কোন সময়টায়, কোন আবহাওয়ায় এ ছবি তুলে আনা হয়েছিল? একবিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে পৃথিবীর বুকে চোরাগোপ্তা দৃষ্টি হানা স্পাই স্যাটেলাইটের তোলা ছবি, এটুকু আন্দাজ করা যায়। তার সময় থেকে খুব বেশি পরে নেয়া হয়নি, হলপ করে বলতে পারে সে; এখানকার আশপাশ যে এমন ছিল তা মনে পড়ে। একটু, আর একটু নিচে নামতে পারলে খোদ নিজেকে দেখা যাবে হয়ত…
কিন্তু বাড়া ভাতে ছাই দেয়ার কোনো ইচ্ছাও নেই। আর নিচে গেলে দৃশ্য ভেঙে যাবে, বেরিয়ে পড়ছে প্রযুক্তির তীক্ষ্ণ দাঁত। পিক্সেলগুলো ভাঙা ভাঙা চলে আসবে। কী দরকার সুখস্বপ্ন নষ্ট করার?
আরে… কী অবাক ব্যাপার! এইতো সেই পার্ক… সেই ছোট্ট পার্ক যেখানে তার জুনিয়র আর হাইস্কুলের বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়েছিল, ডানপিটে সব কাজ করেছিল, খেলেছিল নাওয়াখাওয়া ভুলে। সিটির হর্তাকর্তারা অহর্নিশি এর জিম্মাদারি নিয়ে হা পিত্যেশ করে বেড়াত, পানির সরবরাহ নষ্ট হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। যাক, এটাতো টিকে ছিল ছবি তোলা পর্যন্ত, এই যথেষ্ট।
আরেক ভাবনা চোখ ফাটিয়ে পানি নিয়ে আসে। ঐ সরু গলিগুলো ধরে হেঁটে বেড়াত সে সময় পেলেই। হিউস্টন থেকে বেরুতে পারলে বা চাঁদ থেকে একটু অবসর পেয়ে পৃথিবীতে এলেই পায়চারি করত অনেক আবেগমাখা সেই রোডেশিয়ান রিজব্যাকে। হাতে থাকত একটা ছড়ি আর পোষা কুকুরটা।
বৃহস্পতি থেকে আসার চিন্তার সাথে সব সময় মনে একটা উদ্বেগ থাকত, রিক্তি তার ছোট ভাই মার্টিনের কাছে ভাল থাকবে তো? ভাবনাটা কেমন যেন স্থবিরতা এনে দেয়। কিছু বোঝার আগেই নেমে যায় বেশ কয়েক মিটার। ফিরিয়ে আনতে হয় শক্তি। কী করে নিজেকে বোঝায় যে রিক্কি আর মার্টিন দুজনেই শত শত বছর আগে মিশে গেছে ধূলার সাথে।
ঝাপসা চোখ পরিষ্কার হয়ে এলে এ্যান্ড ক্যানিয়নের কালো রেখা দেখা যায়। এগিয়ে যাবে কিনা ভেবে পায় না। আকাশে একা নয় সে। মানুষ যে উড়ছে না এটুকু বোঝা যায়। একটু বেশিই বড়।
‘যাক,’ বলল সে নিজেকে, এখানে একটা টেরোডাকটাইলের সাথে দেখা হয়ে যাওয়াটা মোটেও আজব নয়। আশা করি প্রাণীটা ফ্রেন্ডলি হবে… ও, নো!
টেরোডাকটাইলের আন্দাজটা একেবারে ভুল নয়। সম্ভবত দশে আট দিয়ে দেয়া যায়। রূপকথার দেশ থেকে পাখা মেলে এগিয়ে আসছে যেটা তাকে ড্রাগন বললে কোনো ভুল হবে না। দৃশ্যটাকে পূর্ণতা দিতে সেটার পিঠে চড়ে আসছে রূপবতী এক মেয়ে।
সৌন্দর্য এতদূর থেকে মেপে নেয়া একটু কঠিন। কল্পনার রঙ চড়িয়েছে পোল। রীতিবদ্ধ চিত্রটায় চিড় ধরেছে একটা বিশেষ কারণে। প্রথম মহাযুদ্ধের বাইপ্লেনের পাইলটরা যেমন পরত, এভিয়েটর গগলে মেয়েটার মুখের বেশিরভাগ ঢাকা।
ভেসে থাকে পোল। বিশাল জটার ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজ ওঠে। এগিয়ে আসে সেটা। মাত্র বারো ফুট দূর থেকেও সিদ্ধান্তে আসতে পারে না সে, এটা কোনো মেশিন, নাকি বায়ো-কনস্ট্রাক্ট…হয়ত দুইটাই।
এরপর ড্রাগনের কথা মন থেকে উধাও হয়ে গেল, কারণ মুখ থেকে আবরণ সরিয়ে নিয়েছে মেয়েটা।
এসব কথা আদিকাল থেকে বলে আসছে সাহিত্যিকরা, আর আদিকাল থেকেই সে কথার কোনো মূল্য দেয় না পাঠক মাঝে মাঝে।
কিন্তু প্রথম দেখায় ভালবাসার আবেদন ফুরাবে না কখনো।
.
দানিল কোনো তথ্যই জানাতে পারল না, পোলও খুব বেশি আশা করেনি। কিন্তু পোল যে মানসিকভাবে অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে গেছে তা অস্বীকার করে কী করে। এ বায়ো-রোবটটা কাজের নয়- গৃহস্থালির কাজে তার তুলনা নেই, কথা সত্যি, কিন্তু
ভদ্রভাবে কারো ব্যাপারে জানতে চাইলে সে চট করে বলে ফেলতে পারবে না। মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হয়ে যায় সে, নিজেও কি একটা বায়ো-রোবট?
ইন্দ্রা অবশ্য ঠিকভাবে জবাবটা দিতে পেরেছিল।
‘ও, ড্রাগন লেডির সাথে দেখা হয়েছে তোমার?
‘এ নামেই ডাক নাকি? আসল নামটা কী? আইডেন্ট বের করে দিতে পারবে? হাত স্পর্শ করার উপায় ছিল না তখন।
‘অফকোর্স- নো প্রবলেমো।‘
‘এটা আবার কোত্থেকে কুড়ালে?
ইন্দ্রার চোখেমুখে বিভ্রান্তি।
মনে নেই- হয়ত কোনো পুরনো মুভি বা বই থেকে। কেন, কথাটা কি বেমানান
বয়সটা পনেরর বেশি হলে বেমানান।’
বাদ দাও, মনে রাখব। বলতো, কী হয়েছিল তখন? এর মধ্যেই হিংসা হচ্ছে আমার।
বন্ধুত্বের একটা পর্যায়ে এলে মানুষ সহজভাবে যে কোনো কথা বলতে পারে। এখনো একে অন্যের বিচিত্র সব আগ্রহের কথা খেয়াল করে শোনে। একবার ইন্দ্রা বলেছিল, আমার মনে হয় দুজনে যদি কোনো বিচিত্র গ্রহাণুতে ধ্বসে পড়তাম, একটা না একটা উপায় বের করে ফেলতাম, কী বল?
‘প্রথমে বলতে হবে মেয়েটা কে।
নাম অনোরা ম্যাকঅলি। আরো অনেক ব্যাপারের সাথে সে সোসাইটি ফর ক্রিয়েটিভ এ্যানাক্রোনিজমের প্রেসিডেন্ট। আর তুমি যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাক যে ড্রাকো দেখতে বেশ ভাল, তাহলে বলতেই হয়, তাদের জাতের আরো কয়েকটাকে দেখতে হবে আগে। দেখতে হবে তাদের অন্যান্য সৃষ্টি। যেমন মবি-ডিক আর ডাইনোসরের আত্মীয়স্বজনের বিশাল এক দলকেও দেখতে হবে, দেখে শেষ করতে পারবে না।’
সত্যি হতে হলে এত বেশি ভাল না হলেও চলে, ভাবে পোল।
পৃথিবী গ্রহের বুকে আমিই সবচে বিচিত্র এ্যানাক্রোনিজম।
১২. হতাশা
এখন পর্যন্ত, স্পেস এজেন্সি সাইকোলজিস্টদের সাথে তার বাতচিতের কথা ভুলে বসেছিল সে।
