তি, বেদনা আর কষ্ট। পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়ে।
আমেরিকা টাওয়ারের পথে চলে যাওয়াটা খুব বেশি কাজের হবে বলে মনে হয় না। গিয়ে নিচে তাকালেই যে অনেক কিছু দেখা যাবে তাও ভুল। বাস্তবে, সিমুলেশনকে পাশ কাটিয়ে তার কৈশোর-যৌবনের ভূমিতে চোখ রাখা একেবারে বোকামি হবে। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে অপটিক্যাল এইড নিয়ে সে আলাদা আলাদা মানুষকে যার যার কাজ করতে দেখবে। দেখবে নিজের পুরনো সব পথঘাট, যদি এখন থেকে থাকে…
এবং এসব চিতা যখন মাথায় আসে, আসে আরো একটা ভাবনা, সে জায়গাটা দেখতে পাবে যেখানে তার ভালবাসার সব মানুষ এক সময় বসবাস করেছিল- মা, বাবা (আরেক মহিলার সাথে চলে যাবার আগে), প্রিয় আঙ্কল জর্জ, লিল আন্টি, ভাই মাটিন- আর একপাল কুকুর যেগুলোর মধ্যে ছিল তার রিকি।
সব ছাড়িয়ে সেখানে ম-ম করত একজনের গায়ের গন্ধ, তার স্মৃতি, মেয়েটার নাম হেলেনা…
এ্যাস্ট্রোট্রেনিঙের গোড়ার দিকে একেবারে সাদামাটাভাবে শুরু হয়েছিল এ্যাফেয়ারটা। সময় বয়ে যায়। আরো আরো সিরিয়াস হয়ে পড়ে সম্পর্ক। বৃহস্পতির পথে যাবার ঠিক আগে সব ঠিকঠাক হয়ে যায়, তারা এ সম্পর্কটাকে স্থায়ীত্ব দিতে যাচ্ছে ফিরে আসার পর।
সে ফিরে না এলেও হেলেনা তার সন্তান ধারণ করতে খুব আগ্রহী ছিল। সেই প্রয়োজনীয় কাজকর্মের, আইনি জটিলতাগুলো কাটিয়ে যখন পদক্ষেপ নিচ্ছে, কী খুশি ছিল তারা।
এখন, হাজার বছর পরে, জানার হাজার আকুতি থাকলেও জানার আর কোনো উপায় নেই হেলেনা কথা রেখেছিল কিনা। তার স্মৃতিতে আছে, হয়ত আছে পৃথিবীর অযুত নিযুত তথ্যভান্ডারের কোথাও। আবার নাও থাকতে পারে। ২৩০৪ সালে এ্যাস্টেরয়েডের প্রভাবে যে তড়িৎচৌম্বক পালস আঘাত হানে তাকে এ গ্রহের সমস্ত উপাত্তের বেশ অনেকটা অংশ হারিয়ে গেছে চিরতরে। ব্যাকআপ আর সেফটি সিস্টেমকে কাঁচকলা দেখিয়েছিল আক্রমণটা। হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য এক্সাইটের সাথে তার সন্তানদের তথ্যগুলো সরে গেছে কিনা তাই বা কে জানে। এখনো, এই পৃথিবীর বুকে তার ঔরসের ত্রিশতম বংশধরা হয়ত পা ফেলে বেড়াচ্ছে, শুধু সে চিনতে পারবে না তাদের কোনোদিন।
অরোরার মতো কোনো কোনো মেয়ে যে এখনো তাকে আস্তাকুড়ের আবর্জনা মনে করে তাতেই সে খুশি। এখন আর কাছের সম্পর্ক দানা বাধানোর চেষ্টা করে না। আশাও করে না খুব কাছে চলে আসবে কেউ, আপনজন বলতে যা বোঝায় তা ভাবা যাবে কারো কারো ব্যাপারে। ভাল আছে সে, এসব মাথাহীন কাজকর্ম নিয়ে দিব্যি ভাল আছে।
মাথাহীন-এটাই সমস্যা। এখন আর এ জীবনের কোনো মানে নেই। যৌবনে পড়া বিখ্যাত এক বইয়ের কথা মনে পড়ে যায়, ‘আজব সময়ে আমি এক আজব মানুষ।
মাঝে মাঝে নিচে তাকায় সে। তাকায় সে গ্রহটার দিকে যেখানে আর কখনো হেঁটে বেড়াতে পারবে না। কোনো না কোনো এ্যালার্ম বাজিয়ে দেয় মানুষ এখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়। বিচিত্র আত্মহত্যা। জ্বলন্ত উদাপিত হয়ে খসে পড়ে মানুষ পৃথিবীর কাছাকাছি আকাশে।
.
‘দ্বিতীয়বার আপনার দেখা পেয়ে ভাল লাগছে, কমান্ডার গোল।
‘আই এ্যাম স্যরি- এত মানুষের সাথে দেখা হয়- মনে পড়ছে না।
‘ক্ষমা চাওয়ার কোনো কারণ নেই। দেখা হয়েছিল নেপচুনের কাছে।
‘ক্যাপ্টেন চ্যান্ডলার- ডিলাইটেড টু সি ইউ। অটোশেফ থেকে কিছু খাবার পরিবেশন করতে পারি আপনার জন্য?
